দুই দিনের সফরে ঢাকায় অবস্থান করছেন পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। এরই মধ্যে সফরের প্রথম দিন শনিবার (২৩ আগস্ট) সন্ধ্যায় পাকিস্তান দূতাবাসে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় ইসহাক দার বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সম্পর্ক জোরদার করতে চায় পাকিস্তান। তিনি রোববার পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। বৈঠকে কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে।
বিএনপির নেতাদের সঙ্গে ইসহাক দারের বৈঠকের পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পৃথক পোস্টে জানায়, ইসহাক দার পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে তার দেশের অঙ্গীকারের কথা দলগুলোকে জানিয়েছেন।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা বিএনপির ছয় সদস্যের প্রতিনিধিদলে ছিলেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সেলিমা রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরী ও সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ।
ইসহাক দারের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধিদলের সাক্ষাতের বিষয়ে পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক্সে এক পোস্টে জানায়, জামায়াতের সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করা এবং দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। পাকিস্তানের মন্ত্রী বাংলাদেশে বিরূপ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জামায়াত নেতাদের সাহস ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞার প্রশংসা করেন।
জামায়াতের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন দলটির নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের। বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সার্ক সক্রিয় করা এবং দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
সূত্র জানায়, এনসিপির প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে ইসহাক দার বাংলাদেশে চলমান সংস্কার-প্রক্রিয়া, সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন। তিনি দুই দেশের তরুণদের মধ্যে যোগাযোগ ও বোঝাপড়া বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেনের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলে ছিলেন নাসিরউদ্দীন পাটওয়ারী, সারজিস আলমসহ সাত নেতা। আখতার হোসেন বলেন, এনসিপি বলেছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক হবে ভ্রাতৃত্বের, যেখানে কারও কোনো আধিপত্য থাকবে না। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ’৭১ ইস্যু নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত।
অন্তর্বর্তী সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনের সঙ্গে রোববার সকালে বৈঠকের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিনের কর্মসূচি শুরু হবে। এরপর তিনি পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবেন। বিকেলে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে তার সৌজন্য সাক্ষাতের কথা রয়েছে।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে, দুই দেশের সরকারি ও কূটনৈতিক পাসপোর্টে ভিসা অব্যাহতি চুক্তি, দুই দেশের ফরেন সার্ভিস একাডেমি, রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা বিনিময়ের বিষয়ে স্মারক সই। সাংস্কৃতিক বিনিময়ের বিষয়ে আগে সই হওয়া একটি সমঝোতা স্মারক নবায়ন হবে। দুই দেশের পণ্য ও সেবার মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা এবং কৃষি গবেষণা খাতে দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে।
সূত্র জানায়, বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার জন্য দেশটির নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা, যুদ্ধের জন্য ক্ষতিপূরণ ও যুদ্ধপূর্ব সম্পদের হিস্যাসহ অনিষ্পন্ন বিষয়গুলো তোলা হতে পারে। বাণিজ্য, যোগাযোগ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থাকে (সার্ক) সক্রিয় করাসহ আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের উপায় নিয়েও তারা কথা বলবেন।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে তাদের বাসায় যাওয়ার কথা রয়েছে।
গত বছরের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক কোনো রকমে টিকে ছিল। তার পতনের পর বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে পাকিস্তান তৎপর হয়।
পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী জাম কামাল খানও বর্তমানে সরকারি সফরে ঢাকায় রয়েছেন। গত জুলাইয়ে ঢাকা ঘুরে গেছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রীর রোববার রাতে ঢাকা ছাড়ার কথা রয়েছে।
ঠিকানা/এনআই