শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ :

শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

মামা মতিউর রহমান চৌধুরী ঠিকানার স্বার্থে হয়ে গেলেন ‘মতি ভাই’

মামা মতিউর রহমান চৌধুরী ঠিকানার স্বার্থে হয়ে গেলেন ‘মতি ভাই’

বিজ্ঞাপন
১.
বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে যাঁদের নাম গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তাঁদের অন্যতম মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী। তিনি শুধু একজন সম্পাদক নন; তিনি একাধারে অনুসন্ধানী সাংবাদিক, প্রাজ্ঞ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষক, শক্তিমান কলামিস্ট, সংবাদপত্র উদ্যোক্তা এবং অসংখ্য সাংবাদিকের প্রেরণার উৎস। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে সত্য অনুসন্ধান, নির্ভীক সংবাদ পরিবেশন এবং রাজনৈতিক-কূটনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ঘটনাপ্রবাহের গভীরে পৌঁছে যাওয়ার অসামান্য সক্ষমতা তাঁকে দেশের গণমাধ্যমে এক অনন্য ও স্বতন্ত্র উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মাঝারি গড়নের ছিমছাম এই মানুষটি কখনো উচ্চকণ্ঠ নন; কিন্তু তাঁর লেখনী সব সময়ই তীক্ষ্ন ও তথ্যনির্ভর। ব্যক্তিজীবনে তিনি অত্যন্ত আন্তরিক, বিনয়ী ও সহজ-সরল-যে গুণগুলো তাঁকে সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী এবং পাঠকের কাছে আরও আপন করে তুলেছে। মাঠপর্যায়ের একজন সংবাদকর্মী থেকে দেশের অন্যতম প্রভাবশালী সম্পাদক-প্রকাশক হয়ে ওঠার তাঁর দীর্ঘ যাত্রা পেশাগত সততা, অবিচল নিষ্ঠা, আত্মবিশ্বাস এবং সত্যের প্রতি অঙ্গীকারের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

২.
মতি মামার সঙ্গে দেশের রাজনীতি, গণমাধ্যম, প্রবাস, সিলেটের উন্নয়ন এবং সিলেটিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে মাঝেমধ্যে আলোচনা হতো। দেশে গেলে সুযোগ পেলেই তাঁর বাসায় ছুটে যেতাম; কখনো কখনো সেখানেই কেটে যেত রাত। তাঁর বাসাটি যেন আমার কাছে শুধুই একটি ঠিকানা নয়Ñনিউইয়র্ক আর কুলাউড়ার মাঝামাঝি পথের এক আপন আশ্রয়ে পরিণত হয়েছিল। সেখানে ছিল আন্তরিকতার উষ্ণতা এবং স্নেহের পরশ।

৩.
ঠিকানা পত্রিকার শুরুর দিনগুলোর সাক্ষীদের নিশ্চয়ই আজও স্মরণ থাকার কথা-প্রায় প্রতি সপ্তাহেই পত্রিকার প্রধান বা লিড প্রতিবেদন লিখতেন মতিউর রহমান চৌধুরী। তাঁর প্রতিটি লেখা ছিল তথ্যসমৃদ্ধ, বিশ্লেষণধর্মী এবং সময়ের চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে থাকা দূরদৃষ্টির পরিচায়ক। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর লেখাগুলো ঠিকানাকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে একটি গ্রহণযোগ্য, নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য সংবাদপত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে অনন্য ভূমিকা রেখেছিল। আজকের প্রজন্ম হয়তো কল্পনাও করতে পারবে না, সেই সময় সংবাদ আদান-প্রদানের পথ কতটা দুর্গম ও শ্রমসাধ্য ছিল। তখন না ছিল ইন্টারনেট, না ইমেইল, না মোবাইল ফোনের সুবিধা। একটি ফ্যাক্স পাঠাতে ছুটতে হতো ঢাকার জিপিওতে, আর দেশে একটি ফোন করতে হলে ট্রাঙ্ককল বুকিং দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো। প্রতিকূল সেই দিনগুলোতে তাঁর নিয়মিত লেখা, মূল্যবান পরামর্শ এবং অকুণ্ঠ সহযোগিতা ছিল ঠিকানা পরিবারের জন্য এক অমূল্য প্রাপ্তি। তাই ঠিকানার প্রতিষ্ঠা ও বিকাশের ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর নাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

৪.
ঠিকানা পত্রিকার পেশাগত নিরপেক্ষতা ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে আমি সচেতনভাবেই আমাদের পারিবারিক সম্পর্কটিকে আড়ালে রেখেছিলাম। ব্যক্তিগত সম্পর্কে তিনি আমার মামা হলেও কাজের সূত্রে আমি তাঁকে ‘মতি ভাই’ বলেই সম্বোধন করতাম। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে আমাদের সম্পর্কটি যেন দুটি সমান্তরাল পথে চলেছেÑএকটিতে পেশাগত শ্রদ্ধা, অন্যটিতে নীরব আত্মীয়তার বন্ধন।

একবার কুলাউড়ার কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন। সে সময় তিনি আমাদের বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন। আমার আম্মা বিষয়টি লক্ষ করে বিস্মিত হয়ে যান। তাঁর কাছে বিষয়টি ছিল একেবারেই অস্বাভাবিকÑতাঁর মামাতো ভাইকে আমি কেন ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করছি! পরে তিনি আমাকে এ নিয়ে বেশ বকাঝকাও করেছিলেন। সেদিন থেকেই তিনি আবার আমার ‘মতি মামা’ হয়ে ওঠেন।

৫.
একটি বিষয় আমাদের আলোচনায় বারবার ফিরে আসত। আমরা দুজনই মনে করতাম, শিক্ষা, মেধা, প্রবাসী সাফল্য এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিচারে সিলেটিরা দেশের অন্যতম অগ্রসর জনগোষ্ঠী হলেও জাতীয় গণমাধ্যমের মালিকানা ও নেতৃত্বে তাঁদের উপস্থিতি আজও বিস্ময়করভাবে সীমিত। কেন সিলেটের সফল ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা এই গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী খাতে আরও বেশি বিনিয়োগে এগিয়ে আসেননিÑএই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর আজও খুঁজে পাইনি।
কখনো কখনো ভাবতাম, বিশ্বের একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীÑইহুদি (জিউইশ) সম্প্রদায়ের কথা। সংখ্যায় সীমিত হলেও জ্ঞান, গবেষণা, প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তাঁদের প্রভাব অত্যন্ত বিস্তৃত। তখন মনে প্রশ্ন জাগত, মেধা ও আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আমাদের সিলেটি সমাজ কেন শক্তিশালী ও প্রভাবশালী গণমাধ্যম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আরও দূরদর্শী, সাহসী ও সংগঠিত হতে পারেনি?

এই প্রসঙ্গ এলেই মনে পড়ে যায় মতি মামার সংগ্রামের দিনগুলোর কথা। গ্রিন রোডে (বর্তমান গ্রিন সুপার মার্কেট-সংলগ্ন) তাঁর একটি ছোট্ট, জীর্ণ-শীর্ণ দোতলা বাড়ি আজও চোখে ভাসে। বিশাল কোনো শিল্পগোষ্ঠী কিংবা করপোরেট সাম্রাজ্যের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল না, ছিল না কোনো করপোরেট সাম্রাজ্যের শক্তি। ছিল শুধু একজন মাঠের সাংবাদিকের অদম্য স্বপ্ন, সাহস, পরিশ্রম এবং নিজের মেধার ওপর অগাধ বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসকে পুঁজি করেই ১৯৯৪ সালের ১ জানুয়ারি ওই ছোট্ট বাড়ি থেকেই তিনি প্রকাশ করেন দৈনিক বাংলাবাজার। তিনি ছিলেন পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও উদ্যোক্তা।

অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাবাজার দেশের সংবাদপত্র জগতে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে। কিন্তু একটি জাতীয় দৈনিক পরিচালনা করা শুধু সাংবাদিকতার নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও ছিল অত্যন্ত কঠিন চ্যালেঞ্জ। পত্রিকাটি টিকিয়ে রাখতে তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। নিজের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রাখতে শেষ পর্যন্ত তাঁকে বিক্রি করে দিতে হয় তাঁর একমাত্র বাড়িটিও।

পরবর্তীতে সেই জায়গায় নির্মিত বহুতল ভবনের একটি অ্যাপার্টমেন্ট আমিও কিনেছিলাম এবং নিউইয়র্ক থেকে ফিরে বহু বছর সেখানে বসবাস করেছি। ঘটনাটি আমার কাছে শুধু একটি ব্যক্তিগত স্মৃতি নয়; এটি একজন সাংবাদিকের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের এক জীবন্ত দলিল। নিজের বিশ্বাস ও আদর্শকে ধরে রাখতে একজন সম্পাদক কত বড় মূল্য দিতে পারেন, তার এক বিরল উদাহরণ এটি।

কিন্তু এত কিছুর পরও একজন সাংবাদিকের একার পক্ষে একটি জাতীয় দৈনিকের বিপুল ব্যয় বহন করা সম্ভব ছিল না। নানা প্রতিকূলতার মুখে শেষ পর্যন্ত তাঁকে দৈনিক বাংলাবাজার-এর মালিকানা কসকো গ্রুপের মালিক জাকারিয়া সাহেবের কাছে হস্তান্তর করতে হয়। নিজের হাতে গড়ে তোলা একটি সফল সংবাদপত্রের মালিকানা ছেড়ে দেওয়া যেকোনো উদ্যোক্তার জন্যই বেদনাদায়ক; মতি মামার জন্যও নিশ্চয়ই তা ছিল গভীর কষ্টের এক অধ্যায়।
তবে তিনি থেমে থাকার মানুষ নন। নতুন স্বপ্ন ও নতুন প্রত্যয় নিয়ে তিনি আবার শুরু করেন পথচলা। বাংলা মোটরের ওয়ালসো টাওয়ারের নিচতলা থেকে নতুন উদ্যমে শুরু করেন নতুন অভিযান। ১৯৯৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ করেন বাংলাদেশের প্রথম বাংলা ট্যাবলয়েড দৈনিক মানবজমিন।

সেই সময় অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন-বাংলা ভাষায় ট্যাবলয়েড ফরম্যাটের একটি দৈনিক কতটা সফল হতে পারবে? কিন্তু মতিউর রহমান চৌধুরী আবারও প্রমাণ করেন, সাহসী চিন্তা, নতুনত্ব গ্রহণের মানসিকতা এবং পাঠকের মন বোঝার সক্ষমতা থাকলে নতুন ধারার উদ্যোগও সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে পারে।
অল্প সময়ের মধ্যেই মানবজমিন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ও বহুল প্রচারিত বাংলা ট্যাবলয়েড দৈনিকে পরিণত হয়। শুধু পাঠকপ্রিয়তাই নয়, পত্রিকাটি হয়ে ওঠে সাংবাদিক তৈরির এক উর্বর পাঠশালা। দেশের বহু খ্যাতিমান সাংবাদিক তাঁদের পেশাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু করেছেন মানবজমিন-এর হাত ধরে।
আজও নানা রাজনৈতিক চাপ, প্রতিকূল পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক সংকট এবং বিভিন্ন সরকারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে মানবজমিন তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও অবস্থান ধরে রেখেছে। ইতিহাস একদিন নিশ্চয় মূল্যায়ন করবেÑএকজন মাঠপর্যায়ের সাংবাদিক কীভাবে নিজের মেধা, সততা, সাহস ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি দিয়ে বাংলাদেশের সংবাদপত্রশিল্পে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সেই ইতিহাসে মতিউর রহমান চৌধুরীর নাম থাকবে একজন স্বপ্নদ্রষ্টা সম্পাদক ও পথপ্রদর্শক হিসেবে।

৬.
সম্প্রতি সপ্তমবারের মতো ফিফা বিশ্বকাপ কভার করতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন। বিশ্বকাপের ব্যস্ততা তাঁকে ঘিরে থাকলেও পুরোনো সহকর্মীদের ভালোবাসা ও আবেগ তাঁকে আবারও টেনে নিয়ে যায় স্মৃতির আঙিনায়। তাঁকে ঘিরে বাংলাবাজার ও মানবজমিন-এর বর্তমান ও সাবেক সাংবাদিকদের উদ্যোগে নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে আয়োজন করা হয় এক আন্তরিক ও স্মৃতিময় মিলনমেলার। নিউইয়র্ক প্রেসক্লাবের সভাপতি মনোয়ারুল ইসলাম এবং সাংবাদিক নওশাদ ভাইয়ের উদ্যোগে আয়োজিত সেই প্রাণবন্ত আড্ডায় দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা ফিরে যান সাংবাদিকতার সেই সোনালি দিনগুলোয়। আলোচনায় উঠে আসে একটি সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠার পেছনের সংগ্রাম, স্বপ্ন ও পরিশ্রমের নানা অজানা গল্প। স্মৃতিচারণায় বারবার ফিরে আসে সহকর্মীদের প্রতি মতিউর রহমান চৌধুরীর অকৃত্রিম ভালোবাসা, তরুণ সাংবাদিকদের প্রতি তাঁর আস্থা এবং একটি পরিবার হয়ে ওঠা সংবাদকর্মীদের সেই বন্ধনের কথা।

আড্ডা শেষে মনে হলো, সময় বদলেছে, প্রযুক্তির বিস্ময়কর পরিবর্তন এসেছে, সংবাদপত্রের ধরন ও পাঠকের অভ্যাসও বদলে গেছে; কিন্তু কিছু মানুষের স্বপ্ন, নিষ্ঠা এবং সাংবাদিকতার প্রতি গভীর ভালোবাসা কখনো বদলায় না। মতিউর রহমান চৌধুরী সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন, যাঁর জীবন ও কর্ম বাংলাদেশের সংবাদপত্রশিল্পের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকবে।
একজন মাঠপর্যায়ের সংবাদকর্মী থেকে দেশের অন্যতম প্রভাবশালী সম্পাদক হয়ে ওঠার তাঁর দীর্ঘ যাত্রা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি সাহস, অধ্যবসায়, সততা ও পেশাগত অঙ্গীকারের এক অনন্য উদাহরণ। তাঁর সংগ্রাম, নেতৃত্ব, মানবিকতা এবং সাংবাদিকতার প্রতি অবিচল ভালোবাসা আগামী প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য দীর্ঘদিন পথ দেখানোর আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।
লেখক : চেয়ারম্যান, ঠিকানা গ্রুপ অব মিডিয়া এবং সাবেক সংসদ সদস্য।

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz