নিউইয়র্ক সিটির ভোক্তাদের অধিকার রক্ষায় বড় ধরনের সাফল্য অর্জন
প্রতারণামূলক ব্যবসায়িক কার্যক্রমের অভিযোগে সেলফ-স্টোরেজ কোম্পানি * ‘এক্সট্রা স্পেস’-এর সঙ্গে ১.৭ মিলিয়ন ডলারের সমঝোতা
নাশরাত আর্শিয়ানা চৌধুরী
প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৬, ১১:১৩
•
অনলাইন সংস্করণ
নিউইয়র্ক সিটির ভোক্তাদের অধিকার রক্ষায় বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করেছে মেয়র জোহরান কোয়ামে মামদানির প্রশাসন। প্রতারণামূলক ব্যবসায়িক কার্যক্রম, অতিরিক্ত মূল্য আদায়, অস্বাস্থ্যকর স্টোরেজ ইউনিট ভাড়া এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে গ্রাহকদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নিলামে বিক্রির অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ সেলফ-স্টোরেজ কোম্পানি এক্সট্রা স্পেস স্টোরেজ-এর সঙ্গে ১.৭ মিলিয়ন ডলার (১৭ লাখ ডলার) মূল্যের একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা চুক্তি করেছে নিউইয়র্ক সিটি।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) মেয়র মামদানি এবং নিউইয়র্ক সিটি ডিপার্টমেন্ট অব কনজিউমার অ্যান্ড ওয়ার্কার প্রোটেকশন (ডিসিডব্লিউপি)-এর কমিশনার স্যামুয়েল এ. এ. লেভিন যৌথভাবে এই সমঝোতার ঘোষণা দেন।
এই সমঝোতার আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত ভোক্তাদের জন্য ১০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ (রেস্টিটিউশন) প্রদান করা হবে এবং কোম্পানিকে ৭ লাখ ডলারের বেশি দেওয়ানি জরিমানা পরিশোধ করতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে কঠোর নতুন নিয়ম মানতে বাধ্য থাকবে প্রতিষ্ঠানটি।
ডিসিডব্লিউপি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক্সট্রা স্পেসের বিরুদ্ধে মামলা করে। তদন্তে দেখা যায়, ২০২৩ সাল থেকে কোম্পানিটি ধারাবাহিকভাবে নিউইয়র্ক সিটির কনজিউমার প্রোটেকশন আইন লঙ্ঘন করে আসছিল।
সংস্থাটি শতাধিক গ্রাহকের অভিযোগ পর্যালোচনা করে উল্লেলিখিত অনিয়মের প্রমাণ পায়-১. মিথ্যা বিজ্ঞাপন, কোম্পানি পরিষ্কার ও নিরাপদ স্টোরেজ ইউনিট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে অনেক ইউনিটে ছিল-ইঁদুর ও অন্যান্য ক্ষতিকর প্রাণীর উপদ্রব, ইঁদুরের মল, পানি চুইয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেয়াল ও মেঝে ছত্রাক (মোল্ড), অপরিচ্ছন্ন ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ।
২. কম ভাড়া দেখিয়ে পরে অতিরিক্ত মূল্য আদায় (বেট-অ্যান্ড-সুইচ)-গ্রাহকদের কম ভাড়ার প্রলোভন দেখিয়ে চুক্তি করানো হতো। পরে পূর্বঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ করে ভাড়া উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়ে দেওয়া হতো। যদিও কোম্পানি লিখিতভাবে ৩০ দিন আগে মূল্যবৃদ্ধির নোটিশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, বাস্তবে সেই নিয়ম মানা হয়নি।
৩. গোপন ও অযৌক্তিক ফি (জাঙ্ক ফি)-গ্রাহকদের কাছ থেকে নানা ধরনের অতিরিক্ত ও গোপন চার্জ আদায় করা হতো। এমনকি অনেক গ্রাহক চুক্তি বাতিল করার পরও তাদের কাছ থেকে এসব ফি আদায় অব্যাহত রাখা হয়।
৪. ব্যক্তিগত সম্পত্তি আটকে রাখা ও নিলামে বিক্রি-যেসব গ্রাহক নির্ধারিত সময়ে অর্থ পরিশোধ করতে পারেননি অথবা মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ করেছেন, তাদের-স্টোরেজ ইউনিটে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়, ব্যক্তিগত মালামাল জব্দ করা হয়, আদালতের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই সেই সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এই কর্মকাণ্ডকে ডিসিডব্লিউপি ভোক্তা অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে।
মেয়র মামদানির কঠোর বার্তা-মেয়র জোহরান মামদানি বলেন, মানুষ তাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস-পারিবারিক স্মৃতি, গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র কিংবা ব্যক্তিগত সম্পদ-নিরাপদে রাখার জন্য এক্সট্রা স্পেসকে অর্থ দেয়। কিন্তু কোম্পানিটি সেই বিশ্বাসের অপব্যবহার করেছে। তারা কম মূল্যের প্রলোভন দেখিয়ে পরে ভাড়া বাড়িয়েছে, স্টোরেজ ইউনিটের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করেনি এবং গ্রাহকদের সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করেছে।
তিনি আরও বলেন, আজ কোম্পানিটিকে ১.৭ মিলিয়ন ডলার দিতে হচ্ছে। নিউইয়র্কের সব সেলফ-স্টোরেজ কোম্পানির জন্য এটি একটি স্পষ্ট বার্তা-যারা নিউইয়র্কবাসীর সঙ্গে প্রতারণা করবে, এই প্রশাসন তাদের জবাবদিহির আওতায় আনবে।
অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের অংশ-ডেপুটি মেয়র জুলি সু বলেন, অনেক মানুষের কাছে স্টোরেজ ইউনিটে রাখা জিনিসপত্রের মধ্যে থাকে পারিবারিক ছবি, প্রয়াত স্বজনের স্মৃতিচিহ্ন এবং জীবনের অমূল্য সম্পদ। এক্সট্রা স্পেস সেই আবেগ ও বিশ্বাসকে ব্যবসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।
তিনি বলেন, এই সমঝোতার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তরা অর্থ ফেরত পাবেন এবং ভবিষ্যতে এমন অনিয়ম রোধে কার্যকর নিয়ম কার্যকর হবে।
ডিসিডব্লিউপির কমিশনার স্যামুয়েল এ. এ. লেভিন বলেন, নিউইয়র্ক সিটির ছোট ছোট অ্যাপার্টমেন্ট এবং বাড়তি আবাসন ব্যয়ের কারণে এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি মানুষ সেলফ-স্টোরেজের ওপর নির্ভরশীল। এই বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে এক্সট্রা স্পেস গ্রাহকদের প্রতারণা করেছে।
তিনি বলেন, তারা শুধু অতিরিক্ত মূল্য ও অযৌক্তিক ফি আদায় করেনি; যারা মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ করেছেন, তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তিও নিলামে বিক্রি করেছে। এই মামলার মাধ্যমে নিউইয়র্কবাসী অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার পেলেন এবং পুরো শিল্পখাতের জন্য একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপিত হলো।
সমঝোতা অনুযায়ী কোম্পানিকে যা করতে হবে-আদালতে দাখিল করা সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী এক্সট্রা স্পেসকে- বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন বন্ধ করতে হবে। স্টোরেজ ইউনিটের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সঠিক তথ্য দিতে হবে। ভাড়া বাড়ানোর আগে যথাযথ সময়ে লিখিত নোটিশ দিতে হবে। গ্রাহকের ইউনিটে প্রবেশ বন্ধ বা সম্পত্তি নিলামে তোলার আগে কঠোর আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। প্রয়োজনে গ্রাহকদের জন্য রিলোকেশন অ্যাসিস্টেন্টস প্রোগ্রাম চালু করতে হবে। গ্রাহকসেবা উন্নত করতে নতুন নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে।
নতুন লাইসেন্সিং ব্যবস্থা কার্যকর হচ্ছে-নিউইয়র্ক সিটিতে বর্তমানে ৩০০টিরও বেশি সেলফ-স্টোরেজ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই খাত নিয়ে অভিযোগ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে এবং এক্সট্রা স্পেসের বিরুদ্ধে অভিযোগের সংখ্যা ছিল সর্বাধিক। এ কারণে লোকাল ল’ ১৭১ অব ২০২৫ অনুযায়ী আগামী ২৫ আগস্ট ২০২৬ থেকে নিউইয়র্ক সিটির প্রতিটি সেলফ-স্টোরেজ প্রতিষ্ঠানকে ডিসিডব্লিউপি -এর লাইসেন্স গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সিটি প্রশাসনের মতে, এই সমঝোতার মাধ্যমে নির্ধারিত নতুন নিয়মগুলো ভবিষ্যতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত সব সেলফ-স্টোরেজ প্রতিষ্ঠানের জন্য অনুসরণযোগ্য মানদণ্ড হিসেবে কাজ করবে।
ভোক্তাদের প্রতি আহ্বান হলো ডিসিডব্লিউপি নিউইয়র্কবাসীকে আহ্বান জানিয়েছে, কোনো সেলফ-স্টোরেজ কোম্পানির মাধ্যমে প্রতারণা, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, অন্যায্য চুক্তি বা ব্যক্তিগত সম্পত্তি নিয়ে অনিয়মের শিকার হলে প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ দ্রুত অভিযোগ দায়ের করতে। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করে ভোক্তাদের অধিকার রক্ষায় প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিটি প্রশাসনের মতে, এই ঐতিহাসিক সমঝোতা নিউইয়র্কে ভোক্তা অধিকার সুরক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হবে এবং ভবিষ্যতে কোনো প্রতিষ্ঠান যাতে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করতে না পারে, সে জন্য এটি শক্তিশালী বার্তা বহন করবে।