বর্তমানে বিশ্বের কলোনিয়ান বা ঔপনিবেশিক দেশগুলোতে ‘ডি-কলোনাইজেশন’ বা ‘বি-ঔপনিবেশিকীকরণ’-এর সুর উঠেছে। বিশেষ করে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর বুদ্ধিজীবীরা এ নিয়ে কথা বলছেন, গবেষণা করছেন। তাঁরা বুঝতে পেরেছেন, ইংরেজসহ ইউরোপের ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী অত্যন্ত সুকৌশলে ও পরিকল্পিতভাবে এই অঞ্চলের দেশগুলোর রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে কেবল ভূখণ্ডকে উপনিবেশ বানায়নি, দেশগুলোর মানুষ-ভাষা-শিক্ষা-সংস্কৃতিকেও ঔপনিবেশিক কাঠামোয় গড়ে তোলে। এর বিষক্রিয়া এমন এবং শিকড় এত গভীরে যে, বিগত শতকের মধ্যভাগে বাংলা-ভারতসহ এসব দেশ রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হলেও দেশের শাসনকাঠামো, শিক্ষাব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক চিন্তাচেতনার তেমন একটা পরিবর্তন হয়নি। যার কারণে প্রায়শই বলা হয়, ইংরেজ দেশ ছেড়ে গেলেও তাদের তৈরি ‘গোলামরা’ রয়ে গেছে। রাষ্ট্রক্ষমতার বদল হয়েছে, রাষ্ট্রকাঠামোর বদল হয়নি। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক রীতিনীতি ও প্রথা-প্রতিষ্ঠান প্রায় অভিন্ন রয়ে গেছে। পূর্বের ন্যায় একটি ক্ষুদ্র বুর্জোয়া অভিজাততন্ত্র, আমলাতন্ত্র, ধনতন্ত্র ইত্যাদি প্রশাসনিক কাঠামো ও শোষণযন্ত্র অপরিবর্তিত থেকে যায়। জনগণ মালিক হয়নি অর্থাৎ প্রকৃত গণতন্ত্র, প্রজাতন্ত্র বা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এর অর্থ ইংরেজসৃষ্ট মূল্যবোধগুলো থেকে আমরা মুক্ত হতে পারিনি। এটাও উপনিবেশতত্ত্বের একটি বৈশিষ্ট্য, যার নাম ‘অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদ’।
উপনিবেশবাদ বা তত্ত্বের নানা সংজ্ঞা রয়েছে। সহজ ও সরল সংজ্ঞা হলো—বিদেশি একটি জাতি সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে অন্য একটি দুর্বল জাতির রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে এবং রাষ্ট্রশক্তি ব্যবহার করে শাসন-শোষণের মাধ্যমে ধনসম্পদ লুট করে নিজ দেশে নিয়ে যায়। আঠারো শতকের মধ্যভাগে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই প্রক্রিয়ায় বাংলাসহ ভারতবর্ষ জয় করে এবং একটি উপনিবেশে পরিণত করে। এর তাত্ত্বিক নাম ‘শোষণমূলক উপনিবেশবাদ’। আরেক প্রকার উপনিবেশবাদ হলো—শক্তি প্রয়োগ করে শুধু পররাষ্ট্র বা ভূখণ্ড দখল করে না, আদিবাসীদের হয় উৎখাত আর না হয় কোণঠাসা করে সেখানে বসতি স্থাপন করে এবং দেশের ধনসম্পদ আহরণ ও কুক্ষিগত করে নিজেদের ভাগ্যোন্নয়ন ও ভোগবিলাস গড়ে তোলে, যেমনটি আমেরিকা, কানাডা, ল্যাটিন আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশে ইউরোপের উন্নত রাষ্ট্রগুলো করেছে। এ ধরনের উপনিবেশকে ‘বসতি উপনিবেশবাদ’ বলা হয়। আরও এক প্রকার উপনিবেশবাদ রয়েছে, তা হলো ‘প্রতিনিধিমূলক উপনিবেশবাদ’। বর্তমান যুগে ‘নব্য উপনিবেশবাদ’ বলে অপর একটি অভিধা চালু হয়েছে, যার ছদ্ম ছোবলে ক্ষুদ্র ও দরিদ্র রাষ্ট্রগুলো জাঁতাকলের ন্যায় পিষ্ট হচ্ছে। এর থেকে মুক্তি পাওয়ার আশা দিন দিন দুরূহ হয়ে উঠছে। এটি মূলত কতকগুলো পশ্চিমা সংস্থার অর্থনৈতিক অনুদান ও ঋণদানের মাধ্যমে এসব দেশকে নিজেদের কবজার মধ্যে আটকে রাখা। বাংলাদেশও এরূপ বিশ্বব্যবস্থার শিকারে পরিণত হয়ে হাবুডুবু খাচ্ছে। দুনিয়াজোড়া এসব উপনিবেশতত্ত্ব আলোচনা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়, আমরা ‘শোষণমূলক উপনিবেশবাদে’র প্রত্যক্ষ শিকার হয়েছি, তা নিয়েই আমাদের মাথাব্যথা, আমরা সে বিষয়ে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করব।
১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে যুদ্ধ হোক অথবা যুদ্ধের নামে প্রহসন হোক, স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলার কপাল পুড়ে আর মুসলিম শাসনের অবসান হয়। অপরদিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভাগ্য খুলে যায়। ভাগ্যদেবী তাদের কণ্ঠে জয়মাল্য পরিয়ে দেন। তারা ছলে-বলে-কৌশলে অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে বাংলার সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় : ‘বণিকের মানদণ্ড পোহালে শর্বরী দেখা দিল রাজদণ্ড রূপে।’
ইংরেজরা একে একে রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষানীতি কব্জা করে এগুলোর ব্যবস্থাপনায় কীভাবে কিরূপ পরিবর্তন সাধন করে, সেসব বিষয় নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। ইংরেজরা বাংলা ভূখণ্ডের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেই ক্ষান্ত হয়নি, আমাদের মেধা-জ্ঞান, বোধ-বুদ্ধি, মন-মানসিকতার ওপরও প্রভাব বিস্তার করেছিল, ইতিহাসে তার ভুরি ভুরি প্রমাণ রয়েছে। এটা উপনিবেশতত্ত্বেরই ভেতরকার আনুষঙ্গিক উপাদান। জর্জেন ওস্টারহ্যামেল তাঁর ‘কলোনিয়ালিজম : এ থিয়োরেটিক্যাল ওভারভিউ’ (২০০৫) গ্রন্থে বলেন, ‘উপনিবেশিত মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে এমন মৌলিক সিদ্ধান্তগুলো ঔপনিবেশিক শাসকেরা তাদের স্বার্থে তৈরি করে এবং প্রয়োগ করে। তারা উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সাংস্কৃতিক সমঝোতা প্রত্যাখ্যান করে, তাদের নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের এবং শাসনের নির্ধারিত আদেশ জোর করে মানতে বাধ্য করে।’ (উৎস : ইন্টারনেট)
এ প্রসঙ্গে ভারতে নিযুক্ত একজন ব্রিটিশ আমলার কথা উল্লেখ করা যায়, তিনি হলেন লর্ড টমাস ব্যারিন্টন মেকলে। তিনি বড়লাট উইলিয়াম বেন্টিংকের আইনবিষয়ক সচিব ছিলেন (১৮৩৪-৩৮)। তিনি ১৮৩৫ সালে ভারতের শিক্ষাসংক্রান্ত একটি ‘মিনিট’ তৈরি করেন, যা ‘মেকলে মিনিট’ নামে পরিচিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ-যাবৎ ফারসি ও সংস্কৃত ভাষার প্রচলন ছিল। বিশেষত, অফিস-আদালতে ফারসির একচেটিয়া প্রভাব ছিল। মেকলের প্রস্তাব অনুসারে সরকার ১৮৩৭ সালে ফারসি ভাষা রহিত করে ইংরেজি ভাষা চালু করে। ‘মিনিটে’ বলা হয়, ইংরেজি ভাষাজ্ঞান ব্যতিরেকে সরকারি চাকরিতে কেউ নিয়োগ পাবে না। তিনি যুক্তি হিসেবে একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন, তা হলো ইংরেজি ভাষাজ্ঞান ও বিদ্যাশিক্ষার ফলে নেটিভদের মধ্যে এমন একটি অনুগত শ্রেণি তৈরি হবে, ‘যারা রক্তে-মাংসে হবে ভারতীয়, কিন্তু রুচি, নীতি ও শিক্ষায় হবে ইংরেজ। এই নতুন শিক্ষিত শ্রেণিই ভবিষ্যতে ইংরেজ শাসনকে মজবুত করতে সহায়ক হবে।’ তিনি গর্বভরে এ কথাও বলেন, ‘একটি ভালো ইউরোপীয় গ্রন্থাগারের একটি মাত্র তাক সমগ্র ভারত ও আরবের স্থানীয় সাহিত্যের সমতুল্য।’ এখানে মেকলে ঔপনিবেশিক শাসকদের ‘সুপিরিয়র কমপ্লেক্স’ বা উচ্চমন্য মনোভাবের সুরে কথা বলেন, যেখানে তাঁরা উপনিবেশিতদের নিম্ন শ্রেণির মানুষ বলে গণ্য করে থাকেন। আইনের চোখে ব্রিটিশ নাগরিক হয়েও ভারতীয়রা চিরকাল ‘নেটিভ’ থেকে যায়। প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল কটাক্ষ করে মহাত্মা গান্ধীকে ‘নেকেড নেটিভ’ বলতেন। আমরা অতীতেও এরূপটি দেখেছি, যখন উপনিবেশতত্ত্ব সম্বন্ধে কোনো ধারণা ছিল না। বহিরাগত আর্যরা ভারত জয় করে স্থানীয় অধিবাসী অনার্যদের অসভ্য, বর্বর, রাক্ষস ইত্যাদি ঘৃণাবাচক শব্দ প্রয়োগ করত। সংস্কৃত ‘আর্যমূলশ্রীকল্প’ গ্রন্থে পাওয়া যায়, আর্যরা বঙ্গবাসীকে ‘পাপী’, ‘পাখি’, ‘মেøচ্ছ’ ইত্যাদি নামে অভিহিত করত। শুধু তা-ই নয়, বঙ্গ ভূখণ্ড তাদের কাছে ছিল অপবিত্র; বঙ্গদেশে গমন করলে প্রায়শ্চিত্ত করার বিধান ছিল। বহিরাগত মুসলিম শাসকেরা স্থানীয় অমুসলিম প্রজাদের ‘জিম্মি’ বলে আখ্যাত করেন, যার অর্থ নাগরিক অধিকার নয়, শাসকের কৃপার ওপর নির্ভর করে বসবাস করতে হতো।
মেকলের নীতি ঘোষণার পর কলকাতায় ইংরেজি ভাষাশিক্ষার হিড়িক পড়ে যায়। প্রেসিডেন্সি কলেজের কাছেই ছিল ডেভিড হেয়ারের ‘হিন্দু স্কুল’ নামে একটি ব্যক্তিগত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখানে ভর্তি হওয়ার জন্য উচ্চবিত্তের সন্তানেরা হেয়ারকে দেখলে তাঁর পেছন ধরে আকুল আবেদন করত তাঁর সেমিনারিতে ভর্তি করার জন্য।
মেকলের এরূপ দম্ভোক্তি ও কটূক্তি করার আগেই দেখা গেছে, ইংরেজি শিক্ষা ও পাশ্চাত্যবিদ্যা এদেশের মানুষের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করে, তার স্বরূপ জানা যায় ১৮১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হিন্দু কলেজের ছাত্রদের ‘ইয়ং বেঙ্গল’ (১৮২৬) আন্দোলনে। এতে শিক্ষক ডিরোজিও নেতৃত্ব দেন। কলকাতার উচ্চ ও ধনী পরিবারের সন্তানেরাই এখানে পড়ার সুযোগ পেত। তারা প্রকাশ্যে মদ্যপান এবং অশ্লীল আচরণ করত। তাদের ধারণা হয়—ইউরোপের যা কিছু সবই উত্তম আর ভারতের সবকিছু নিকৃষ্ট। সরকারের প্রণোদনায় কলকাতায় ‘আলিয়া মাদ্রাসা’ (১৮০১) এবং ‘সংস্কৃত কলেজ’ (১৮২৪) ছাড়া উচ্চশিক্ষার অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। হুগলির ‘মহসিন হুগলি কলেজ’ই (১৮৩৬) প্রথম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেখানে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। ১৮৫৫ সালে হিন্দু কলেজকে ‘প্রেসিডেন্সি কলেজে’ রূপান্তরিত করে সবার জন্য শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত করা হয়। ১৮৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়’। সরকারের অর্থানুদানে কয়েকটি জেলাশহরে উচ্চবিদ্যালয়ও খোলা হয়।
বিদ্যালয়গুলোতে বাংলা শিক্ষার ব্যবস্থা হলেও কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে তেমন গুরুত্ব পায়নি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ খোলা হয়নি, ‘আধুনিক ভারতীয় ভাষাসমূহ বিভাগে’ অন্য ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষা শিক্ষা দেওয়া হতো। ১৮০০ সালে প্রতিষ্ঠিত ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা বিভাগ ছিল, ভাষা শিক্ষা দেওয়ার জন্য দেশীয় মুনশিও নিয়োগ করা হয়, কিন্তু শিক্ষালাভ করত ইংরেজ সিভিলিয়ানরা, দেশীয় সন্তানেরা নয়। বাংলা শিক্ষা দেওয়ার জন্য কোনো পাঠাপুস্তক ছিল না। বিভাগের প্রধান উইলিয়াম কেরিসহ মুনশিদের চেষ্টায় বাংলা গদ্যে পাঠ্যপুস্তক রচিত হলো, যা ছিল ‘শাপে বর’। গদ্যের আবিষ্কার আমাদের চিন্তাজগতের নতুন দিগন্ত খুলে দেয়, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব বাংলা সাহিত্যে ও সাংবাদিকতায় অচিরেই প্রতিফলিত হয়। কোম্পানি আমলের একশ বছরের শিক্ষা ও বিদ্যাচর্চার এটাই ছিল সংক্ষিপ্ত হালহকিকত। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে কী শিক্ষা দেওয়া হতো? তখনকার কারিকুলাম ও সিলেবাস আমাদের জানা নেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর লেখায় এ বিষয়ে কিছু আলোকপাত করেছেন। এখানে দু-একটি উক্তি অপ্রাসঙ্গিক হবে না। তিনি ইতিহাস-বিষয়ক একটি প্রবন্ধে বলেন, ‘ভারতবর্ষের যে ইতিহাস আমরা পড়ি এবং মুখস্থ করিয়া পরীক্ষা দিই, তাহা নিশীথকালের দুঃস্বপ্ন মাত্র। ...আমাদিগকে বিদেশি লিখিত নিন্দোক্তি বাধ্য হইয়া অধ্যয়ন করিতে হয়, তাহা মুখস্থ করিয়া পরীক্ষা দিতে হয়। ...পরের রচিত ইতিহাস নির্বিচারে আদ্যোপান্ত মুখস্থ করিয়া পণ্ডিত এবং পরীক্ষায় উচ্চ নম্বর রাখিয়া কৃতী হওয়া যাইতে পারে, কিন্তু স্বদেশের নিজেরা সংগ্রহ এবং রচনা করিবার যে উদ্যোগ, সেই উদ্যোগের ফল কেবল পাণ্ডিত্য নয়, তাহাতে আমাদিগের মানসিক বদ্ধ জলাশয়ে স্রোতের সঞ্চার করিয়া দেয়। সেই উদ্যমে, সেই চেষ্টায় আমাদের স্বাস্থ্য, আমাদের প্রাণ।’
কবির অপর উক্তি : ‘ইংরেজি সাহিত্য হইতে আমরা যে পরিমাণ মাদক পাইয়াছি, সেই পরিমাণ খাদ্য পাই নাই। তখনকার দিনে আমাদের সাহিত্য-দেবতা ছিলেন শেকসপিয়ার, মিল্টন ও বাইরন।’
বিশ্বকবি সে যুগে প্রচলিত ইতিহাসকে ‘নিশীথ কালের দুঃস্বপ্ন’, ও ‘নিন্দোক্তি’ বলেছেন, আর ইংরেজি সাহিত্যকে ‘খাদ্য’ অপেক্ষা অধিক ‘মাদক’ সরবরাহকারী বলেছেন। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ত্রিকালদর্শী, তাঁর পর্যবেক্ষণশক্তি ছিল অসাধারণ, প্রকাশের ভাষাও ছিল অপরিসীম। তাঁর প্রতিটি বাক্য বর্ণে বর্ণে সত্য। নানা সূত্র থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যবিষয় হিসেবে হোমার, শেকসপিয়ার, শেলি, বাইরন, মিল্টন প্রমুখের সাহিত্যকর্ম; স্টুয়ার্ট মিল, ডেভিড হিউম, জেরেমি বেন্থাম প্রমুখের দর্শনশাস্ত্র; জন ক্লার্ক মার্শম্যানের ‘হিস্টরি অব বেঙ্গল’ (১৮৪৪) ইত্যাদির নাম জানা যায়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মার্শম্যানের গ্রন্থের বঙ্গানুবাদ ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’ (১৮৫৯) রচনা করেন। গ্রন্থের ভূমিকায় লেখা হয় : ‘বাঙ্গালার ইতিহাসের দ্বিতীয় ভাগ শ্রীযুক্ত মার্শমন সাহেবের রচিত ইঙ্গরাজী গ্রন্থের শেষ নয় অধ্যায় অবলম্বন পূর্বক সঙ্কলিত, ঐ গ্রন্থের অবিকল অনুবাদ নহে। ...এই পুস্তকে অতি দুরাচার নবাব সিরাজউদ্দৌলার সিংহাসনারোহণ অবধি চিরস্মরণীয় লর্ড উইলিয়ম বেন্টিক মহোদয়ের অধিকার পর্যন্ত বৃত্তান্ত বর্ণিত আছে।’ —ঈশ্বর চন্দ্র শর্মা। তিনি সিরাজকে ‘দুরাচার নবাব’ এবং বেন্টিঙ্ককে ‘মহোদয়’ বলেছেন।
আমরা এরূপ পাশ্চাত্য শিক্ষা ও বিদ্যা নিয়ে যখন লেখালেখি শুরু করি, তখন বলবৃদ্ধিকারক খাদ্য অপেক্ষা নেশাবর্ধক মাদকই অধিক উৎপাদন করি। উনিশ শতকের প্রথমার্ধে রচিত বাংলা কাব্য, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, সংবাদপত্র পাঠ করলে এর সত্যতা প্রমাণিত ও তাৎপর্য প্রতিষ্ঠিত হয়। সেকালের প্রভাবশালী ‘সংবাদ-প্রভাকর’ পত্রিকার সম্পাদক ও বঙ্কিমচন্দ্রের ‘সাহিত্যগুরু’ কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত ব্রিটিশের বিজয় ও ক্ষমতালাভকে ‘ঈশ্বরের আশীর্বাদ’ বলে মনে করেন। তিনি ১৮৫৭ সালে ‘সিপাহি বিদ্রোহে’ ইংরেজের বিজয়ে উল্লাস প্রকাশ করে বলেন, ‘ভারতের প্রিয়পুত্র হিন্দু সমুদয়।/ মুক্তমুখে বল সবে ব্রিটিশের জয়।’
ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মুসলিম শাসকদের হেয়প্রতিপন্ন করে উপন্যাস রচনা করে নিন্দার ভাগী হন। অপর ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট নবীনচন্দ্র সেন ‘পলাশীর যুদ্ধ’ (১৮৭৫) নামক তথাকথিত মহাকাব্যে সিরাজউদ্দৌলার প্রতি ‘ঘৃণিত কুক্কুর’, দুরন্ত পামর’, ‘বিষধর সর্প’ ইত্যাদি শব্দ প্রয়োগ করে তাঁকে হীনচরিত্র রূপে অঙ্কিত করেছেন। তাঁর একটি উক্তি :
‘বীরশ্রেষ্ঠ আলিবর্দি সমরে শমন,/ ছিল যেই সিংহাসনে ইন্দ্রের মতন
পরাক্রম পরন্তপ এতাদৃশ শূর,/ এখন বসেছে এক ঘৃণিত কুক্কুর!’
কবির চোখে আলিবর্দি ‘বীরশ্রেষ্ঠ’, ‘ইন্দ্রের মতন’ ও ‘পরাক্রম শূর’। তাঁরই পরম স্নেহপালিত ও মনোনীত নবাব সিরাজকে ঘৃণ্য ও কলঙ্কিত চরিত্ররূপে উপস্থাপন ছিল সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, কাব্যখানি দীর্ঘকাল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকের তালিকাভুক্ত ছিল। একা নবীনচন্দ্র সেন নন, আরও অনেকে সিরাজদ্দৌলার চরিত্রে কলঙ্কারোপ করে কবিতা লিখেছেন। যেমন হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় সিরাজদ্দৌলা সম্বন্ধে লিখেছেন, ‘গর্ভবতী রমণীর জঠর খণ্ডিয়া/ দেখিত জরায়ু পিণ্ড/ জীবিত জীবের দণ্ড/ করিত অশেষ রূপ দুর্মদে ডুবিয়া।’
সিরাজদৌল্লাকে অপদস্থ, অপমানিত, কলঙ্কিত করে এসব রচনার একটাই উদ্দেশ্য ছিল পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজদের অপকীর্তি, অপযশ ও অনাচার ‘জাস্টিফাই’ ও চাপা দেওয়ার জন্য। পরবর্তীকালে গিরিশ্চন্দ্র ঘোষ রচিত ‘সিরাজদ্দৌলা’ (১৯০৬) নাটকে এর বিপরীত চিত্র রয়েছে। সেখানে নবাবকে বাংলার স্বাধীনতার প্রতীক রূপে চিত্রিত করা হয়েছে। আসলে ঔপনিবেশিক আমলে আমরা নানা দ্বিধাদ্বন্দ্ব, স্ববিরোধিতা, দ্বৈততার মধ্যে কালযাপন করেছি।
আমরা প্রায়শই বলে থাকি, ইংরেজি ভাষা ও পাশ্চাত্যবিদ্যা শিক্ষার ফলে আধুনিক বাংলার সূত্রপাত হয়। কিছু ভালো ও গুণী মানুষের আবির্ভাব হয়। ভালো মানুষ ছিলেন রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব, স্বামী বিবেকানন্দ প্রমুখ। বঙ্কিমচন্দ্রের সাম্প্রদায়িকতার দোষ ছাড়া আর সব গুণ ছিল উত্তম ও প্রগতিশীল। উনিশ শতকে সীমিত ধারার আংশিক ও খণ্ডিত রেনেসাঁর মুখও দেখা যায়, তা এসব মানুষের কর্মকাণ্ড ও চিন্তাভাবনার মধ্যে নিহিত। ভালো গুণের মধ্যে রয়েছে স্বদেশপ্রেম, স্বাধীনতাপ্রীতি মুক্তচিন্তা, ব্যক্তি-অধিকার, বাক্স্বাধীনতা, যুক্তিবাদ, মানবতাবাদ, ইহজাগতিকতা ইত্যাদি। এসব মানবিক গুণকে দেশের, জাতির, সমাজের কল্যাণের সঙ্গে জড়িত না করে ব্যক্তিস্বার্থে ও সাম্প্রদায়িক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়। রাজধানী ও বাণিজ্যনগর কলকাতাকে কেন্দ্র করে যে নব্য মধ্যবিত্তশ্রেণির উদ্ভব হয়, তাতে ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক কারণে হিন্দু সম্প্রদায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ‘রেনেসাঁ পুরুষ’ বলে খ্যাত উপরের ব্যক্তিবর্গ আন্দোলন, সাহিত্য, সংগঠন, সভা, সমিতির মাধ্যমে যে জাগরণের সুর তোলেন, তা প্রধানত হিন্দু সম্প্রদায়ের পক্ষে গেছে। তাঁরা যে জাতীয়তাবাদের কথা বলেন, তা ছিল হিন্দুত্ববাদ ও হিন্দুধর্মের পুনরুত্থানের নামান্তর, বাঙালি বা ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ছিল না। সেখানে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী মুসলমানদের উপস্থিতি ছিল না। থাকলে কী হতো? তাঁরাও যে নিজেদের স্বার্থকে বড় করে দেখতেন, একই শতকের দ্বিতীয় ভাগে আবদুল লতিফ ও আমীর আলির কণ্ঠে সে রকম সুরই শোনা গেছে। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম্’ সংগীতে মুসলমানরা অংশগ্রহণ করতে পারে না, করেওনি।
এরূপে বাংলার দুটি বড় সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে পরস্পরকে মুখোমুখি দাঁড় করার কাজটি ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী সুকৌশলে করে গেছেন, যার বীজ উপনিবেশবাদের অভ্যন্তরে নিহিত রয়েছে। বাংলায় ইংরেজের বিজয় ও শাসননীতির দুইশ বছরের ইতিহাস লক্ষ করলে চারটি সূক্ষ্ম ও কূট পদ্ধতি ধরা পড়ে, যথা ১. ‘কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা’ নীতি দ্বারা বাংলা বিজয়, ২. ‘সুয়োরানি ও দুয়োরানি’ নীতি দ্বারা জাতির বিভাজন, ৩. ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ নীতি দ্বারা শাসনকাজ পরিচালনা এবং ৪. ‘দ্বিজাতিতত্ত্বে’র ধর্মীয় ফর্মুলা দ্বারা দেশ ও জাতিকে খণ্ডিত ও বিচ্ছিন্নকরণ। পদ্ধতিগুলো পরস্পর সম্পর্কিত। ১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধের ষড়যন্ত্রে প্রথম নীতি, ১৭৯৩ সালের ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’, ‘সান্ধ্য আইন’ ও ‘কর্নওয়ালিশ কোর্ড’ (স্থানীয়দের দায়িত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ রোহিত করা) দ্বিতীয় নীতি, ১৯০৫ সালে বাংলা ‘ডিভিশন’ বা বিভাগে তৃতীয় নীতি এবং ১৯৪৭ সালে বাংলা ‘পার্টিশন’ বা বিচ্ছেদে চতুর্থ নীতির সার্থক প্রয়োগ প্রত্যক্ষ করা যায়। আশা করি, ইতিহাসবিদদের কাছে এগুলোর ব্যাখ্যার প্রয়োজন হবে না। ইংরেজের ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ আমাদের দেশ ও জাতির জন্য অভিশাপ ছিল।
প্রায় ৮০ বছর হলো, আমরা এই অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়েছি। রাজনৈতিক মুক্তি বা স্বাধীনতা অর্জিত হলেও অনেক বিষয়ে সেই ঔপনিবেশিক আমলের পিছুটান রয়ে গেছে। এখন আমাদের করণীয় কী? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম উক্তির দ্বিতীয়াংশে তার দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি স্বদেশবাসীকে স্বয়ং ‘সংগ্রহ ও রচনা করিবার উদ্যোগ’ নিতে বলেছেন, যাতে ‘আমাদের মানসিক বদ্ধ জলাশয়ে স্রোতের সঞ্চার’ হয়। তাঁর মতে, ‘সেই উদ্যেমে, সেই চেষ্টায় আমাদের স্বাস্থ্য, আমাদের প্রাণ।’
এ কথা বলা যথার্থ হবে, ইংরেজশাসিত ঔপনিবেশিক আমলের ‘ভাইস ও ভার্চু’ উভয় আছে। আমাদের কর্তব্য হবে, এরূপ দোষগুণ নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ করে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করা। আমরা পরস্পরকে যদি বুঝতে পারি, তবে অতীতের ভুলভ্রান্তির ও দোষারোপের অবসান ঘটবে এবং একটা আস্থার জায়গা তৈরি হবে। আমি গুণী মনীষীদের বাংলার এরূপ সত্য ইতিহাস পুনরুদ্ধার ও পুনর্নির্মাণের আহ্বান জানাই।