প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:০০
•
অনলাইন সংস্করণ
প্রতিটা দেশের কালচারেই প্রথম জেনারেশন ইমিগ্র্যান্ট বলে একটা কথা বা নাম প্রচলিত আছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বিদেশের পটভূমিতে ‘প্রথম’ আগমনের লেবেলটি যারা পায়, তাদের সেই নতুন অধ্যায়ের শুরু থেকেই অনেক ঝড়ঝাপটার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। পড়াশোনা, চাকরি, বিয়ে কিংবা পারিবারিক ইমিগ্রেশনের মাধ্যমে বাঙালিরা সাধারণত বিদেশে পাড়ি জমায় এবং সম্পূর্ণ নতুন একটি দেশে এসে জীবনটাকে নতুনভাবে গড়ে। তাদের ভাবনায় যে জিনিসটি প্রাধান্য পায়, সেটি হলো নতুন জায়গায় প্রতিষ্ঠা লাভ। প্রতিষ্ঠা লাভ খুব সহজে বা একদিনেই হয়ে যায় না। অনেক চেষ্টা, অনেক ধৈর্য, অনেক পরীক্ষা, অনেক পরিশ্রমের বোঝা তাদের বহন করতে হয়।
প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ ছেড়ে যোজন যোজন মাইল দূরের প্রবাসজীবনে দ্বিতীয় নিবাস গড়ে তুলতে বহু রকম চড়াই-উতরাই পার হতে হয়। নতুন জীবনের প্রথম দিনগুলো কারও জন্য হয় সহজ, আবার কারও জন্য হয় কঠিন। ভিনদেশকে আপন করে নিয়ে মন মানানোর পরীক্ষায় কেউ পাস করে, কারও পাস করতে অনেক সময় লেগে যায়। প্রথম জেনারেশন ইমিগ্র্যান্ট বা প্রথম প্রজন্ম হিসেবে অনেকটা সময় অতিক্রান্ত করার পর কারও কারও ক্ষেত্রে সফলতা আসে—ভাষায়, পেশায়, সামাজিকতায়, জীবন উন্নয়নে। কারও কারও ক্ষেত্রে খুব একটা পরিবর্তন হয় না। তারা নিত্যদিন পার করার মধ্য দিয়ে টিকে যায়, টিকে থাকে। মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে শেখে, এ জায়গাই তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ঠিকানা।
লেখাপড়ায়, কর্মক্ষেত্রে, পারিবারিক জীবনে উন্নতি লাভের পাশাপাশি নতুন দেশের মূলধারার সংস্কৃতি, সামাজিক রীতিনীতি, ভাষা, লাইফস্টাইল প্রণালি সবকিছু রপ্ত করা খুব সহজ কোনো ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় না। আর এই কঠিন কাজটি করতে গিয়েই বাঙালিরা অনেক বড় ঝড়ের মধ্য দিয়ে যায়—পরিবর্তনের ঝড়। তবে অধিকাংশ অভিবাসী বাঙালি এই পরিবর্তনের মধ্যেও নিজেদের বাঙালিয়ানাকে বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। তাই বহুদিনের দেশছাড়া বাঙালিরা জীবনপথে চলতে গিয়ে ভিন্ন মতাদর্শের এবং ভিন্ন চিন্তাচেতনার হলেও হৃদয়ে তারা থেকে যান খাঁটি বাঙালি। সাত সমুদ্র তেরো নদী পার করে এই ভূখণ্ডে এলেও মনের ভেতর জ্বলজ্বল করে লাল-সবুজের পতাকা। বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি, বাংলাদেশের প্রতি অনুভব করেন অকৃত্রিম টান।
মার্কিন আদমশুমারি এবং পিউ রিসার্চ সেন্টারের (Pew Research Center) তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শুধু বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ। তবে অনাবাসিক ও অনথিভুক্ত বাংলাদেশিসহ এই সংখ্যাটি পাঁচ লাখ পর্যন্ত হতে পারে বলে গবেষকেরা মনে করেন। সবচেয়ে বেশি বাঙালি বসবাসকারী রাজ্যটি হলো নিউইয়র্ক। এর পরই আছে মিশিগান, ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাস ও নিউজার্সি। বড় বড় রাজ্যগুলো ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের মানচিত্রে যেকোনো জায়গায় গেলেই পাওয়া যাবে কোনো না কোনো বাঙালি। আমেরিকায় দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের মধ্যে বাঙালিরা অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল একটি জনগোষ্ঠী। গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশিদের সংখ্যা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তারা ক্রমাগত শিক্ষা, প্রযুক্তি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় রাজনীতিতে দাপটের সঙ্গে অবস্থান নিচ্ছেন। আমেরিকার সমাজ গঠনে যারা বাঙালি পরিচয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। যারা প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত আমেরিকার বহুজাতিক সমাজে আমাদের দেশ তথা বাংলাদেশকে পরিচিত করছেন তাদের কথা একটু বলি।
হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে বিপুলসংখ্যক বাঙালি চিকিৎসক ও নার্স কাজ করছেন এবং তারা সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবায় সরাসরি অবদান রাখছেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাঙালিরা অধ্যাপক ও গবেষক হিসেবে উচ্চশিক্ষা প্রদান করছেন। নাসার মতো মহাকাশ গবেষণা সংস্থা থেকে শুরু করে ক্যানসার গবেষণা এবং জীবনরক্ষাকারী ওষুধ তৈরিতে বাঙালি বিজ্ঞানীরা নিষ্ঠার সঙ্গে নিয়োজিত। আমেরিকার প্রযুক্তিকেন্দ্র সিলিকন ভ্যালির বড় বড় কোম্পানি গুগল, মাইক্রোসফ্ট এবং অ্যাপলে হাজার হাজার বাঙালি প্রকৌশলী ও গবেষক কাজ করছেন। নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস, টেক্সাস ও মিশিগানের মতো বড় শহরগুলোতে বাঙালিরা গ্রোসারির দোকান, রেস্টুরেন্ট এবং রিয়েল এস্টেট ব্যবসা পরিচালনা করছেন। বর্তমান সময়ে বাঙালিরা আমেরিকার মূলধারার রাজনীতিতেও প্রবেশ করছেন। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের স্থানীয় কাউন্সিল, আইনসভা এবং সরকারি উচ্চপদে তারা নির্বাচিত ও নিযুক্ত হচ্ছেন। সামাজিক ও মানবাধিকার সংগঠনের মাধ্যমে নিজেদের বাঙালি ভাইবোন অভিবাসীদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার ভূমিকা পালন করছেন। আমেরিকায় বসে বাঙালিরা পহেলা বৈশাখ, একুশে ফেব্রুয়ারি, বইমেলার মতো সাংস্কৃতিক উৎসবগুলো বড় পরিসরে উদ্্যাপন করছেন।
এদিকে দৈনন্দিন জীবনে বাঙালি নারীরা কোনো না কোনোভাবে সব সময়ই বাংলাদেশকে উন্মোচন করছেন। বিদেশের মাটিতে জন্মানো দ্বিতীয় প্রজন্মের সন্তানদের অবিরাম বাংলা চেনাচ্ছেন, বাংলা ভাষা শেখাচ্ছেন এই বাঙালি মায়েরাই। আমাদের দ্বিতীয় প্রজন্মের বাচ্চারা কত সুন্দর করে দুটি ভাষাই রপ্ত করছে এবং গর্বের সঙ্গে নিজের বাবা-মা, আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে বাংলা ভাষায় কথা বলছে। আমেরিকার মাটিতে দৈনন্দিন জীবনে বাঙালি মেয়েরা অসংখ্য অবাঙালি বা বিদেশিদের সান্নিধ্যে আসছেন। তখন কোনো প্রতিবেশী, বন্ধু বা সহকর্মীকে নিজের হাতের বাঙালি রান্না খাওয়াচ্ছেন, বিদেশি বান্ধবীকে শাড়ি পরানো শেখাচ্ছেন, বাংলাদেশ থেকে আনা নানা শিল্পকর্ম দেখাচ্ছেন। বাঙালি ঐতিহ্য, বাঙালি সংস্কৃতি, বাঙালি খাওয়া, বাংলা ভাষা আর কে বা কারা এত উদারতার সঙ্গে, এত গর্ব নিয়ে সবার চোখের সামনে তুলে ধরতে পারছেন।
ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ল’ইয়ার, শিক্ষক, সাংবাদিক, বিজ্ঞানী, নার্স, ব্যবসায়ী, থেরাপিস্ট, শেফ, লেখিকা, সমাজসেবিকা—এমন অসংখ্য পেশায় শিক্ষা আর যোগ্যতা দিয়ে সফলভাবে কাজ করে যাচ্ছেন প্রবাসী বাঙালিরা। অন্য দেশিদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিষ্ঠা আর দক্ষতার সঙ্গে, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তারা এগিয়ে চলছেন সামনের দিকে। তাদের এই প্রাপ্তি, এই সফলতার জায়গাটি অনেক পরিশ্রম, চেষ্টা আর বুদ্ধি দিয়ে অর্জন করতে হচ্ছে। কোনো চাচা-মামা কানেকশনের মাধ্যমে নয়।
যারা শিক্ষাগত যোগ্যতায় শক্তিশালী নন, তারাও পিছিয়ে নেই। দেশের অর্থনীতিকে বছরের পর বছর উজ্জীবিত করছেন রেমিট্যান্স-যোদ্ধারা। নিজেদের সাধ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে, হাড়ভাঙা খাটুনি করে বেতনের প্রায় সবটুকুই দেশে পাঠিয়ে দেন তারা। বিদেশের মাটিতে মুখ গুঁজে পড়ে থাকেন প্রিয়জনদের সুখের কথা ভেবে। বিদেশের মাটিতে খুবই অল্প চাহিদায়, অল্প খরচে, একসঙ্গে অনেকজন মিলে থেকে তারা টাকা জমান। কোনো মাসে সেই টাকা পাঠাতে তাদের ভুল হয় না, পরিবার আর সংসারের কথা ভেবে। স্বজনদের প্রতি তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ এতটুকু কমে না। পরিবার, দেশ ও জাতির প্রতি এত মমত্ববোধ, এত উদারতা, এত টান আর কারা অনুভব করে।
যদিও বাঙালিরা তাদের কঠিন পরিশ্রম, সততা ও মেধা দিয়ে আমেরিকার সমাজে নিজেদের একটি সম্মানিত স্থান তৈরি করে নিয়েছে, তবু আমার মনে হয়, জাতিগতভাবে বাংলাদেশি হিসেবে একটি সুগঠিত, ভালো ইমেজ তৈরি করার আমাদের এখনো অনেক জায়গা বাকি, অনেক পরিসর বাকি। আর সে ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার বা সরকারি মহল থেকে অবশ্যই সার্বিকভাবে চেষ্টা চালাতে হবে ও সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ ওনাদের হস্ত অনেক বেশি প্রসারিত, ওনাদের ক্ষমতা অনেক বেশি শক্তিশালী। এ কথা সত্য, আমেরিকাসহ পুরো বিশ্বের চোখে বাংলাদেশের অবস্থান হওয়া উচিত আরও সফল, আরও সম্ভাবনাময়। ভালো ভালো কাজের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান আসা উচিত অনেক উপরে। দেশের বাইরে বসে আমরা যা করছি, করতে পারছি, দেশের ভেতরে থেকেও তার সময়োপযোগী ও আশানুরূপ প্রতিফলন হওয়া উচিত।
বাঙালি হিসেবে একজন বিদেশি বা অবাঙালির সঙ্গে যখন কথা বলি, তখন দেখি, তারা এক নামে ইন্ডিয়া, চীন বা রাশিয়াকে চেনে। তাদের উন্নয়ন ও সাফল্যের কথা জানে। কিন্তু বাংলাদেশ কী, বাংলাদেশ কোথায়, আমরা বাঙালিরা কে, সেটা বোঝাতে আমাদের অনেক বেগ পেতে হয়।
এই অবস্থার কি পরিবর্তন হওয়া সম্ভব, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার একটাই প্রশ্ন। কেন বিদেশিদের মনে বাংলাদেশ সম্পর্কে শুধু খারাপ চিত্রটাই ফুটে ওঠে? আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। অথবা আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম।
নিঃসন্দেহে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশ সম্পর্কে ভালো ইমেজ তৈরি করা খুবই অত্যাবশ্যকীয়। পাশাপাশি আমেরিকার মাটিতে জন্মানো আমাদের দ্বিতীয় প্রজন্মের ছেলেমেয়েদেরও বাংলাদেশ সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া উচিত। এই যেমন, বর্তমানে আমাদের দেশটি অনেক ক্ষেত্রেই এক বিরাট সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, সামগ্রিকভাবে ২০২৬ সালের নভেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে স্থায়ীভাবে শামিল হতে যাচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪% থেকে ৪.৭% হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির গতি, বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতৃত্বদানকারী দেশ চীনের খুব কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানার দেশ। বিশ্বের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে চীনের পরই বাংলাদেশ দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ হিসেবে তার অবস্থান ধরে রেখেছে।
পুরো পৃথিবীবাসীর কাছে বাংলাদেশকে চেনানোর যে গুরুদায়িত্বটি আমরা অভিবাসী বাঙালিরা পালন করছি, সেই ক্লান্তিহীন কাজটিতে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ। আমরা যে যেখানে থাকি না কেন, শেকড়ের টান, দেশমাতৃকার প্রতি ভালোবাসার টান আমাদের এতটুকুও কমে না।
কারণ আমাদের হৃদয়ে সব সময়ই আছে—বাংলাদেশ।
লেখক : কলামিস্ট, টেক্সাস।