প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ, জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া, নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা বিএনপির মুখ্য দাবি। সরকার এসব দাবির কোনোটিই মানছে না। এসব ব্যাপারে কোনো রকম ছাড় দেওয়ার কথাও ভাবছে না সরকার। অন্যদিকে সরকার তাদের দাবি মেনে নিয়ে গ্রহণযোগ্য সমাধানে না এলে বিএনপি তার সহযোগীদের নিয়ে রাজপথের কর্মসূচি চূড়ান্ত ধাপে কাক্সিক্ষত সফল পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়ার দৃঢ়সংকল্প নিয়েই অগ্রসর হচ্ছে।
পরস্পরবিরোধী দুই পক্ষেরই তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের প্রত্যয় সফল হবে কি না, সংশয় রয়েছে। রাজনীতির খেলাও এখানেই শেষ হবে না। বরং নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা ঘটাবে, যা রাজনীতিবিদ ও দেশের জন্য কল্যাণকর নাও হতে পারে। কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, দৃশ্যত মীমাংসার অতীত বিদ্যমান সমস্যা সংকটের পারস্পরিক সম্মানজনক, গ্রহণযোগ্য সমাধান না হলে উদ্ভূত সম্ভাব্য পরিস্থিতি জটিল রূপ নেবে। নির্বাচন অনুষ্ঠানে বদ্ধপরিকর সরকার। বিএনপিবিহীন প্রায় ৩৫-৪০ শতাংশ ভোটারের ভোটদানের মাধ্যমে নির্বাচন করিয়ে নিতে পারলেও তাতে বিদ্যমান বহুমাত্রিক সংকটজনক পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটানো সম্ভব না-ও হতে পারে।
স্থানীয় রাজনৈতিক শক্তির পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্বের মদদ থাকায় নির্বাচন-পরবর্তী রাজনীতি জটিল আকার নিতে পারে। অন্যদিকে সরকারকে দাবি আদায়ে বাধ্য করার মতো কোনো অবস্থা বিএনপি এখনো সৃষ্টি করতে পারেনি। তারা রাজধানীতে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করছে। বিপুলসংখ্যক কর্মী-সমর্থকের সমাবেশ ঘটছে এতে। কিন্তু সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল না। জনসাধারণ, পেশাজীবী, কর্মজীবী, শ্রমিক শ্রেণিকে কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু গত ছয় মাসেও বিএনপির মিছিল, সমাবেশ, অবস্থান, লংমার্চÑকোনো কর্মসূচিতেই সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ একেবারেই ছিল না। সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নেই বলেই বিরোধীরা তাদের আন্দোলনে দীর্ঘ সময়েও সফলতা বয়ে আনতে পারেনি। তবে বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে জেলা, উপজেলা, শহরাঞ্চল, তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ নিঃসন্দেহে লক্ষণীয়; যা বিএনপি দেশে-বিদেশে থাকা নেতা ও পরামর্শকদের উৎসাহিত করছে। এ অবস্থায় বিএনপি চূড়ান্ত ধাপের কর্মসূচি দিতে যাচ্ছে। ২৮ অক্টোবর ঢাকার মহাসমাবেশ থেকে এই কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
বিএনপির শীর্ষস্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দেশের সকল জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, মহানগর, থানা, ওয়ার্ড থেকে বিএনপি তার নেতাকর্মীদের রাজধানীতে শামিল করবে। সম্ভবত ৩ কি ৪ নভেম্বর থেকে ঢাকায় কয়েক লাখ কর্মী জড়ো হয়ে রাজধানী অবরোধ বা শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করবে। মফস্বল থেকে নেতাকর্মীরা বাস, ট্রেন, লঞ্চে ঢাকা অভিমুখে যাত্রা করবেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাধা এড়াতে তারা এক-দুই দিন আগেই ঢাকায় চলে আসার পরিকল্পনা করছেন। রাজধানীর হোটলগুলোতে পুলিশ অভিযান চালাতে পারে আশঙ্কায় তারা নিজেদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের কাছে উঠবেন। জামায়াতে ইসলামীও ঢাকায় আসা, রাতযাপন ও কর্মসূচিতে একযোগে শরিক হবে। ২৮ অক্টোবর ঢাকায় মহাসমাবেশে বিপুলসংখ্যক কর্মী-সমর্থকের উপস্থিতি ও সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে বিএনপি। জামায়াত ও তার সহযোগীরা, রব-মান্নাদের গণতন্ত্র মঞ্চ ও বামপন্থীরা রাজধানীর কয়েক স্থানে জড়ো হবেন। বিরোধীরা, বিশেষ করে বিএনপি এই কর্মসূচি ‘ডু আর ডাই’ হিসেবে নিয়েছে।
বিরোধীরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা মনে করে, ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে শেখ হাসিনাকে সরে যেতে বাধ্য করার মাধ্যমেই তাদের বিজয় সুনিশ্চিত হবে। আওয়ামী লীগের অন্য কোনো সংসদ সদস্যকে তারা সরকারপ্রধান হিসেবে মেনে নিয়ে তার নেতৃত্বাধীন নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী। অন্য কোনো দাবি সরকার না মানলেও এই একটি দাবি পূরণ হলেই নির্বাচনে যাবেন মর্মে মার্কিন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি, পর্যবেক্ষকদের জানিয়েছেন বিএনপির নেতারা।
অন্যদিকে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির নামে বিরোধীরা এ যাবৎ যেসব তৎপরতা চালিয়ে আসছে, তাতে সরকার, সরকারি দলের নতি স্বীকার করে বিএনপিকে নির্বাচনে আনার চিন্তা করছেন না নীতিনির্ধারকেরা। তারা মনে করেন, বিএনপি যত উচ্চবাচ্যই করুক আর কঠোর কর্মসূচিই নিক, নির্বাচনে আসা ছাড়া বিকল্প নেই তাদের।
এ অবস্থার পাশাপাশি সরকার, সরকারি দল ও তাদের সহযোগী সংগঠন ও অঙ্গসংগঠনসমূহ বিএনপি ও তার সহযোগীদের কর্মসূচির বিপরীতে পাল্টা কর্মসূচি পালন করছে। তাদের সমাবেশেও ব্যাপক কর্মী-সমর্থকের সমাগম হচ্ছে। এখানেও চিত্র অভিন্ন। দলীয় নেতাকর্মীরা ছাড়া পেশাজীবী, শ্রমজীবী, চাকরিজীবী, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নেই সরকারি দলের কর্মসূচিতেও। তবে তাদের কর্মসূচিতেও বিপুলসংখ্যক কর্মী-সমর্থকের সক্রিয় অংশগ্রহণ লক্ষ করা যাচ্ছে। তাদের পাশে থাকছে সশস্ত্র পুলিশও। বিএনপি ও তার মিত্রদের সামনের কর্মসূচিরও পাল্টা কর্মসূচি পালন করবে সরকারি দল, তাদের সহযোগীরা এবং অঙ্গসংগঠনসমূহ।
পরস্পরবিরোধী এমন আক্রমণাত্মক অবস্থানে শান্তিপ্রিয় নিরীহ মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত ও আতঙ্কিত হয়ে উঠছেন। পারস্পরিক হিংসাশ্রয়ী বক্তব্য এবং সম্মুখ অবস্থান সংঘাত-সংঘর্ষের সুস্পষ্ট বার্তাবাহী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতি দুই পক্ষের ওপরই কার্যকর হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। কিন্তু কোনো পক্ষই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা করছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে না।
সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ব্যাপকভাবে ঢাকায় আগমন ও সংগঠিত সমাবেশ করতে না দিতে তৎপর রয়েছে। বাসে, ট্রেনে তাদের ঢাকা আগমন ঠেকানো হবে। ঢাকায় হোটেলে বহিরাগতদের অবস্থান করতে না দিতে হোটেল মালিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ট্রেন, বাসে ব্যাপকভাবে অনুসন্ধান ও অভিযান পরিচালিত হবে। লঞ্চ, বাস সার্ভিস অনেক জেলায় বন্ধ রাখা হবে লাগাতার। উপজেলা-জেলা থেকে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ঢাকামুখী চলাচল বন্ধ করতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকার প্রবেশপথগুলো আটকে দেওয়া হবে। টঙ্গী, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, আমিনবাজার, মিরপুর, সদরঘাট এলাকায় ব্যারিকেড সৃষ্টি করা হবে। গাজীপুর, নরসিংদী, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ জেলা থেকে বিরোধীদলীয় কর্মীদের সংগঠিতভাবে ঢাকা প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না, কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
ঢাকা শহরে যানবাহন ও মানুষের স্বাভাবিক চলাচলে কোনোভাবে বিঘ্ন সৃষ্টি করা হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অত্যন্ত কঠোর ব্যবস্থা নেবে। রাজপথে বিরোধীদের শান্তিপূর্ণ অবস্থানে বাধা দেওয়া হবে না। তবে গোটা সড়ক এবং ফুটপাতে অবস্থান নিলে বিরোধীদলীয় কর্মীদের সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করা হবে। টিয়ার গ্যাস, প্রচণ্ড গরম পানি ছেড়ে অবস্থানকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হবে। কাউকেই ফুটপাতে অবস্থান নিতে দেওয়া হবে না। এ ব্যাপারে সরকারি দলের নেতাকর্মীদেরও সতর্ক অবস্থান নিতে বলা হয়েছে।
সরকারি দল ও বিরোধী দলের এই মুখোমুখি বৈরী, আক্রমণাত্মক অবস্থান আগামী দিনগুলোতে জননিরাপত্তা, স্বাভাবিক অবস্থা বজায় থাকা নিয়ে সাধারণ মানুষ এরই মধ্যে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। এর ভয়ংকর পরিণতির কথা ভেবে তারা উদ্বিগ্ন, উৎকণ্ঠিত।