Thikana News
২৯ অগাস্ট ২০২৫
  1. ই-পেপার
  2. চলতি সংখ্যা
  3. বিশেষ সংখ্যা
  4. প্রধান সংবাদ
  5. আমেরিকার অন্দরে
  6. বিশ্বচরাচর
আমেরিকা শুক্রবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৫

সজীব ওয়াজেদ জয়ের স্বপ্নবিলাস

সজীব ওয়াজেদ জয়ের স্বপ্নবিলাস
উনিশ শতকের বাঙালি কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় তার ‘স্বাধীনতা হীনতা’ কবিতায় লেখেন, ‘স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায়।’ স্বাধীনতাহীনতায় যেমন কেউ বাঁচতে চায় না, তেমনি স্বপ্ন দেখা ছাড়াও কেউ বাঁচতে চায় না। কমবেশি স্বপ্ন দেখতে পছন্দ করেন না, এমন মানুষের সংখ্যা বিরল। কেবল স্বপ্নের মাধ্যমেই রাজা-উজির মারা বা বনে যাওয়া, বিপুল অর্থবিত্তের মালিক, অপরূপ সুন্দরী রমণীর সঙ্গ-সাহচর্য ও জীবনসঙ্গী হওয়াসহ আরও কত কিছুর প্রত্যাশা কারা যায়। সে জন্যই স্বপ্নবিলাস মানুষের কাছে এত প্রিয় একটা বিষয়।

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ও অন্য সবার মতো স্বপ্নবিলাসী একজন মানুষ। সম্প্রতি তার দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি আগামী নির্বাচনে তার দল আওয়ামী লীগের আবার ক্ষমতায় ফিরে আসার স্বপ্নবিলাস ব্যক্ত করেছেন, যদিও বহু মহল নির্বাচনে বিজয় দূরের কথা, আওয়ামী লীগার হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গণধোলাই ও অতীতে নানা অপকর্মে লিপ্ত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়ার ভয়ে (যেমনটি সম্প্রতি আওয়ামী সমর্থক টিভি অভিনেতা সিদ্দিকের ক্ষেত্রে ঘটেছে) নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য আগ্রহী হতে কেউ এগিয়ে আসবেন কি না, সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ পোষণ করেছেন। অভিনেতা সিদ্দিককে যেভাবে হেনস্তা করা হয়েছে, সেটা অবশ্য সমর্থনযোগ্য নয়।

জয়ের নানা শেখ মুজিব তার ভাগনে শেখ মণি ও অন্য কয়েকজন সমমনা নেতার পরামর্শে দেশে মুজিববাদ প্রতিষ্ঠার এক অলীক স্বপ্ন দেখেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশে মুজিব পরিবারের দীর্ঘ একচ্ছত্র শাসন প্রতিষ্ঠা করো। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে দলের বিজয় নিশ্চিত জানা সত্ত্বেও শেখ মুজিব সেই বিজয় যাতে কোনো কারণে চোরাবালিতে আটকে না পড়ে, সেটা পাকাপোক্ত করতে সংসদের ৩০০ আসনের ২৯২টিতে নিজ দলের বিজয় নিশ্চিত করেন। তথ্যমতে, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রধান রামনাথ কাউ-এর (আরএন-কাউ) পরামর্শে নিজের ক্ষমতার মসনদকে কণ্টকমুক্ত ও চিরস্থায়ী করতে তিনি দলীয় ক্যাডারদের সমন্বয়ে ‘লাল বাহিনী’ ও সেনাবাহিনীর যেকোনো ধরনের সম্ভাব্য মুজিব বিরোধিতা রুখে দিতে রক্ষীবাহিনী গঠন করেন, যে বাহিনীতে কেবল তার একান্ত অনুগত লোকজনকেই বেছে বেছে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। শেখ মুজিব তার বিরোধীদের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে হুংকার দেন, কেউ বাড়াবাড়ি করলে তিনি তার দিকে লাল ঘোড়া দাবড়ে দেবেন। সিরাজ সিকদার তার লাল ঘোড়া দাবড়ানোর প্রথম শিকার। তথ্যমতে, মুজিবের স্বল্পকালীন সাড়ে তিন বছরের রাজত্বে সিরাজ সিকদারের মতো আরও হাজারো (মতান্তরে প্রায় ১৫ হাজার) ভিন্ন মতাবলম্বী মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হন। ’৭৪-এর দুর্ভিক্ষ ও পরে একদলীয় বাকশাল কায়েমের ঘটনা তার দীর্ঘস্থায়ী শাসন কায়েমের স্বপ্নের কফিনে শেষ পেরেক মেরে দেয়।

রাজনীতির মঞ্চ থেকে মুজিব পর্বের পরিসমাপ্তির প্রায় দুই দশক পর নানা ঘটনা পরিক্রমায় তার কন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হন। পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দিন থেকে তিনি ফ্যাসিবাদী শাসকের এক ভয়ংকর রূপে আত্মপ্রকাশ করেন।
সেনাবাহিনী, পুলিশসহ প্রশাসনের সর্বস্তরে তিনি তার ইয়েসম্যানদের বসিয়ে এবং দুর্নীতির মাধ্যমে তাদেরকে বিপুল অর্থবিত্ত অর্জনের সুযোগ করে দিয়ে তিন-তিনটি প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে দীর্ঘ দেড় দশক ধরে দেশ শাসনের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা বনে যান। এ সময়ে যথেচ্ছ দুর্নীতি, গুম, খুন ছাড়াও বিরোধী পক্ষের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে বিপুলসংখ্যক বিরোধী নেতাকর্মীকে মামলা ও নানা অজুহাতে জেলে পাঠানো হয়। বাংলাদেশকে তিনি নিজের জমিদারি হিসেবে গণ্য করে দেশে স্বৈরশাসনের এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির জন্ম দেন। ‘দেশটা আমার বাপের, আমার বাপ এদেশ স্বাধীন করেছেন’ উক্তি করে তিনি সে অনুযায়ী তার সব কর্মপরিকল্পনা সাজান।

নিজের পিতা শেখ মুজিবকে মহিমান্বিত এবং মর্যাদা ও সম্মানের সুউচ্চ শিখরে প্রতিষ্ঠার জন্য দেশের হাজার হাজার স্থাপনা তার নামে নামকরণ ছাড়াও তার অসংখ্য মূর্তি ও ম্যুরাল দেশের সর্বত্র স্থাপন করা হয়। পাঠ্যপুস্তক, শিল্প-সাহিত্য, সিনেমায় তাকে অতিমানব হিসেবে উপস্থাপনের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নেওয়া হয়। কোনো একজন ব্যক্তিকে মহিমান্বিত করার এ রকম মহাকর্মযজ্ঞ বিশ্বে বিরল। অন্যদিকে তিনি বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় অপার শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় সিক্ত নেতা কমল (জিয়াউর রহমান) ও দেশের একমাত্র নোবেলজয়ী সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে দেশবাসীর কাছে হেয় ও নিচু প্রতিপন্ন করতে এমন কোনো প্রচেষ্টা নেই, যা করতে দ্বিধা করেননি। জিয়াকে রাজাকার বলতেও তিনি কসুর করেননি।

প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ২৫তম প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ম্যাকিনলি বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একজন পছন্দের মানুষ। একসময় আলাস্কার ডেনলি পর্বতের নাম বদল করে উইলিয়াম ম্যাকিনলি পর্বত নামকরণ করা যায়। পরে সেখানকার আইনসভার এক সিদ্ধান্তে পর্বতের পুরোনো নাম বহাল করা হয়। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করে ট্রাম্প নিকট অতীতে উইলিয়াম ম্যাকিনলির নামে নতুন একটি পর্বতের নামকরণের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। অনেককে তার ইচ্ছার সমালোচনা করতে দেখা যায়। শেখ মুজিবের ক্ষেত্রে এ ধরনের সমালোচনার দুঃসাহস দেখানোর ক্ষমতা কারও ছিল না।

সীমালঙ্ঘনের অমোঘ প্রতিফল হিসেবে ছাত্র-জনতার বিপ্লবে শেখ হাসিনাকে জীবন বাঁচাতে মসনদ ছেড়ে দেশত্যাগ করতে হয়। তার দল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি ইস্যুতে কিছু বড় দল ও প্রভাবশালী মহলের (প্রধান উপদেষ্টা, সেনাপ্রধান প্রমুখ) মধ্যে বিদ্যমান মতভেদ ও সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি (পাক-ভারত যুদ্ধ) সজীব ওয়াজেদ জয় ও তার মতো অনেককে রাজনীতিতে আবার সক্রিয় হতে অনুপ্রেরণা জোগায় বলে প্রতীয়মান হয়। জয়ের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের বেশ কিছু ঝটিকা মিছিল থেকে সেটা সহজেই আন্দাজ করা যায়। পর্বতসম দুর্নীতি, অপকর্ম ও গণহত্যার মতো ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের পরও বিনা বিচারে ক্ষমতায় ফেরার স্বপ্ন দেখার পূর্বে সেসব অপরাধের কারণে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর চিন্তা মাথায় রাখাটা জয়ের জন্য সুবিবেচনাপ্রসূত হবে বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি।
লেখক : কলামিস্ট
 

কমেন্ট বক্স