চারশত বছর পর ঢাকায় সুলতানি-মোগল জমানার ঐতিহ্য। ঈদের আনন্দমিছিল। আয়োজক ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন- ডিএনসিসি। ঈদের নামাজ শেষে আগারগাঁও থেকে শুরু হয়ে সংসদ ভবনের সামনে শেষ হয় মিছিলটি। এতো বছর কার, কেনো মনে পড়লো একদিনের সালতানাতির?
ইতিহাস বলছে, ঈদে রাজমহলের সবার জন্যই নতুন পোশাক বানানো হতো। চাকর-নফর, হুকুমবরদার, বাবুর্চি, মাহুত- কেউ বাদ পড়তো না। হেরেমেও সেলাইর ধুম পড়তো। রমজানের ২৯তম দিনে চাঁদ দেখার জন্য প্রতিনিধি পাঠানো হতো। প্রত্যেকেই চাঁদ দেখার জন্য অধীর আগ্রহে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। কেউ চাঁদ দেখলে বা কোথাও থেকে চাঁদ দেখার খবর পেলে শুরু হতো উৎসব। ঠিক ওই রকম করা না গেলেও যতোটুকু হয়েছে, কম কি?
ঈদের নামাজ শুরুর ঘন্টাখানেক আগেই বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ঢল নামে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে, পুরনো বাণিজ্যমেলা মাঠে। সবার মধ্যে ছিলো ঈদ উদযাপনের এক অনাবিল আনন্দ। অনেকেই এসেছেন পরিবারের সবাইকে নিয়ে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রাজধানীতে ব্যান্ড পার্টি, বাদ্যযন্ত্র, সুসজ্জিত শাহী ঘোড়া, ঘোড়ার গাড়ি দিয়ে ঈদ মিছিল তো হয়েছে। নগরবাসীর প্রত্যাশা আগামীতে এই আয়োজন যেনো আরো সমৃদ্ধ হয়। এ আশা কি বেশি কিছু?
উত্তর সিটির চেয়ে দক্ষিণ সিটি এ আনন্দের ভলিউম আরো বাড়ানোর আয়োজন করুক। এবারই প্রথম ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আয়োজনে খোলা মাঠে ঈদের বড় জামাত অনুষ্ঠিত হয়। পুরুষের পাশাপাশি ছিলো নারীদের জন্য আলাদা নামাজের জায়গা। ঈদের নামাজ পড়ার এই সুবিধা ঘরে থাকা নারীদের জন্য আনন্দ আরো বাড়িয়েছে। ঈদ র্যালিতে অংশ নেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজসহ আগত মুসল্লিরা। এই আনন্দের দিনে মাত্র মাস কয়েক আগে ছাত্রগণ আন্দোলনের শহীদ পরিবারগুলোর কী অবস্থা- সেই খোঁজ কি নেয়া হয়েছে?
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ঘটেছে দেশের ইতিহাসে অভূতপূর্ব পটপরিবর্তন। শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থান, ৩০ দিনের রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের পর অবসান হয় শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসন। শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি আদায়ের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে সরকারের নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাকর্মীদের নির্বিচার গুলিতে ঝরে যায় প্রায় দেড় সহস্রাধিক তাজা প্রাণ। আহত হন প্রায় ৩০ হাজার ছাত্র-জনতা। গত ঈদে যে স্বজনরা অপেক্ষা করেছিল তাদের প্রিয়জনের বাড়ি ফেরার, সেই সুলতানরাই দিয়ে গেছে এই সালতানাৎ। কদ্দূর মনে রেখেছি তাদের কথা?
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের বেডে শুয়ে-বসে ঈদ পালন করেছেন জুলাই আন্দোলনের সম্মুখ সারির যোদ্ধারা। কারো কাটা পড়েছে হাত, কারো বা পা। পরানো রয়েছে রিং। এই যোদ্ধারা বলছেন, নিজেরা কষ্টে থাকলেও মুক্ত বাংলাদেশে লাখো মানুষ আনন্দে ঈদ উৎযাপন করতে পারছেন, এতেই তারা খুশি। আসলে কি খুশি?
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন, ঢাকা।