পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিফ মুনির অতি সম্প্রতি ভারত ও সোশ্যাল মিডিয়ায় এক ঝড় তুলে দিয়েছেন। তিনি নাকি ফ্লোরিডার টেম্পা শহরে পাকিস্তানি ইমিগ্র্যান্টদের সঙ্গে এক নৈশভোজে তিনটি হুমকি দিয়েছেন : (১) একটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ হিসেবে তার দেশের অস্তিত্ব বিপন্ন হলে তারা পৃথিবীর অর্ধেক ধ্বংস করে দেবেন, (২) ভারত যদি সিন্ধু নদীর পানিপ্রবাহে বাঁধ দিয়ে বাধার সৃষ্টি করে, পাকিস্তান ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে তা উড়িয়ে দেবে এবং (৩) ভারত একটি নতুন ঝকঝক করা মার্সিডিজ বেঞ্চ গাড়ি আর পাকিস্তান একটি পুরোনো ভাঙা মালবাহী ট্রাক, উভয়ে ধাক্কা লাগলে কার বেশি ক্ষতি!]
এখনো এই সংবাদটি মূলধারার কোনো গণমাধ্যমে আসেনি। প্রথমে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট, তারপর সকল ভারতীয় ইউটিউবারদের কন্টেন্ট এবং এসবের ওপর ভিত্তি করে ভারত সরকারের প্রতিক্রিয়া। গত মে মাসে পাক-ভারত যুদ্ধে ভারতীয় মিডিয়ার মিথ্যাচার নিয়ে বিশ্বের সকল বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যমÑনিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, বিবিসি, আল-জাজিরার তীব্র সমালোচনার আলোকে এই খবরটি নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ আছে। আসিফ মুনির ভারত-বিরোধী বক্তব্য দেবেন, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, কিন্তু তিনি পৃথিবীর অর্ধেক ধ্বংস করে দেবেন, এমনটি বলবেন কেন? ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ে বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যানের আসিফ মুনিরকে নিয়ে লেখায় শুধু ভারতকে ধ্বংসের কথা বলা হয়েছে, পৃথিবীর অর্ধেক নয়। ফিল্ড মার্শাল আসিফ মুনির বর্তমানে আমেরিকা সফরে আছেন, এটা সত্য। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান মাইকেল করিলার অবসরে যাওয়ার অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছেন বলে পাকিস্তানি সূত্রের খবরে বলা হয়। কিন্তু ফ্লোরিডার সেই ‘ব্ল্যাক টাই ডিনারে’ কোনো ভারতীয়কে দাওয়াত করা হয়নি। ক্যামেরা, ফোন বা কোনো রেকর্ডিং ডিভাইস নিষিদ্ধ ছিল। তাহলে ভারতীয় মিডিয়া কীভাবে জানল? ভারতীয় জনপ্রিয় ইউটিউবার পালকি সারমা বলেছেন, ডিনারে উপস্থিত বিভিন্ন জনের সূত্র থেকে তিনি জেনেছেন। যা-ই হোক, ভারতীয় মাধ্যমের এই খবরটির দটি ব্যাখ্যা হতে পারে : (১) তিনি শুধু ভারতকে লক্ষ করেই বলেছেন যে ভারতকে ধ্বংস করে দেবেন, পৃথিবীর অর্ধেক কথাটা বলেননি। কিন্তু ভারতীয় মিডিয়ার পাকিস্তান-বিরোধী প্রোপাগান্ডার কৌশল হিসেবে ওই কথাটা জুড়ে দেওয়া হয়েছে। ওই কথাটা জুড়ে দেওয়ার তাৎপর্য হলো, পৃথিবীর অর্ধেকের মানে হলো ইসরায়েল। ইসরায়েলকে ধ্বংস করে দেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে আমেরিকা-ইসরায়েল উভয়েই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লাগবে। (২) আর যদি আসিফ মুনির সত্যি বলে থাকেন, তাহলে তিনি স্বজ্ঞানেই আমেরিকা ও ইসরায়েলকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, আমাদের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে খেলতে এসো না।
একটি মুসলিম দেশে পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে, ইসরায়েল পর্যন্ত পৌঁছাবে, এটা ইসরায়েল বা আমেরিকা কী করে চুপ করে থাকবে? ২০২৫ সালের এপ্রিলে ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে দুটি রিপোর্ট ছাপে। ১৯৮৩ সালে নাকি ভারত ও ইসরায়েল যৌথভাবে পাকিস্তানের পারমাণবিক ল্যাবরেটরিতে হামলার পরিকল্পনা করে। সে সময় মার্কিন-সোভিয়েত ইউনিয়নের স্নায়ুযুদ্ধে পাকিস্তান আমেরিকার সঙ্গে থাকায় সিআইএ সে পরিকল্পনা ফাঁস করে দিলে ভারতের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। দ্বিতীয় রিপোর্টে বলা হয়, বর্তমান মার্কিন প্রশাসন পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন, তা ধ্বংস করতে নানা পরিকল্পনা করছে। আমেরিকা/ইসরায়েল যেভাবে ইরান, ইরাক ও লিবিয়ার পারমাণবিক প্রকল্প মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে, তাতে মনে করার কারণ আছে যে বর্তমান পাকিস্তান-আমেরিকা প্রেম সে পরিকল্পনারই একটি অংশ। একটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশের সামরিক প্রধান হিসেবে আসিফ মুনির মার্কিন/ইসরায়েলি পরিকল্পনা জানবেন না, তা কী করে হয়! তাই হয়তো তিনি আমেরিকার মাটিতে বসেই তাদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন।
ভারত-আমেরিকার মধ্যে বর্তমানে শুল্ক নিয়ে সম্পর্কের অবনতি দেখা দিলেও পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে আমেরিকা-ইসরায়েল-ভারত যৌথভাবে কাজ করবে, সে ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ খুব কম। ভারতের নরেন্দ্র মোদি হয়তো কোনোভাবে ট্রাম্পের ইগোতে আঘাত করে কিছুটা দূরত্ব তৈরি করে দিয়েছেন, কিন্তু এ দূরত্ব দীর্ঘদিন থাকবে না, এটা শতভাগ নিশ্চিত।
এখন চীন পাকিস্তানের পরীক্ষিত বন্ধু। কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এখন আমেরিকার উষ্ণ আহ্বানে পাকিস্তানের শাসকশ্রেণি কতটুকু সাড়া দেবে, তা দেখতে আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। তবে পাকিস্তানের ইতিহাস বলে, পাকিস্তান কখনোই তাদের জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে আপস করে না।
-নিউইয়র্ক