কেউ ভালো নেই, ভয়-কখন কী হয়। অতি ধনী, মাঝারি ধনী, উন্নত, উন্নয়নশীল, অনুন্নত-কেউ ভালো নেই। বিশ্ব রাজনীতির আকাশে কালো মেঘ। গভীর দুর্যোগের পূর্বাভাস নয়, ইতোমধ্যেই দুর্যোগে আক্রান্ত কমবেশি সবাই। তাই কেউ ভালো নেই। এত দুর্যোগ, এত শঙ্কা, সংকট নিয়ে কারও ভালো থাকার কথাও নয়। চারদিকে কিসের জন্য একটি গোপন কিন্তু খুব দ্রুত লয়ে এক নতুন মেরুকরণ ঘটে চলেছে। কান পাতলে কেমন যেন একটি অশুভ সংকেত কানের পাশে শীষ দিয়ে চলে যায়।
গত শতকে প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘটে গেছে। দুটি যুদ্ধে মিত্রপক্ষ এবং শত্রুপক্ষ একই ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অনেক দেশ বিভিন্ন ঔপনিবেশিক শক্তির শিকল ভেঙে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। নিজেদের মতো করে চলতে গিয়ে বহিঃশত্রুর হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করার মানসে নিজেদের সাধ্যমতো অস্ত্রভান্ডার গড়ে তুলেছে। আজকে অস্ত্র প্রতিযোগিতায় এতটাই এগিয়ে গেছে যে, পরাশক্তি বলে প্রতিষ্ঠিত দেশগুলোকেও আর পরোয়া করতে চায় না। চোখে চোখ রেখে চলে। পরাশক্তিগুলোর অস্ত্রসংবরণ নীতি ন্যায়ভিত্তিক না হওয়ার কারণে তারাও নৈতিক শক্তি পায় না, যারা সমরশক্তিতে এগিয়ে চলেছে, তাদের ওপর কার্যকর চাপ দিতে। যে কারণে বড় বড় শক্তির চাপ অবহেলা করে নিজেদের শক্তি ও সামর্থ্যমতো উন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলোও তাদের অস্ত্রভান্ডার অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র এমনকি আণবিক বোমার মতো পৃথিবীর মানুষ, শান্তি ও সভ্যতা ধ্বংসের মতো সমরাস্ত্র তৈরি করে নিজেদের যেকোনো বহিঃশক্তির হামলা থেকে রক্ষা করার মতো ক্ষমতা অর্জন করে চলেছে।
স্পষ্টত, নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য ছাড়াও যাদের হাতে আণবিক বোমা রয়েছে, তাদের নাম মোটামুটি প্রায় সকলেই জানে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে অন্তরঙ্গ মৈত্রী ইসরায়েল এবং দক্ষিণ কোরিয়ার হাতে আণবিক বোমা রয়েছে বলে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। এ ছাড়া ভারত ও পাকিস্তানের হাতে আণবিক বোমা রয়েছে। আর ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধে ইরানি নেতাদের কথাবার্তা এবং বডি ল্যাঙ্গুয়েজ থেকে অনেকেই প্রায় নিশ্চিত যে তেহরান সম্ভবত আণবিক শক্তি এরই মধ্যে তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দিয়ে আণবিক বোমা তৈরি করে ফেলেছে। না ফেললেও তারা যেকোনো মুহূর্তে তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দিয়ে পারমাণবিক বোমা বানিয়ে ফেলতে সক্ষম। উত্তর কোরিয়ার বেলায়ও বিশ্ববাসীর বিশ্বাস, তারাও আণবিক শক্তির অধিকারী। তাদের প্রধান নেতার চলন-বলন এবং প্রায়ই ভয়ংকর বিধ্বংসী সমরাস্ত্রের পরীক্ষা সবাইকে জানান দেয়, তাদের যে সমরশক্তি তাতে তারা যেকোনো দেশের সঙ্গে লড়তে প্রস্তুত।
কিন্তু পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র চায় না, তাদের মিত্র ইসরায়েল এবং অন্যান্য দেশের হাতে যত মারণাস্ত্রই থাক, তাদের শত্রুভাবাপন্ন কোনো দেশের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকতে পারবে না। পারমাণবিক অস্ত্র আছেÑএই ধারণায় তারা ইরাককে ধ্বংস করে, সাদ্দাম হোসেনকে হত্যা করে রেজিম চেঞ্জ করলেও ইরাকের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র বা তার প্রস্তুতির কোনো নমুনা পাওয়া যায়নি। এখন ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র মিলে চড়াও হয়েছে ইরানের ওপর। ইরানের হাতে পারমাণবিক বোমা না থাকলেও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আছে, যা দিয়ে তারা চাইলে পারমাণবিক বোমা বানাতে সক্ষম। কিন্তু বিশেষ করে, মিত্র ইসরায়েলের কারণেই সেই ইউরেনিয়াম ইরানের হাতে থাকুক, তা চায় না।
তাই ইরানেও রেজিম চেঞ্জের জন্য তার ওপর আচমকা হামলা করে বসে। তাদের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিকে হত্যা করে এবং ইরানের ইউরেনিয়াম হস্তান্তর অস্বীকারকে স্পর্ধা ভেবে ইরানকে ধ্বংস করতে তেল আবিব ও ওয়াশিংটন যৌথভাবে যুদ্ধ শুরু করে। ইরান এখন পর্যন্ত পরাজয় স্বীকার করা দূরে থাক, পাল্টা জবাব দিয়ে ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যে যেসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা আছে, তার ওপর মুহুর্মুহু আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন দেশের ভেতরে এবং বাইরে যুদ্ধবিরোধী তীব্র চাপে আপসে রাজি হলেও ইসরায়েল চায় না এখনই যুদ্ধ বন্ধ হোক। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা চায় না ইসরায়েলের স্বার্থে পরদেশে এ রকম যুদ্ধে শামিল হয়ে নিজ দেশের সম্পদ ও নাগরিকদের এমন জীবনহানি।
কিন্তু ইরানের সঙ্গে সমঝোতা বৈঠক যুক্তরাষ্ট্রের আন্তরিক উদ্যোগ কি না, তা নিয়ে বিশ্ববাসীর মনে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। বিশ্ববাসীর এ সংশয় যদি সত্য বলে প্রমাণিত হয়, তবে পরবর্তী ধাপে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে পদক্ষেপ নিতে পারে, তা বিশ্বশান্তি ও সভ্যতার অবস্থা ভবিষ্যতে কী দাঁড়াতে পারে, তা কল্পনা করতে গেলেও আতঙ্কে শিউরে উঠতে হয়। আজ ইরান যেভাবে পাল্টা জবাব দিয়ে যাচ্ছে, ভবিষ্যতে যে রকম যুদ্ধের আশঙ্কা করা হচ্ছে, সে রকম পরিস্থিতি সত্যি সত্যি উপস্থিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডার থেকে বিশ্বকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হবে, তা কেউ কল্পনা করতে পারছে বলে মনে হয় না।
এ ছাড়া তখন যুদ্ধ কি কেবল তিন দেশের মধ্যেই সীমিত থাকবে, নাকি গত দুই বিশ্বযুদ্ধের মতোই বিভিন্ন দেশ নিজ নিজ সুবিধা বিবেচনায় দুই বলয়ে বিভক্ত হয়ে শত্রু নিধনে মাঠে নেমে পড়বে। সামনের সেই ভয়ংকর দিন মনে করলে আজ তিন দেশের মধ্যে যে যুদ্ধ চলছে, তাকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মঞ্চ রিহার্সাল বলে ধরে নেওয়া যায়। এ রকম পরিস্থিতির সামনে দাঁড়িয়ে কেউ কি ভালো থাকতে পারে?