দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ প্রবীণ রাজনীতিবিদদের মূল্যায়ন না করে, তাদের বুদ্ধি-পরামর্শের তোয়াক্কা না করে অনভিজ্ঞ, অপরিপক্ব তরুণ নেতৃত্বের কাছে ধরাশায়ী হলো দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি, তাদের অসংখ্য নেতাকর্মী। পথহারা বিএনপির শীর্ষস্থানীয়, কেন্দ্রীয় কি তৃণমূলের নেতাকর্মীরা জানেন না, কী তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য? কোথায় তাদের পথচলার শেষ ঠিকানা! অভ্যন্তরীণভাবে দেশের মানুষকে বিএনপি তার আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে মাঠে নামাতে পারেনি। জনজীবনের সমস্যাগুলোর সঙ্গে ভুক্তভোগী জনগণকে নিয়ে আন্দোলন সংগঠিত করে চূড়ান্ত ধাপে এসে সরকার অপসারণের পথে না গিয়ে তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার এক দফার আন্দোলনে অবতীর্ণ হয়। শীর্ষ নেতৃত্বের এ সিদ্ধান্তে চমক ছিল, তবে শ্রমজীবী, কর্মজীবী, সাধারণ মানুষ এতে সম্পৃক্ত হয়নি। তাদের রুটি-রুজি, অপশাসন, দুর্নীতি অপসারণ করে দুর্নীতিমুক্ত, জবাবদিহিমূলক সুশাসন, সুন্দর, পরিকল্পিত ভবিষ্যতের স্বপ্ন ছিল না এতে। দেশের মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমান তরুণ সমাজসহ দেশের মানুষকে তাদের ভাগ্যবদলের স্বপ্ন দেখাতে পারেননি। জামায়াতের পরামর্শ ও সক্রিয় সহযোগীর ভূমিকায় অতীতে নির্বাচন বর্জন করে নির্বাচন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী নাশকতা, ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ চালিয়ে বিএনপি কার্যত আত্মহননের পথই বেছে নিয়েছিল।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলে বড় ভাবনার বিষয় হয়ে এসেছে, সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মী এখন কোথায় যাবেন! বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম), তৃণমূল বিএনপি ব্যর্থ হয়েছে। এ জাতীয় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোক্তার কোনো প্রজেক্ট আগামীতেও দাঁড়াতে পারবে না। তারেক রহমান নতুন উদ্যমে নতুনভাবে শুরু করার পরিকল্পনা করছেন। আকস্মিক বড় কোনো কর্মসূচি না নিয়ে ধাপে ধাপে জনজীবনের সমস্যাভিত্তিক আন্দোলন সংগঠিত করার নির্দেশনা দিয়েছেন। দ্রব্যমূল্যের চরম ঊর্ধ্বগতি এবং দ্রব্যমূল্য নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনতে না পারার ব্যর্থতা, ভয়াবহ বেকারত্ব, বিদেশে বিশাল অঙ্কের অর্থ পাচার, পাচার করা অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে না পারা, অর্থনীতির গতিহীনতা প্রভৃতি বিষয় ছাড়াও স্থানীয়ভাবে সৃষ্ট বিভিন্ন সমস্যা, ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন গড়ে তোলা এবং তাতে জনসাধারণের সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্ব দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে কালো পতাকা মিছিল, পদযাত্রা, সমাবেশ প্রভৃতি ছোট আকারের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করা হবে। হতাশাগ্রস্ত কর্মীদের নতুন করে উজ্জীবিত করে তাদের রাজপথে নামানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে তারা শান্তিপূর্ণ, অহিংস পথেই থাকবেন। কিছুদিন পর তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ নাও হতে পারে। তবে বিএনপির পক্ষে তাদের কৌশল কতটা কার্যকর করা, আদৌ কার্যকর করা সম্ভব হবে কি না, সে প্রশ্ন প্রবলভাবেই রয়েছে।
বিএনপির নেতাদের অভিযোগ, তাদের লক্ষাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। বোমাবাজি, সরকারি-বেসরকারি যানবাহন, সম্পদের ক্ষতিসাধন, অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন বেআইনি কার্যকলাপের দায়ে করা মামলায় দেশের বিভিন্ন স্থানে নেতাকর্মীদের গ্রেফতার অভিযান অব্যাহতভাবে চলছে। নতুন করে আরও হাজার হাজার মামলা দায়ের করা হয়েছে। সক্রিয় নেতাকর্মীদের পলাতক জীবন কাটানো শুরু হয়েছে। পাশাপাশি নতুন সরকারের মন্ত্রী-এমপি, স্থানীয় নেতাদের ছায়াতলে থেকে আত্মরক্ষার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে বিএনপি এবং তার অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমরের পথ ধরার প্রক্রিয়া করছেন। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বিএনপির উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নেতাকর্মী সরকারি দলে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিতে পারেন। শীর্ষস্থানীয় ও কেন্দ্রীয় কমিটির এবং জেলা-উপজেলা কমিটির বিশিষ্ট নেতাদেরও এই প্রক্রিয়ায় শামিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই প্রক্রিয়া আওয়ামী লীগের জন্য কতটা লাভ বয়ে আনবে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে রাজনৈতিক ক্ষতির বোঝা কতটা বাড়াবে, সে প্রশ্ন রয়েই গেছে। সরকারি দল ও সরকারের নীতিনির্ধারক মহল বিষয়টি নিয়ে ভাবছে না, এমন নয়। তবে এ পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা এবং একপর্যায়ে নিঃশেষ করাই তাদের উদ্দেশ্য।
বিএনপির মাঠের নেতাকর্মীরা লাগাতার ১৫ বছর সরকার ও সরকারি দলের শাসন-নিপীড়ন মোকাবিলা করে যেভাবে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে নিজেদের অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে সক্রিয় রেখেছেন, তা অনেকটাই অভাবনীয়। এই আন্দোলন বিএনপির জন্য বড় অর্জন এবং অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। পরিস্থিতির চাপে পড়ে আপাতত সরকার ও সরকারি দলের আশ্রয় খুঁজলেও ভবিষ্যতে সময়মতো যে তারা পুরোনো রূপে আত্মপ্রকাশ করবে না, সে নিশ্চয়তাও নেই। এ দিকটি বিশেষ বিবেচনায় রেখে তারেক রহমানের নেতৃত্বের বিপরীতে নতুন নেতৃত্বে বিএনপি পুনর্গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। বিএনপির বেশ কয়েকজন পরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ নেতা এই প্রক্রিয়ায় শামিল হতে পারেন। আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিএনপির সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় ও জেলার নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য। আন্দোলনে অব্যাহত ব্যর্থতা এবং সামনের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে দলটির নেতা, সংগঠক, কর্মীরাও আর আশার বাতি জ্বালিয়ে রাখতে পারছেন না। তারেক রহমান এখনো লন্ডন থেকে কেন্দ্রীয়, জেলা, উপজেলার নেতাদের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করছেন। কিন্তু বিএনপি নতুন করে কী করতে পারবে, মাঠের নেতাকর্মীদের রাজপথে কতটা শরিক করতে পারবে, সে প্রশ্ন বড় হয়ে এসেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের সহযোগী যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ছিল বিরোধী শিবিরের মুখ্য শক্তি। নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে সুষ্ঠু, সুন্দরভাবে নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ এবং দেশ পরিচালনা শুরু করার ঘটনা বিএনপির হতাশা বাড়িয়েছে। বিদেশিরা সরকারের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের উচ্চতর পর্যায় থেকেও সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয় নীতি যথার্থভাবে অনুসরণ করে চলার কথা বারবার বলা হচ্ছে। কিছু পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে নিকটতম প্রতিবেশী ভারত কার্যকর পরামর্শ দিচ্ছে।