মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

​হরমুজের আশপাশে ইরানের ৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা

​হরমুজের আশপাশে ইরানের ৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা

বিজ্ঞাপন



হরমুজ প্রণালির আশপাশে ইরানের ৮০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজে সাম্প্রতিক হামলার জন্য তেহরান দায়ী। এর জবাবে এই সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। খবর সামা টিভি অনলাইনের। 

এ হামলার ফলে দুদেশের মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনা আরও বেড়ে গেল। নিরাপদ নৌ চলাচল পুনঃস্থাপন এবং পারমাণবিক আলোচনা এগিয়ে নিতে তিন সপ্তাহেরও কম সময় আগে যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) হয়েছিল, তার ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ইরাক সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরে গেছেন বলে দেশটির গণমাধ্যম জানিয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলের সিরিক বাণিজ্যিক বন্দরে শত্রুপক্ষের নিক্ষিপ্ত গোলার খণ্ডে কয়েকজন আহত হয়েছেন। আহতদের মিনাবের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তবে হতাহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।

এছাড়া বন্দর আব্বাসের একটি মাছ ধরার জেটিতে আগুন লাগার খবর পাওয়া গেছে। এতে কয়েকটি নৌকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানি গণমাধ্যমের দাবি, শত্রুপক্ষের হামলার কারণেই ওই এলাকায় কালো ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

এর আগে ইরানের প্রেস টিভি জানায়, দক্ষিণাঞ্চলের বন্দরনগরী সিরিকে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। পরে জানানো হয়, সিরিকে অন্তত পাঁচটি বিস্ফোরণ হয়েছে এবং বাণিজ্যিক ও মাছ ধরার জেটিগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আরও জানায়, বন্দর আব্বাসের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। পরে কেশম দ্বীপ এবং জ্বালানি রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র খার্গ দ্বীপেও বিস্ফোরণের খবর আসে। তবে এসব ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন স্থানীয় এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত কোনো বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, নির্ভুল অস্ত্র ব্যবহার করে ৮০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের সাম্প্রতিক হামলার জবাব হিসেবেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

সেন্টকমের তথ্য অনুযায়ী, অভিযানে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ নেটওয়ার্ক, উপকূলীয় রাডার, জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং প্রণালির আশপাশে থাকা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর-এর ৬০টির বেশি ছোট নৌযান লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে ইরানের হামলার সক্ষমতা দুর্বল করাই এই অভিযানের উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে বলেছে, সমঝোতা লঙ্ঘিত হলে প্রয়োজনে আবারও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সাম্প্রতিক উত্তেজনার সূত্রপাত হয় হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশে তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারে অজ্ঞাত হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ব্রিটিশ নৌবাহিনী সংশ্লিষ্ট সংস্থা ইউকেএমটিও জানায়, কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে অজ্ঞাত উৎস থেকে নিক্ষিপ্ত বস্তু আঘাত হানে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সূত্র জানায়, একটি কাতারি এলএনজি ট্যাংকার বিস্ফোরণের ঝুঁকিতে পড়ে এবং সৌদি পতাকাবাহী একটি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হামলার দায় কেউ স্বীকার না করলেও যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা দাবি করেন, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী দুটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরান হামলা চালিয়েছিল।  

সামরিক অভিযানের পাশাপাশি ওয়াশিংটন ইরানের তেল বিক্রির জন্য দেওয়া একটি বিশেষ লাইসেন্সও বাতিল করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এটি দুই দেশের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারকের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

এদিকে অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলনে অবস্থানকালে এই হামলার পরিকল্পনায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেন। ওই বৈঠকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ইরানের সর্বোচ্চ যৌথ সামরিক কমান্ড যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলাকে ‘স্পষ্ট আগ্রাসন’ আখ্যা দিয়ে ‘চূর্ণবিচূর্ণ জবাব’ দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। তারা বলেছে, হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনায় কোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ মেনে নেওয়া হবে না এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপদ পথ ইরানই নির্ধারণ করবে।

ইরানের শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফও যুক্তরাষ্ট্রকে সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘ভয়ভীতি ও জবরদস্তির যুগ শেষ। তেহরান কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না।’

এদিকে এক মার্কিন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, ইরান বাহরাইনের দিকেও ড্রোন পাঠিয়েছে। একই সময়ে কুয়েতের বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও লোডশেডিং দেখা দিয়েছে।

গত মাসে প্রাথমিক শান্তি চুক্তির পর চলমান আলোচনা সত্ত্বেও এই নতুন সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আবারও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া সংঘাতে ইতোমধ্যে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ও লাখো মানুষের বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং আর্থিক বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।


ঠিকানা/এসআর

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz