প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫৭
•
অনলাইন সংস্করণ
লেবানিজ-আমেরিকান কবি, শিল্পী ও দার্শনিক-চিন্তক কাহলিল জিবরান (আসল নাম, জুবরান খলিল জুবরান) আধুনিক বিশ্বসাহিত্যের এক অনন্য নাম। ১৮৮৩ সালের ৬ জানুয়ারি লেবাননের মাউন্ট লেবানন মুতাসারিফাত অঞ্চলের বশারি গ্রামে জন্ম নেওয়া এই ম্যারোনাইট খ্রিষ্টান কবি পরবর্তীতে অভিবাসনের মাধ্যমে আমেরিকায় স্থায়ী হন এবং সেখানেই তাঁর সাহিত্যিক ও শিল্পীজীবনের বিকাশ ঘটে। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ The Prophe (১৯২৩) বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে অন্যতম সর্বাধিক অনূদিত ও পাঠকপ্রিয় বই, যা ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বইয়ের মধ্যে একটি’ হিসেবে বিবেচিত হয় এবং ১০০টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। লেখায় যেমন বলা হয়েছে : ‘এই বইটি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বইয়ের মধ্যে একটি, যা ১০০টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।’
শৈশব ও অভিবাসন : জিবরানের শৈশব ছিল দারিদ্র্য, পারিবারিক সংকট ও সামাজিক অস্থিরতায় পূর্ণ। তাঁর বাবা খলিল সাদ জিবরান ছিলেন একজন সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তি, যিনি জুয়া ও আর্থিক অনিয়মের কারণে কারাগারে বন্দী হন। পরিবারের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হওয়ায় তাঁর মা কামিলা রাহমেহ সন্তানদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের সিদ্ধান্ত নেন। ১৮৯৫ সালে তাঁরা বস্টনে পৌঁছান। নথিতে বলা হয়েছে : ‘কামিলা দৃঢ়সংকল্প করেছিলেন দেশত্যাগ করবেন এবং ১৮৯৫ সালের ২৫ জুন নিউইয়র্কের উদ্দেশে রওনা হন।’
বস্টনে জিবরান স্কুলে ভর্তি হন এবং তাঁর শিল্পীপ্রতিভা দ্রুতই শিক্ষকদের নজরে আসে। ফটোগ্রাফার ও প্রকাশক ফ্রেড হল্যান্ড ডে তাঁর প্রতিভা লালন করেন। কৈশোরে তিনি জোসেফিন পিবডি নামের এক কবির সঙ্গে পরিচিত হন, যা তাঁর জীবনে একটি আবেগময় অধ্যায় যোগ করে।
লেবাননে প্রত্যাবর্তন ও শিক্ষাজীবন : পরিবারের ইচ্ছায় জিবরানকে ১৫ বছর বয়সে আবার লেবাননে পাঠানো হয়, যাতে তিনি নিজের সংস্কৃতি ও ভাষার গভীরে প্রবেশ করতে পারেন। বৈরুতের কলেজ দে লা সেজেসে তিনি আরবি সাহিত্য ও ফরাসি ভাষা অধ্যয়ন করেন এবং ‘কলেজ কবি’ হিসেবে পরিচিতি পান। এই সময়েই তাঁর সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে এবং তিনি ইউসুফ হোওয়েকের মতো মানুষের আজীবন বন্ধুত্ব লাভ করতে সক্ষম হন।
পারিবারিক বিপর্যয় ও ব্যক্তিগত সংগ্রাম : ১৯০২-১৯০৩ সালে জিবরান পরপর তাঁর ছোট বোন সুলতানা, সৎভাই বুট্রোস এবং মা কামিলাকে হারান। লেখায় উল্লেখ আছে : ‘পরের বছর, ১২ মার্চ, বুট্রোস একই রোগে মারা যান, তার মা ২৮ জুন ক্যান্সারে মারা যান।’ এই শোক তাঁর মানসিক জগতে গভীর প্রভাব ফেলে এবং তাঁর লেখায় মানবজীবনের বেদনা, মৃত্যু ও আধ্যাত্মিকতার বিষয়গুলো আরও প্রবল হয়ে ওঠে।
মেরি হাস্কেল—সম্পর্ক, সহযোগিতা ও সৃজনশীল বিকাশ : জিবরানের জীবনে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একজন ছিলেন মেরি হাস্কেল—বস্টনের এক স্কুলপ্রধান, যিনি তাঁর শিল্পীজীবনের পৃষ্ঠপোষক, সম্পাদক, বন্ধু এবং কখনো কখনো আবেগময় সময়ের সঙ্গী ছিলেন। তিনি জিবরানের ইংরেজি লেখাগুলো সম্পাদনা করতেন এবং তাঁর প্যারিসে শিল্পশিক্ষার জন্য অর্থায়ন করেন। তাঁদের সম্পর্কের প্রকৃতি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও লেখায় বলা হয়েছে : ‘তাদের সম্পর্ক কখনোই শারীরিক ভাব পর্যন্ত গড়ায়নি।’ হাস্কেলের সহযোগিতা জিবরানের ইংরেজি লেখাকে পরিশীলিত করে এবং এর ফলস্বরূপ তাঁর আন্তর্জাতিক পরিচিতি গড়ে ওঠে।
প্যারিসে শিল্পশিক্ষা ও রাজনৈতিক চিন্তার বিকাশ : ১৯০৮-১৯১০ সালে জিবরান প্যারিসে অ্যাকাডেমি জুলিয়ানে শিল্পকলা অধ্যয়ন করেন। এখানে তিনি অগাস্ট রডিনসহ ইউরোপীয় শিল্পজগতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচিত হন। তাঁর শিল্পকর্মে প্রতীকবাদ, পৌরাণিক চিত্রকল্প এবং আধ্যাত্মিকতার মিশ্রণ দেখা যায়। সমালোচক অ্যালিস রাফায়েল তাঁর শিল্পকে ‘দ্য ভিঞ্চির অনুসন্ধানের কাছে বেশি ঋণী’ বলে মন্তব্য করেছেন।
প্যারিসে তিনি সিরিয়ার মূল রাজনৈতিক থেকে ভিন্নমতাবলম্বীদের সঙ্গে যুক্ত হন এবং অটোমান শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী চিন্তায় প্রভাবিত হন। তাঁর আরবি বই Spirits Rebellious ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের সমালোচনার জন্য বৈরুতে নিষিদ্ধ হয়।
নিউইয়র্কে স্থায়ী বসতি ও সাহিত্যিক উত্থান : ১৯১১ সালে জিবরান নিউইয়র্কে স্থায়ী হন। এখানেই তাঁর সাহিত্যিক পরিচয় পূর্ণতা পায়। তিনি সিরিয়ান-লেবানিজ অভিবাসী সমাজের সঙ্গে যুক্ত হন এবং আমিন রিহানি, মিখাইল নাইমির মতো মাহজার কবিদের সঙ্গে মেলামেশা করেন। ১৯১৮ সালে তাঁর প্রথম ইংরেজি বই The Madman প্রকাশিত হয়। ১৯২০ সালে তিনি পেন লীগ পুনরায় প্রতিষ্ঠা করেন, যা আরবি অভিবাসী সাহিত্যকে নতুন দিগন্ত দেয়।
The Prophet—বিশ্বসাহিত্যের এক মাইলফলক : ১৯২৩ সালে প্রকাশিত The Prophet জিবরানের সাহিত্যিক পরিচয়কে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত করে। বইটি ২৬টি দার্শনিক গদ্য-কবিতার সমষ্টি; যেখানে প্রেম, স্বাধীনতা, কাজ, মৃত্যু, সন্তান, ধর্মসহ মানবজীবনের মৌলিক প্রশ্নগুলো গভীর আধ্যাত্মিক ভাষায় উপস্থাপিত হয়েছে। প্রথমে সমালোচকেরা বইটিকে তেমন গুরুত্ব না দিলেও বইটির পাঠকপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে থাকে। পরবর্তীতে এটি আমেরিকান কাউন্টারকালচার আন্দোলন, নিউ এজ দর্শন এবং বিশ্বব্যাপী আধ্যাত্মিক পাঠকদের কাছে অপরিহার্য হয়ে ওঠে।
ধর্ম, আধ্যাত্মিকতা ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি : জিবরানের চিন্তায় খ্রিষ্টধর্ম, ইসলাম, সুফিবাদ, থিওসফি এবং জুঙ্গীয় মনোবিজ্ঞানের প্রভাব ছিল। তিনি ধর্মের ঐক্য ও মানবাত্মার সর্বজনীনতার কথা বলতেন। তাঁর কবিতায় লেখা আছে : ‘তুমি আমার ভাই এবং আমি তোমাকে ভালোবাসি... তুমি এবং আমি এক ধর্মের সন্তান, যা আত্মা।’ তিনি বাহাই নেতা আবদুল-বাহার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, যা তাঁর আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও গভীর করে তোলে।
রাজনৈতিক অবস্থান ও মানবতাবাদ : জিবরান অটোমান শাসনের বিরুদ্ধে ছিলেন এবং সিরিয়া-লেবাননের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলতেন। তিনি দুর্ভিক্ষে নিহত লেবানিজদের জন্য শোকগাথা লেখেন এবং আরবিকে সিরিয়ার জাতীয় ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। তবে তিনি রাজনীতিবিদ হতে অস্বীকৃতি জানান, কারণ তাঁর মতে, আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
শেষ জীবন, মৃত্যু ও উত্তরাধিকার : ১৯২৬-১৯৩১ সালে তাঁর স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটে। লিভারের সিরোসিস ও যক্ষ্মার কারণে ১৯৩১ সালের ১০ এপ্রিল তিনি নিউইয়র্কে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী তাঁর দেহ লেবাননে নিয়ে গিয়ে বশারির মার সারকিস মঠে সমাহিত করা হয়। তিনি তাঁর বইয়ের রয়্যালটি জন্মভূমির নাগরিক উন্নয়নে দান করে যান।
আজ তাঁর নামে বৈরুত, ওয়াশিংটন ডিসি, বস্টনসহ বিভিন্ন স্থানে স্মৃতিসৌধ রয়েছে। তাঁর শিল্পকর্ম বিশ্বের বহু জাদুঘরে সংরক্ষিত। এলভিস প্রিসলি, জন লেনন, জনি ক্যাশসহ বহু শিল্পী তাঁর কাজ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন।
সমাপ্তি : কাহলিল জিবরান ছিলেন এক বহুমাত্রিক স্রষ্টা-কবি, শিল্পী, দার্শনিক, মানবতাবাদী। তাঁর জীবন ছিল অভিবাসন, দারিদ্র্য, প্রেম, শোক, সংগ্রাম ও সৃজনশীলতার এক অনন্য মিশ্রণ। তাঁর রচনায় পূর্ব ও পশ্চিমের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য মিলিত হয়ে এক সর্বজনীন মানবধর্মের জন্ম দিয়েছে। The Prophet তাঁকে বিশ্বসাহিত্যের অমর আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং তাঁর চিন্তা আজও মানবমনের গভীরে আলো জ্বালায়।