দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের মাঠে অধিকাংশ প্রার্থীই মানছেন না আচরণবিধি। প্রতিপক্ষকে দেওয়া হচ্ছে হুমকি। প্রদর্শন করা হচ্ছে ভয়ভীতি। হামলা চালিয়ে করা হচ্ছে হতাহত। এখন পর্যন্ত আচরণবিধি লঙ্ঘন-সংক্রান্ত যত অভিযোগ এসেছে, তার সিংহভাই আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে। বর্তমান এমপিরা তো বটেই, একই সঙ্গে এর মধ্যে নাম জড়িয়েছেন কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী ও তাদের স্বজনও।
বিভিন্ন আসনের প্রার্থীদের আচরণবিধি মানাতে কার্যত গলদঘর্ম অবস্থা নির্বাচন কমিশনের (ইসি)। হুমকির শিকার হয়ে প্রতিকারের আবেদন জানানোর পরও নির্বাচন কমিশন শোকজেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার নজির নেই বলে দাবি অভিযোগকারীদের। ইসির হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা ও ২৫০ জনকে শোকজ করা হয়েছে এবং ১৫৯ জনের রিপোর্ট এসেছে। বাকি প্রার্থীদের শোকজের বিষয়ে এখনো কার্যক্রম চলছে। কিন্তু এই শোকজ, তলব, জরিমানা ও মামলা করেও কোনো কাজ হচ্ছে না। বরং দিনকে দিন প্রার্থীরা নির্বাচনের আচরণবিধি লঙ্ঘনের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। এ অবস্থায় ইসি হাঁপিয়ে উঠলেও কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অ্যাকশনে যাচ্ছে না। যদিও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে হুমকি দিয়ে বলা হয়েছে, নির্বাচনে আচরণবিধির লঙ্ঘন চরম পর্যায়ে গেলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করা হবে।
নির্বাচন কমিশনে সারা দেশের বিভিন্ন আসন থেকে নৌকা প্রতীকের ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি আসছে। নির্বাচনী আইন ও বিধান লঙ্ঘনে পিছিয়ে নেই ভিআইপি প্রার্থীরাও। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ, কেন্দ্রীয় ১৪ দলের সমন্বয়ক আমির হোসেন আমু, তারকা প্রার্থী মাগুরা-১ আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানও নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ করেছেন। তাদের নোটিশ করা হলেও আইনগত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ ছাড়া নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে ঢাকা-৭ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও সংসদ সদস্য হাজী মো. সেলিমের ছেলে মোহাম্মদ সোলায়মান সেলিমকে শোকজ করেছে ইসি। আচরণবিধি লঙ্ঘন করে সরকারি গাড়ি নিয়ে পুলিশি নিরাপত্তায় নির্বাচনী এলাকায় গিয়েছেন এবং সেখানে জনসভায় যোগ দিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। এ কারণে তাকে শোকজ করেছে নির্বাচন কমিশনের অনুসন্ধান কমিটি। আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় শোকজ করা হয়েছে নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, ঢাকা-১৯ আসনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান, গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল এবং নাটোর-৩ আসনে তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলককেও।
কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে এক সাংবাদিকের ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের ভাই গোলাম সারওয়ারের বিরুদ্ধে। ভোটারদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে পঞ্চগড়ে শোকজ করা হয়েছে রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজনসহ দুজনকে। আচরণবিধি লঙ্ঘন ও সাংবাদিককে মারধর-নাজেহালের অপরাধে চট্টগ্রাম-১৬ আসনের বর্তমান এমপি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে ইসি। আচরণবিধি লঙ্ঘন করে নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাবুর প্রচারণায় অংশ নেওয়ায় ৮ প্রিসাইডিং কর্মকর্তাসহ ১২ জনকে শোকজ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম-১০ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মনজুর আলমের পোস্টার-ব্যানার পোড়ানোর অভিযোগে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মহিউদ্দিন বাচ্চুকে শোকজ করে নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটি।
আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্যদের মধ্যে আচরণবিধি ভঙ্গের তালিকায় আরও রয়েছেন লক্ষ্মীপুর-২ সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের প্রার্থী নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়ন, লক্ষ্মীপুর-৩ মিয়া মো. গোলাম ফারুক পিংকু, নরসিংদী-৫ সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী রাজি উদ্দিন আহমেদ, পটুয়াখালী-৪ মহিববুর রহমান, গাজীপুর-৫ মেহের আফরোজ (চুমকি), লক্ষ্মীপুর-১ ড. আনোয়ার হোসেন খান, মুন্সিগঞ্জ-৩ মৃণাল কান্তি দাস, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী, ময়মনসিংহ-১১ কাজিম উদ্দিন আহম্মেদ ধনু এবং নাটোর-২ আসনে মো. শফিকুল ইসলাম শিমুল।
এদিকে নির্বাচনে আচরণবিধির লঙ্ঘন চরম পর্যায়ে গেলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করা হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ। ২৬ ডিসেম্বর নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা জানান। অশোক কুমার দেবনাথ বলেন, যারা আচরণবিধি লঙ্ঘন করছে, তাদের শোকজ করছে নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটি। এখন পর্যন্ত ২৫০ জনকে শোকজ করা হয়েছে এবং ১৫৯ জনের রিপোর্ট এসেছে। বাকি প্রার্থীদের শোকজ বিষয়ে এখনো কার্যক্রম চলছে। তিনি বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় শোকজ হচ্ছে, মামলা হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত দিয়েছে কমিশন। এ ছাড়া প্রার্থীদের নির্বাচন কমিশনে ডাকা হচ্ছে। কমিশন সিদ্ধান্ত নিলে প্রার্থিতাও বাতিলের মতো সিদ্ধান্তও আসতে পারে। আইন অনুযায়ী, আচরণবিধি লঙ্ঘনে প্রথমে শোকজ এবং পরে মামলা হচ্ছে। এতেও কাজ না হলে অথবা আচরণবিধি লঙ্ঘন চরম পর্যায়ে গেলে তখন প্রার্থিতা বাতিল হতে পারে।
প্রসঙ্গত, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০টি নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটি গঠন করে ইসি। আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে ওই কমিটি ইসিকে প্রতিবেদন দেবে। এর ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে নির্বাচন কমিশন।