Thikana News
২৯ অগাস্ট ২০২৫
  1. ই-পেপার
  2. চলতি সংখ্যা
  3. বিশেষ সংখ্যা
  4. প্রধান সংবাদ
  5. আমেরিকার অন্দরে
  6. বিশ্বচরাচর
আমেরিকা শুক্রবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৫

ধর্ম অবমাননার নামে  সাম্প্রদায়িক সহিংসতা

ধর্ম অবমাননার নামে  সাম্প্রদায়িক সহিংসতা
ভারতের উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় হিন্দু উগ্রবাদীদের দ্বারা ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংসের গুজবকে কেন্দ্র করে ১৯৯০ সালের শেষ দিকে চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটে, যদিও প্রকৃতপক্ষে এসব সহিংসতার দু’বছর পর ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা ঘটে।

১৯৯০ সালে আমি তখন চাকরি সূত্রে চট্টগ্রামে থাকি। সে বছরের ৩০ অক্টোবর মধ্য রাতে চট্টগ্রাম শহরের দামপাড়া এলাকায় আমার বাসার জানালা দিয়ে একদল লোককে মশাল হাতে নিকটবর্তী চট্টেশ্বরী মন্দিরের দিকে এগিয়ে যেতে দেখি। মশালের আলোয় মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের চেহারা ও বেশভূষা দেখে তাদের অধিকাংশকে মাদ্রাসার ছাত্র বলে মনে হয়। মিছিলের অগ্রপশ্চাতে কোনো পুলিশ সদস্যকে দেখা যায়নি। কিছুক্ষণ পর মন্দিরের আশপাশে আগুনের ধোঁয়া দেখা যায়। পরে সকালে জানতে পারি, এ ধরনের একাধিক মিছিল শহরের আরও বহু মন্দিরে (আশকারদীঘিরপাড়, প্রবর্তক, জে এম সেন হল ইত্যাদি) হামলা চালিয়ে প্রতিমা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। চট্টগ্রাম শহর ও শহরের বাইরে বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের সহিংসতা ২ নভেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে, যার বিবরণ স্থানীয় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় (দৈনিক আজাদী, দৈনিক পূর্বকোণ ইত্যাদি) সবিস্তারে প্রকাশিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতা প্রতিরোধে পুলিশের তেমন কোনো ভূমিকা ছিল না বললেই চলে। এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে কাউকে গ্রেপ্তার ও বিচার করে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, এমন খবর পাওয়া যায়নি, যা প্রকারান্তরে পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময়ে ধর্মান্ধ, মৌলবাদী গোষ্ঠীকে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন অজুহাতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মন্দির, বাড়ি-ঘর ও দোকানপাটে হামলা চালাতে উৎসাহিত করে বলে প্রতীয়মান হয়।

এ ধরনের ধর্মীয় সহিংসতার সর্বশেষ ঘটনাটি ২৬ জুলাই রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বেতগাড়ি ইউনিয়নের একটি গ্রামে সংগঠিত হয়। জনৈকি হিন্দু তরুণের ইসলাম ধর্মের মহানবী (সা.) সম্পর্কে কথিত কটূক্তিকে কেন্দ্র করে উত্তেজিত একদল লোক ওই গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের একাধিক বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে বলে অভিযোগ করা হয়। ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে এরইমধ্যে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক ও মানবাধিকার সংগঠন (সিপিবি, নারীপক্ষ ইত্যাদি) বিবৃতি দিয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও শাস্তির দাবি জানিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার হামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দান ও তাদের পুনর্বাসনের জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছে। এই ঘটনায় আপত্তিকর বক্তব্য দানকারী তরুণকে গ্রেফতার করা হলেও, ঘটনার সঙ্গে জড়িত খুব কমসংখ্যক ব্যক্তিকেই গ্রেফতার করা হয় বলে অভিয়োগ করা হয়, যদিও সব দোষী ব্যক্তিকে গ্রেফতারের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে বলে স্থানীয় পুলিশ সূত্রে বলা হয়। ধর্ম অবমাননার কারণে সংঘাত-সহিংসতার ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়। অতীতে ভারতীয় উপমহাদেশে ছাড়াও বিশ্বের বহু দেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটার নজির রয়েছে।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ মার্কিন লেখক সালমান রুশদী তার ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’ উপন্যাসে ইসলাম ধর্ম ও মহানবী (সা.) অবমাননা করেছেন অভিযোগ করে তার বিরুদ্ধে বিশ্বের বহু দেশে ব্যাপক প্রতিবাদ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ প্রায় কুড়িটি দেশে বইটি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। ইরানের তৎকালীন শীর্ষ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি বইটিকে ইসলাম ধর্মের জন্য ক্ষতিকর ও অবমাননাকর দাবি করে সালমান রুশদীকে হত্যার ফতোয়া দেন, যদিও বইটি আদৌ না পড়েই তিনি এই ফতোয়া দেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। বইটি নিয়ে জনমানুষের মধ্যে সৃষ্ট ব্যাপক ক্ষোভ লক্ষ্য করে তা লাঘবে সালমান রুশদী ব্রিটিশ রবিবাসরীয় পত্রিকা দ্য অবজার্ভারে কলাম লিখে হজরত মোহাম্মাদ (সা.)-কে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একজন প্রতিভ হিসাবে উল্লেখ করলেও সেই প্রচেষ্টা তার নেতিবাচক ভাবমূর্তির পরিবর্তনে কতটা সফল হয়েছে, তার নিয়ে বিতর্ক রয়েছে (Too little too late)। ২০২২ সালে নিউইয়র্কে শহরের উপকণ্ঠে অনুষ্ঠিত এক সভায় বক্তব্য দিতে মঞ্চে উঠলে জনৈকি ব্যক্তি তার ওপর হামলা চালিয়ে তাকে গুরুতর আহত করে। হামলায় তার এক চোখ, হাত ও লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফ্রান্সের প্যারিস থেকে প্রকাশিত স্যাটায়ারধর্মী পত্রিকা ‘চার্লি হেবডো’তে ২০১৫ সালে মহানবী (সা.) সম্পর্কে ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন ছাপার কারণে ফ্রান্সে জন্মগ্রহণকারী দুই আলজেরীয় তরুণ ওই পত্রিকা অফিসে হামলা চালিয়ে পত্রিকার ১২ জন কর্মীকে হত্যা করে। নিকট অতীতে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পাকিস্তানে একাধিক ঘটনা ঘটতে দেখা যয়। একটি ঘটনায় ধর্ম অবমাননা আইন (Blasphemy Law) লঙ্ঘনের অভিযোগে পাকিস্তানের একটি আদালত আসিয়া বিবি নামের একজন খ্রিষ্টান মহিলাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। পরে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট সেই আদেশ বাতিল করে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রাণভয়ে তাকে শেষপর্যন্ত পাকিস্তান ছেড়ে কানাডায় চলে যেতে হয়। অন্য এক ঘটনায় ধর্ম অবমাননা আইনের বিরোধিতা করে অভিমত প্রকাশ করায় পাঞ্জাব প্রদেশের তৎকালীন গভর্নর সালমান তাসির তার নিজের দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হন।

ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে তার নিজ ধর্মের প্রতি প্রচণ্ড  ভালোবাসা ও আবেগ থাকাটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো ধর্ম ও সেই ধর্মের পবিত্র ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের প্রতি কটূক্তি ও অশ্রদ্ধা প্রদর্শন শুধু অনভিপ্রেতই নয় গর্হিত একটি কাজও বটে। এ কারণে এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে সবার বিরত থাকাই সমীচীন ও কাম্য। তবে দু-একজনের বিচ্ছিন্ন কোনো উক্তি ও কাজের জন্য পুরো সম্প্রদায়কে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে তাদের ওপর হামলা ও সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। মনে রাখা প্রয়োজন, ধর্ম কোনো কচু পাতার পানি নয়, যেটা কারো কোনো উক্তি বা কাজে মলিন হয়ে যেতে পারে।

ধর্মীয় অনুভূতির দোহাই দিয়ে বর্তমান হামলা পূর্বে সংগঠিত হামলারই ধারাবাহিকতার অংশ। এ ধরনের হামলা বারংবার ঘটলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়, যা ইনডেমনিটির (দায়মুক্তি) সংস্কৃতি তথা বিচারহীনতার এক ভয়াবহ নজির গড়ে তুলেছে, যার আশু অবসান হওয়া বাঞ্ছনীয়।
এসব ঘটনাকে ধর্মীয় সহিংসতা হিসেবে বিবেচনা করে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার হওয়া দরকার। কারণ এগুলো কেবল মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘনই নয়, সংবিধানে প্রদত্ত সব নাগরিকের সমান অধিকারের পরিপন্থিও বটে।

ধর্ম নিরপেক্ষতার নীতির অগ্রগণ্য প্রচারক জার্মান ঐতিহাসিক ও সমাজবিদ ম্যাক্স ওয়েবার আধুনিকায়ন ও অর্থনৈতিক প্রগতির মাধ্যমে সমাজে ধর্মব্যবসায়ী ও কাঠমোল্লাদের দৌরাত্ম্য ও প্রভাব খর্ব করা সম্ভব বলে মনে করেন। কাক্সিক্ষত আধুনিকায়ন ও অর্থনৈতিক প্রগতি অর্জনের পূর্ব পর্যন্ত সময়ে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচার ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে সহিংসতার ঘটনা বহুলাংশে হ্রাস পেতে পারে বলে সুধী মহল মনে করেন। লেখক : কলামিস্ট।
 

কমেন্ট বক্স