শুভাশীষ দত্ত টিটু
কালিকা পুরাণ ও কৃত্তিবাস রামায়ণ অনুযায়ী স্বয়ং রাম দুর্গার বোধন ও পূজা করেছিলেন। বাঙালি হিন্দুর শ্রেষ্ঠ উৎসব এই দুর্গাপূজা একসময় শুধু অবস্থাপন্ন বা জমিদারবাড়িতেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে মূলত ব্রিটিশ শাসনামলে দুর্গাপূজা সর্বজনীন হয়। তথ্য অনুযায়ী, কলকাতায় ১৯১০ সালে প্রথম বারোয়ারি দুর্গাপূজার সূচনা হয়েছিল। এরপর তা ছড়িয়ে পড়ে সারা বাংলায়।
বর্তমানে দুর্গাপূজা শুধু বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতবর্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; দেশের সীমানা অতিক্রম করে প্রায় সারা পৃথিবীতেই ছড়িয়ে পড়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া মহাদেশেও বিপুল সমারোহে এই পূজা হয়। প্রতিবছরের মতো এ বছরও আমেরিকার নিউইয়র্কের বিভিন্ন শহরে ৩০টিরও বেশি পূজামণ্ডপে সাড়ম্বরে পূজা উদ্্যাপিত হতে যাচ্ছে। এ বছরের ২০ অক্টোবর শুক্রবার থেকে ২৪ অক্টোবর মঙ্গলবার পর্যন্ত পূজা পালন করা হবে। দুর্গাপূজার এক বিশাল মাহাত্ম্য আছেÑমা দুর্গা দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করতে প্রতিবছর পৃথিবীতে আসেন। দুর্গাপূজাকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আউটডোর ফেস্টিভাল এবং এই উৎসব ইউনেসকোর ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ লিস্টেও স্থান পেয়েছে।
প্রায় ১০ দিনব্যাপী এই দুর্গোৎসব চলে। তার প্রথম দিন আমরা পালন করি মহালয়া। কথিত আছে, দেবী দুর্গা মহিষাসুর বধ করার পর মহালয়ার দিন কৈলাস পর্বত থেকে পৃথিবীর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন তাঁর পতি শিব ও সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে। ‘মহালয়া’ এক বিশাল উৎসব। ১৯৩১ সালে মহালয়া প্রথম প্রচারিত হয় আকাশবাণী থেকে। অনুষ্ঠানটির মূল কণ্ঠই ছিল শ্রী বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের। তিনি মূল চণ্ডীপাঠ ও বর্ণনা করেন এবং বাংলার অন্যতম শিল্পীরা পরিবেশন করেন দেবীর বন্দনা সংগীতমালা। সাধারণত আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠ থেকে দশম দিন পর্যন্ত শারদীয়া দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই পাঁচটি দিন যথাক্রমে দুর্গাষষ্ঠী, দুর্গাসপ্তমী, মহাষ্টমী, মহানবমী ও বিজয়া দশমী নামে পরিচিত। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষটিকে বলা হয় ‘দেবীপক্ষ’। দেবীপক্ষের সূচনার অমাবস্যাটির নাম মহালয়া। এদিন সনাতনীরা তর্পণ করে তাদের পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে। দেবীপক্ষের শেষ দিনটি হলো কোজাগরী পূর্ণিমা। এদিন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দেবী লক্ষ্মীর পূজা করা হয়। কোথাও কোথাও পনেরো দিন ধরে দুর্গাপূজা পালিত হয়। সে ক্ষেত্রে মহালয়ার আগের নবমী তিথিতে পূজা শুরু হয়। এ ক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো, কালিকা পুরাণে বলা হয়েছে, অষ্টাদশভুজা মহিষাসুরমর্দিনী উগ্রচণ্ডা তথা দশভুজার বোধন করা হবে কৃষ্ণপক্ষের নবমী তিথিতে, ষোড়শভুজা ভগবতী ভদ্রকালীর বোধন করা হবে কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশীতে এবং চতুর্ভুজা ও দশভুজা মহিষাসুরমর্দিনী বিগ্রহের বোধন করা হবে যথাক্রমে শুক্ল প্রতিপদে এবং শুক্লা ষষ্ঠীতে। আবার মহাকাল সংহিতার বিধানে প্রতিমা ভেদে উগ্রচণ্ডার কৃষ্ণনবম্যাদিকল্পে, ভদ্রকালীর প্রতিপদাদিকল্পে ও কাত্যায়নী দুর্গার ষষ্ঠ্যাদিকল্পে পূজার অনুষ্ঠান বিধেয়।
এ বছর দেবীর আগমন ও গমন দুটোই ঘোটকে, যা অশুভ ইঙ্গিত। শাস্ত্রমতে বলা হয়, সপ্তমীতে দেবী দুর্গার আগমন এবং দশমীতে গমন হয়। সাধারণত প্রতিবছর সপ্তমী ও দশমী কী বার পড়েছে, তার ওপর নির্ভর করে দেবী কিসের আগমন এবং গমন সেটা বোঝা যায়। শাস্ত্রে আরও বলা আছে, কোনো বছর দেবীর আগমন ও গমন একই বাহনে হলে তা অত্যন্ত অশুভ।
-এলমহার্স্ট, নিউইয়র্ক