ধ্বংসস্তূপে এখনও আটকে বহু মানুষ, আন্তর্জাতিক সহায়তা জোরদার
ঠিকানা অনলাইন
প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৬, ১১:১৩
•
অনলাইন সংস্করণ
ভেনেজুয়েলায় শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা আরও বেড়ে অন্তত ২৩৫ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন দেড় হাজারেরও বেশি মানুষ। ধসে পড়া ভবনের নিচে এখনও বহু মানুষ আটকা পড়ে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সময় যত গড়াচ্ছে, জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনাও ততই ক্ষীণ হয়ে আসছে। খবর এএফপির।
দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী কার্লোস আলভারাডো জানিয়েছেন, উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় নিহত ও আহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল জরুরি সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে আহতদের ভিড় বাড়ছে এবং জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটও দেখা দিয়েছে।
গত বুধবার (২৪ জুন) রাতে মাত্র এক মিনিটের ব্যবধানে ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প উত্তর ভেনেজুয়েলাকে কাঁপিয়ে দেয়। শক্তিশালী এই জোড়া ভূমিকম্পে রাজধানী কারাকাসসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় বহুতল ভবন ধসে পড়ে, অসংখ্য ভবনে বড় ধরনের ফাটল সৃষ্টি হয় এবং বহু স্থাপনা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
ভূমিকম্পের পর থেকে একের পর এক আফটারশক বা অনুকম্পন অনুভূত হচ্ছে। এতে উদ্ধারকর্মীদের কাজ ব্যাহত হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও বিশুদ্ধ পানির সরবরাহও মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজধানী কারাকাসের উত্তরের উপকূলীয় রাজ্য লা গুয়াইরা। সেখানে ধসে পড়া একটি বহুতল ভবনের নিচে আটকা পড়ে দীর্ঘ সময় ধরে সাহায্যের জন্য চিৎকার করা এক শিশুকে প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতির অভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পরে শিশুটির মৃত্যু হয়। একই এলাকায় আরেকটি ধ্বংসস্তূপের নিচে তিনজন জীবিত থাকার তথ্য পাওয়া গেলেও প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জামের অভাবে তাদের বের করে আনা সম্ভব হয়নি।
কারাকাসের ডোমিঙ্গো লুসিয়ানি হাসপাতালের এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অনেক শিশুকে পরিবারের কাউকে ছাড়াই অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে আনা হচ্ছে। কেউ কেউ শুধু নিজের নাম বলতে পারছে, কিন্তু পরিবারের অন্য সদস্যদের অবস্থান সম্পর্কে কিছুই জানে না। হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক, নার্স ও স্বেচ্ছাসেবকেরা টানা কাজ করে যাচ্ছেন।
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা অঞ্চল পরিদর্শন করেছেন এবং এলাকাটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘দুর্যোগ অঞ্চল’ ঘোষণা করেছেন। সরকার জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে এবং সেনাবাহিনী ও জাতীয় উদ্ধার বাহিনীকে ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমে নিয়োজিত করেছে। তবে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও ওষুধের সংকট তীব্র হওয়ায় কিছু এলাকায় একটি সুপারমার্কেটে লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে।
আন্তর্জাতিক উদ্ধার কমিটি (আইআরসি) পরিস্থিতিকে ‘চরম মানবিক বিপর্যয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জরুরি খাদ্য, আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসেবার প্রয়োজন দ্রুত বাড়ছে।
দুর্যোগের পর ভেনেজুয়েলার পাশে দাঁড়িয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। সুইজারল্যান্ড, স্পেন, ফ্রান্স, পর্তুগাল ও মেক্সিকো ইতোমধ্যে বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দল, প্রকৌশলী ও চিকিৎসক পাঠিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দুটি যুদ্ধজাহাজ, পরিবহন বিমান ও উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার মোতায়েনের পাশাপাশি ১৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের জরুরি সহায়তা ঘোষণা করেছে। মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, উদ্ধার, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে এ সহায়তা দ্রুত পৌঁছে দেওয়া হবে।
এছাড়া চীন, ভারত, ব্রাজিল ও ইরানও মানবিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের প্রধান ধর্মগুরু পোপ লিও চতুর্দশ ভেনেজুয়েলার দুর্গত মানুষের জন্য প্রাথমিকভাবে এক লাখ ইউরো সহায়তা বরাদ্দ করেছেন।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গভীর শোক প্রকাশ করে ভেনেজুয়েলাকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। জাতিসংঘের ত্রাণবিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার বলেছেন, গত ১২৬ বছরের মধ্যে ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী এই ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন হবে।
ভূতাত্ত্বিকদের মতে, ভেনেজুয়েলার উত্তর উপকূল ক্যারিবিয়ান ও দক্ষিণ আমেরিকান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় অঞ্চলটি ভূমিকম্পপ্রবণ। ১৯৬৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে ২৩৬ জন এবং ১৯৯৭ সালের ভূমিকম্পে ৭৩ জন নিহত হয়েছিল। তবে বুধবারের ৭ দশমিক ৫ মাত্রার কম্পনটি ১৯০০ সালের ২৯ অক্টোবরের পর দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই ভূমিকম্পের কম্পন শুধু ভেনেজুয়েলাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; প্রতিবেশী কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতা, উত্তর ব্রাজিল এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকাতেও তা তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, আগামী কয়েক দিন আরও শক্তিশালী আফটারশক হতে পারে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে প্রবেশ না করার জন্য স্থানীয় প্রশাসন জনগণকে সতর্ক থাকতে অনুরোধ জানিয়েছে।