Thikana News
৩০ অগাস্ট ২০২৫
  1. ই-পেপার
  2. চলতি সংখ্যা
  3. বিশেষ সংখ্যা
  4. প্রধান সংবাদ
  5. আমেরিকার অন্দরে
  6. বিশ্বচরাচর
আমেরিকা শনিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৫

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং আসামের বরাক উপত্যকা

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং আসামের বরাক উপত্যকা
মিলন উদ্দিন লস্কর


বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে আজ থেকে ৫২ বছর আগে। ১৯৭১ সালে। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক সমাজের ভূমিকা অবশ্যই ছিল, তবে প্রতিবেশী ভারত ধাত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিল। মুক্তিযুদ্ধে উত্তর-পূর্বের রাজ্য ত্রিপুরার মানুষ যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, সেভাবে আসামের অবিভক্ত কাছাড় জেলা তথা বরাক উপত্যকার মানুষও এই মুক্তিসংগ্রামে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। আর্থিক, নৈতিক এবং কায়িক দিক দিয়েও। এর পেছনে ছিল না কোনো স্বার্থবুদ্ধি। নেহাতই মানবিক দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো ভারতীয় ঐতিহ্যের একটি অঙ্গ। সেই ঐতিহ্য থেকেই বরাকের মানুষ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর শত শত বই প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন ভাষায়, কিন্তু কোনো বইয়ে বরাক উপত্যকার অবদান কী ছিল, তা লিপিবদ্ধ হয়নি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বরাক উপত্যকার অবদান নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করব এই লেখায়।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জীবনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে এসেছিল। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানের ছাইভস্ম থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হবেÑএই আনন্দে সারা পৃথিবীর বাঙালি উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। ১৯৪৭ সালে বাঙালি জাতিসত্তার যে বিভাজন হয়েছিল, তার মন-মানসিকতা চিরতরে বিভাজিত হয়ে যায়নি, তা প্রমাণ করার চ্যালেঞ্জ হিসেবে এসেছিল মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। পৃথিবীর একটি দুর্ধর্ষ সংগঠিত সৈন্যবাহিনী ছিল পাকিস্তানের, তার বিরুদ্ধে বাঙালির গেরিলা যুদ্ধ একটি অসম লড়াই। তবে ভারত ও রাশিয়া ছাড়া কোনো দেশই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল না। ‘বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি’ প্রমাণ করার শপথ নিয়ে বাঙালি লড়ে যাচ্ছিল।

এই যুদ্ধে বাংলাদেশের প্রতিবেশী অঞ্চলগুলোর দায়িত্ব ছিল সবচেয়ে বেশি। স্বভাবতই বাংলাদেশের লাগোয়া আসাম রাজ্যের করিমগঞ্জের ত্যাগ ও তিতিক্ষার মাত্রাও ছিল অপরিসীম। দীর্ঘ নয় মাস মুক্তিযুদ্ধের পাশে দাঁড়িয়েছিল করিমগঞ্জ। ১৯৬১ সালে বরাকের ভাষা আন্দোলনে এই শহর যেভাবে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ভারত-বাংলাদেশের সীমা নির্ধারণ করা কুশিয়ারা নদীর দক্ষিণ পার করিমগঞ্জ শহর। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন স্থানীয় সাপ্তাহিক দৃষ্টিপাত পত্রিকার অফিসই বাংলাদেশের ব্যাপারে যোগাযোগ কেন্দ্রের ভূমিকা পালন করে। সম্পাদক ভূপেন্দ্র কুমার সিংহ ওরফে মণি সিংহের বিশেষ অবদানের কথা সবাই একবাক্যে স্বীকার করেন। শরণার্থী এবং মুক্তিযুদ্ধে অর্থ ও সামগ্রী দিয়ে রেণু মিয়া চৌধুরী ওরফে আব্দুর রউফ চৌধুরী, প্রহ্লাদ চন্দ্র ঘোষ ওরফে শেফাল ঘোষ, সাংবাদিক বিনোদ সোম, সত্য আচার্য প্রমুখ বিশেষ অবদান রাখেন। সমাজবিজ্ঞানী ড. সুজিত চৌধুরী, অধ্যাপক নিশীথ রঞ্জন দাস, ড. কামালুদ্দীন আহমদ, আব্দুল বাছিত চৌধুরী প্রমুখ বৌদ্ধিক সমর্থন দিয়ে জনমত গঠনে সহায়তা করেন।

অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী করিমগঞ্জের সোনাখিরা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করে পাথারকান্দিতে এক বিরাট জনসভা করেন। সভা শেষে ওই সভার সভাপতি যামিনী মোহন দাস এতই আপ্লুত ওয়ে ওঠেন যে, তিনি আক্ষরিত অর্থে মতিয়া চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরেন। করিমগঞ্জ হাই মাদ্রাসায় আওয়ামী লীগপন্থী এবং ভিকমচান্দ হাইস্কুলে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিপন্থীরা শিবিরভুক্ত ছিলেন। তাদের মধ্যে মাঝেমধ্যে ঝগড়াঝাঁটি লেগে যেত। তখন ন্যাপের নেতা পীর হবিবুর রহমান তা মিটিয়ে দিতেন। করিমগঞ্জের শিক্ষাবিদ ড. কামালুদ্দীন আহমদ মতিয়া চৌধুরীর সফরসঙ্গী ও উল্লিখিত ঘটনাবলির প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন।

বর্তমান কাছাড় জেলার সদর শহর শিলচরেরও বেশ কয়েকটি গোষ্ঠী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করার জন্য এগিয়ে এসেছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় গোষ্ঠী ছিল ব্যারিস্টার আবুল ফজল গোলাম ওসমানির নেত্বত্বে। ওসমানি একজন স্বপ্নদ্রষ্টা ব্যক্তি ছিলেন। রবীন্দ্রদর্শনের দ্বারা লালিত ও প্রভাবিত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তার মনেপ্রাণে ভীষণ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তিনি সংগঠনের শীর্ষে থাকলেও তা পরিচালনার জন্য তার দুটি শক্ত হাত ছিল তারামণি চৌধুরী এবং লেখক সাংবাদিক অতীন দাশ। অর্থের জোগান দিতেন তারামণি চৌধুরী এবং সাংগঠনিক বিষয় দেখাশোনা করতেন অতীন দাশ। ওসমানি সাহেবের সঙ্গে আরও যারা থাকতেন, তারা হলেন সাংবাদিক অমিত নাগ, আক্তার উদ্দিন বড়ভুইয়া ওরফে আক্তু মিয়া, অধ্যাপক যতীন্দ্ররঞ্জন দে, নামর আলি মোক্তার, প্রেমেন্দ্র মোহন গোস্বামী, ফরিদ আহমদ মজুমদার, নুরুল আলম মজুমদার প্রমুখ। এদের উদ্যোগেই গঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ সহায়তা সমিতি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারের জন্য সমিতি ‘বাংলাদেশ’ নাম দিয়ে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেছিল। এর সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন মৌলভীবাজারের আব্দুল মতিন চৌধুরী নামের এক ব্যক্তি। সহযোগিতা করতেন অতীন দাশ। এটি ছাপা হতো জননেতা নন্দকিশোর সিংহের কো-অপারেটিভ প্রেস থেকে। সহায়তা সমিতির অস্থায়ী অফিস হয়ে ওঠে সাংবাদিক সুনীল দত্তরায়ের অরুণোদয় প্রেস। তখন জনস্মিলের মালিক সাধন মুখার্জি এই সমিতিকে একটি ফ্রিজ দিয়েছিলেন ওষুধপত্র রাখার জন্য। সে সময় বাংলাদেশ থেকে যারাই আসতেন, তারা অরুণোদয় প্রেসে হাজিরা দিতেন। সিলেটের জমশেদ বখত মজুমদার এবং মুনির বখত মজুমদার সব সময় আসতেন। পরে ব্যারিস্টার ওসমানির বাড়ির দোতলায়ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রায়ই আলোচনা, সলাপরামর্শ হতো। ওখানে এসেছেন ফরিদ গাজী, সি আর দত্ত, মতিয়া চৌধুরী, সিলেটের আমিনুর রশিদ চৌধুরী, মেজর জেনারেল ওসমানী থেকে শুরু করে জিয়াউর রহমান পর্যন্ত। জকিগঞ্জের এমপি আব্দুল লতিফ, হবিগঞ্জের রহিম সাহেবরাও আসতেন। এই সময় কলকাতা থেকে বিপ্লবী পান্নালাল দাশগুপ্ত ও সাংবাদিক বরুণ দাশগুপ্ত শিলচর আসেন। তারা ওসমানি সাহেবের বাড়িতেই ছিলেন। পান্নালাল দাশগুপ্ত অর্থ দিয়েও সাহায্য করেন। তার কাছ থেকে পাওয়া টাকা দিয়ে মুক্তিফৌজের নাতানপুর শিবিরে রসদসামগ্রী পাঠানো হয়। এই গ্রুপের সদস্য কবি-সাংবাদিক অতীন দাশের লেখা একটি কবিতা ‘সুরমার স্মৃতি’ সে সময় কলকাতা বেতার থেকে দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায়ই আবৃত্তি করতেন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা জোগাতে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরই ওসমানির নেতৃত্বে একটি টিম প্রথম বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখে। ওই টিমে অন্যদের মধ্যে ছিলেন লেখক, ভাষাগবেষক ইমাদ উদ্দিন বুলবুল, তারামণি চৌধুরী, নুরুল আলম মজুমদারসহ আরও কয়েকজন। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে একটি অ্যাম্বেসেডার কার নিয়ে তারা বাংলাদেশে রওনা হন। করিমগঞ্জের চর বাজারের দিকে ডিঙি নৌকা দিয়ে কুশিয়ারা নদী পার হয়ে তারা হবিগঞ্জ যান। সেখানকার মানুষ এবং হবিগঞ্জ থানায় গিয়ে কর্তব্যরত অফিসারসহ কয়েকজন পুলিশ আধিকারকের সঙ্গে দেখা করেন। তখন থানার ওসি ছিলেন নোয়াখালী জেলার। এই প্রতিনিধিদল আশ্বাস দিয়ে আসে মুক্তিযুদ্ধে আমরা আপনাদের পাশে থাকব।

১৯৬১ সালের ভাষা আন্দোলনে শিলচর পুরসভার যেভাবে একটি উজ্জ্বল ভূমিকা ছিল, সেভাবে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও এই পুরসভা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিল। তবে পুরসভার নামে নয় ‘বাংলাদেশ সহায়তা সমিতি’র ছত্রচ্ছায়ায়। এই সংগঠনের প্রধান ছিলেন শিলচর পুরসভার সে সময়ের চেয়ারম্যান দ্বিজেন্দ্রলাল সেনগুপ্ত। আহ্বায়ক ছিলেন তারাপদ ভট্টাচার্য। এই সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তৎকালীন উপ-পুরপতি মৃণালকান্তি দত্তবিশ্বাস ওরফে পলু বিশ্বাস, বিপ্লবী অনন্ত দেব, সুভাষ চৌধুরী, ড. দিলীপ দে প্রমুখ। তাদের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে উজ্জ্বল। বাংলাদেশের অগ্নিকন্যা ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির মতিয়া চৌধুরী তার আগুন-ঝরানো বক্তৃতা দিয়ে বরাকের মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। শিলচর গান্ধীবাগ ময়দানে তার বক্তৃতা শোনার জন্য এত বিশাল জমায়েত হয়েছিল, যার ফলে পাশের পার্ক রোডে গাড়ি চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হয়েছিল। শিলচরে মতিয়া চৌধুরী প্রায় ১৫ দিন ছিলেন। এই সময়ে তিনি কাঁঠালবাগান, কাশিপুর, জালালপুর ইত্যাদি স্থানে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করতেন। মতিয়া চৌধুরী কয়েক দিন বিপ্লবী অনন্ত দেবের মেহেরপুরের বাসায় ছিলেন। পুরপতি দ্বিজেন্দ্রলাল সেনগুপ্তের নেতৃত্বাধীন সহায়তা সমিতি মুক্তিযুদ্ধের সাহায্যার্থে কলকাতা থেকে শিল্পী মান্না দেকে এনে অনুষ্ঠান করে সেই অর্থ মুক্তিযুদ্ধের জন্য ব্যয় করা হয়েছিল। এ ছাড়া সিলেটের বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক সংগঠক হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য বাবুলের উদ্যোগে শিলচর সংগীত বিদ্যালয়ের সহযোগিতায় এখানে অনুষ্ঠিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আরতি ধর, হিমাংশু বিশ্বাস, বিদিতলাল দাসরাও অংশ নিয়েছিলেন। যুদ্ধ চলাকালীন ওই সমিতির সদস্যরা তারাপদ ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে ত্রাণ সাহায্য নিয়ে বিয়ানীবাজার পর্যন্ত গিয়েছিলেন। অবশ্য যাওয়ার সময় তারা বদরপুরে বাংলাদেশ লিয়াজোঁ অফিসার আব্দুল আজিজের কাছ থেকে পাস নিয়ে গিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে অসম সরকারে ইএসি অর্থাৎ এক্সট্রা অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার আশিস দত্তের অবদানের কথা সবাই এক বাক্যে স্বীকার করেন। ওই সময় শিলচর রেডক্রস সোসাইটি চিকিৎসা এবং ওষুধপত্র দিয়ে যথেষ্ট সহায়তা করেছিল। তখন রেডক্রসের সম্পাদক ছিলেন ডা. নলিনাক্ষ চৌধুরী। রেডক্রস সোসাইটির সদস্য ডা. ধরনীনাথ চক্রবর্তী, পরাণ চক্রবর্তী, মৃণালকান্তি দত্ত বিশ্বাস ওরফে পলু বিশ্বাসরা সক্রিয় ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় রেডক্রসের কাজকর্মের কয়েকটি ফটোগ্রাফ এবং পেপার কাটিং নলিনাক্ষ চৌধুরী তনয় নিলোৎপল চৌধুরী বছর কয়েক আগে সিলেটের মতিন উদ্দিন চৌধুরী জাদুঘরে হস্তান্তর করেন। শিলচর মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অর্থ ও খাদ্যসামগ্রী দিয়ে দীর্ঘ নয় মাস মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করেছিল। ওই সংস্থার নেতৃত্বে ছিলেন সম্পাদক অরবিন্দ দত্তচৌধুরী। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় অবিভক্ত কাছাড় জেলা ছাত্র পরিষদও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিল। সে সময়ের ছাত্র পরিষদের সক্রিয় কর্মকর্তারা ছিলেন সুনীল রায়, মণিলাল দেব, হরিকুমার সিনহা, মিহিরলাল রায়, দয়াদ্র্র পাল চৌধুরী, সুদীপ দত্ত, নবেন্দু শেখর নাথ, অরুণ ভট্টাচার্য, জহুরুল হোসেন বড়লস্কর, শংকর রায় চৌধুরী, এ কে সাদ উদ্দিন লস্কর প্রমুখ। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে এবং শরণার্থীদের অনেক সাহায্য করেছেন।

যেহেতু মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সে সময়ের বরাক উপত্যকার কিছু মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ ‘পূর্ব পাকিস্তান’ ভেঙে যাওয়াকে মেনে নিতে চায়নি, তাই তাদের বোঝানোর প্রয়োজন ছিল। তৃণমূল পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন করার জন্য স্থানে স্থানে সহায়ক সমিতি গড়ে উঠেছিল। তখন শিলচর কাছাড় কলেজকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল বাংলাদেশ সহায়ক কমিটি। এর সভাপতি শংকর রায়চৌধুরী, সহসভাপতি লুৎফুর রহমান, সম্পাদক ইমাদ উদ্দিন বুলবুল, সহ-সম্পাদক ছিলেন আব্দুল রকিব। এই কমিটিতে আরও ২৩ জন সদস্য ছিলেন। ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে ওই সমিতি শিলচরের আজাদ প্রেস থেকে একটি আবেদনপত্র ছাপিয়ে বরাক উপত্যকার বিভিন্ন স্থানে প্রচার করেছিল। সহায়ক সমিতি মূলত বরাক উপত্যকার গ্রামগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারকাজ চালাত এবং শিলচরে গোলাম ওসমানির নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীর এবং বদরপুরের বাংলাদেশ লিয়াজোঁ অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। সে সময় স্থানীয় সংবাদপত্রগুলোও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে, স্বাধীনতাসংগ্রামী হুরমত আলি বড়লস্কর সম্পাদিত সাপ্তাহিক আজাদ এবং সুনীল দত্তরায় সম্পাদিত অরুণোদয় পত্রিকা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক খবরাখবর গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করত।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সমগ্র বরাক উপত্যকা প্রশাসনিকভাবে কাছাড় জেলা হিসেবে পরিচিত ছিল। জেলা শাসক ছিলেন কে এস রাও। সরকারি তথ্যমতে, ওই সময় কাছাড় জেলায় পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত শরণার্থীদের জন্য শিলকুড়ি, হরিণছড়া, চন্দ্রনাথপুর, চরগোলা, সোনাখিরা, দাসগ্রাম ও লক্ষ্মীনগরে আশ্রয়শিবির খোলা হয়েছিল। এই শিবিরগুলো থেকেও মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুট করার জন্য দায়িত্বে ছিলেন মূলত সিলেটের মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক নির্মল বিকাশ দাসগুপ্ত, প্রবীর কুমার সিনহা, প্রণব কুমার সিনহা, বন্ধুগোপাল দাস, বিদিত চন্দ্র গোস্বামী প্রমুখ। আর সমগ্র বরাক অঞ্চলের জন্য দেওয়ান ফরিদ গাজী। তিনি ছিলেন ৪ ও ৫ নম্বর সেক্টরের অসামরিক উপদেষ্টা ও উত্তর-পূর্ব রণাঙ্গনের আঞ্চলিক প্রশাসনিক কাউন্সিল চেয়ারম্যান। এই সেক্টরের সামরিক দায়িত্বে ছিলেন সিলেটের আরেক কৃতী সন্তান ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পদত্যাগকারী মেজর চিত্তরঞ্জন দত্ত (সি আর দত্ত)। মুক্তিযুদ্ধ সংগঠক প্রণব কুমার সিনহা পরবর্তী সময়ে সিলেট এমসি কলেজের অধ্যক্ষ হয়েছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনজন মুক্তিযোদ্ধা রণাঙ্গনে মারা গেলে তাদের শিলচর মধুরবন্দস্থিত সরকারি গোরস্থানের উত্তর দিকে দাফন করা হয়েছিল। এদের মধ্যে একজন ছিলেন বাংলাদেশের মৌলভীবাজারের জুড়ী এলাকার। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে বরাক উপত্যকায় একমাত্র লিয়াজোঁ অফিস বদরপুর চৌমাথায় গড়ে উঠেছিল। বিয়ানীবাজারের আত্মসমর্পণকারী আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল আজিজ ছিলেন লিয়াজোঁ অফিসার। 

কাটিগড়ার প্রগ্রেসিভ অ্যাকাডেমির সদস্যরা তাকে দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করতেন। ২০১২ সালে ভাষা গবেষক ও প্রগ্রেসিভ অ্যাকাডেমির সদস্য ইমাদ উদ্দিন বুলবুল বিয়ানীবাজারের বাড়িতে গিয়ে একবার তার সঙ্গে দেখাও করেছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন বরাক উপত্যকার মানুষের ত্যাগ ও তিতিক্ষার আরও অনেক কাহিনি রয়েছে। করিমগঞ্জের সংগীতশিল্পী খালেক চৌধুরী মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন সমাবেশে তার স্বরচিত গান গেয়ে তাদের উদ্বুদ্ধ করতেন। কালাইন থানার ধূমকর গ্রামের আবু বক্কর বিভিন্ন বাজারে গিয়ে খান সেনাদের রোমহর্ষক নির্যাতনের কবিগান শুনিয়ে মানুষকে যুদ্ধের সমর্থনে নিয়ে আসতে অনেক সাহায্য করেছিলেন।

ওই সময়ে বরাক উপত্যকার বেশির ভাগ স্কুল-কলেজ শরণার্থীতে গিজগিজ করছিল। তাই ১৯৭১ সালে ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটে। সেই সময়ে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীসহ যুবকেরা প্রায় নয় মাস আক্ষরিক অর্থে বিনিদ্র রাত কাটিয়েছিলÑউৎসাহ উদ্বেগ উৎকণ্ঠা আর মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যÑসবকিছু নিয়ে। সেই উন্মাদনা আবালবৃদ্ধবনিতা সবাইকে গ্রাস করেছিল। কেউ পরিশ্রমকে পরিশ্রম বলে ভাবেনি। বাংলাদেশ স্বাধীন হোক, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে পরিণত হোক, এটাই ছিল তাদের একমাত্র প্রত্যাশা। 

কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বরাকবাসীর অবদানের কথা ওই দেশের সরকারের কাছে কোনো গুরুত্বই পায়নি।
বরাক উপত্যকার যারা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে দীর্ঘ নয় মাস মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেছিলেন, তারা অনেকেই প্রয়াত কিংবা বয়সের ভারে ন্যুব্জ। তারা কেউ বাংলাদেশের জনগণের কাছ থেকে এর কোনো প্রতিদান আশা করেননি। আজও করছেন না। 
যদিও তিনজনকে স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সরকার স্বীকৃতি জানিয়েছে, তা প্রতীকী মাত্র। বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে কোনো দিন ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে পরিণত হয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় লালিত হয়ে বিশ্বের বাঙালিদের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণে সমর্থ হয়, তবেই জানব বরাকের মানুষের পরিশ্রম সার্থক হয়েছে।

কমেন্ট বক্স