রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ :
• দেশে হাম উপসর্গে আরও ৭ জনের মৃত্যু • রাত নামলেই মৃত শিশু যেখানে ফেরত দেয় মুদ্রা, পিছু নেয় অদৃশ্য গাড়ি! • রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে ৬০ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেবেন ট্রাম্প • অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোই দুর্গাপূজার মূল দর্শন : রাষ্ট্রপতি • বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান শেখ আব্দুল হান্নান কাতারে গ্রেপ্তার • চকবাজারে আগুন  আবার অশনি সংকেত • সুনির্দিষ্ট হামলার শঙ্কা ও নিরাপত্তায়  অস্ত্র উঁচিয়ে ধরি: বিবৃতিতে ইশরাক • জ্যামাইকা হাসপাতালে ১৫ কোটি ডলারের জরুরি বিভাগ • ক্রিপ্টো প্রতারণায় নিষিদ্ধ মাশিনস্কি • এএবিইএ নিউইয়র্ক চ্যাপ্টারের সম্মেলন ২৪ অক্টোবর

রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

চকবাজারে আগুন  আবার অশনি সংকেত

চকবাজারে আগুন  আবার অশনি সংকেত

বিজ্ঞাপন
দেশের অন্যতম পাইকারি বাজার রাজধানী ঢাকার চকবাজার। বড় কোনো সড়ক না থাকা গলিসমৃদ্ধ এক এলাকা আসলে এই বাজার। যেখানে বড় বড় ভবনও অনেকটা ঘুপচির মতোই। কারণ আলো-বাতাস, গাড়ি-ঘোড়া ঠিকঠাক প্রবেশের ব্যবস্থা নেই কোথাও। তবু বাণিজ্যে কোনো কমতি নেই। দিনভর ক্রেতা-বিক্রেতায় জমাট থাকে পুরো চকবাজার। মুঘল আমল, ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল থেকে হালের বাংলাদেশ—বয়স যত বাড়ছে, এই বাজারে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সারা দেশের দোকানিদের যাতায়াত। কেননা দেশি-বিদেশি পণ্য সুলভে কেনার ক্ষেত্রে চকবাজার আজও তুলনাহীন। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণের কুফল হিসেবে এলাকাটি যে মৃত্যুকূপে রূপ নিতে পারে, এক-দুই বছর পরপরই কিন্তু পাওয়া যায় সেই অশনিসংকেত। চকবাজারে সর্বশেষ নেতিবাচক ঘটনা ঘটে ১২ অক্টোবর সোমবার বিকেলে। এখানকার মনজুর খান প্লাজা নামের সাততলা ভবনের ষষ্ঠ তলায় একটি দোকানে আগুন লাগে। সেই আগুন নেভাতে লেগেছে ছয় ঘণ্টার বেশি সময়। যেখানে দমকল বাহিনীর ১০টি ইউনিট অগ্নিনির্বাপণের কাজে যুক্ত ছিল। এই অগ্নিকাণ্ড নিয়ে অদ্ভুত এক সংবাদ শিরোনাম পাঠের সৌভাগ্য হলো। যেখানে তথ্যখানি এমন—দুই মিনিটের পথ আসতে ফায়ার সার্ভিসের লেগে গেছে ২০ মিনিট। এটা কি দেশের দমকল বাহিনীর সক্ষমতার ঘাটতির ইঙ্গিত করছে? ঘটনা আসলে তা নয়। মূলত সরু গলি, পানির স্বল্পতা ও প্রচণ্ড ধোঁয়ার কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা ছিল অনেক কঠিন এক লড়াই। যাতে শেষ পর্যন্ত তারা জয় পেয়েছে। আগুন পরাজিত হয়েছে। আর পাওয়া যায়নি কোনো হতাহত হওয়ার খবর। এটা নিঃসন্দেহে ভালো খবর। তবে পুরো ভালো বলা যায় না, বড়জোর মন্দের ভালো বলা যাবে। কারণ ব্যবসায়ীদের পণ্য নিশ্চয় ছাই হয়ে গেছে।
এ ধরনের দুর্ঘটনায় প্রায়ই নিঃস্ব হয়ে পড়েন শহর ঢাকার ব্যবসায়ীরা। আর প্রাণহানি হলে তো সেই ক্ষতি অপূরণীয়। নিমতলী-চকবাজার-বনানী-মগবাজার; গত কয়েক বছরে আমরা দেখেছি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ঝরে গেছে শত প্রাণ। তবু নিয়তি মেনেই যেন ঝুঁকির ভবনে বসত করেন অনেকে। জানমাল ঝুঁকিতে রেখেই চকবাজারের মতো এলাকায় ব্যবসা করতে দ্বিধা করেন না নাগরিকেরা। যেখানে বিদ্যুৎজনিত ঝুঁকি দৃশ্যমান পদে পদে। কারণ ঘিঞ্জি এলাকায় ভবনের পাশ ঘেঁষে চলে গেছে সঞ্চালনের তার। কোনো কোনো বাড়ির বারান্দা থেকে হাত বাড়ালেই ধরা যায় খুঁটির তার কিংবা ট্রান্সফরমার। ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে যে আগুনে ১২৪ জন মানুষ মারা যায়, সেখানে এমন ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণ থেকেই ছড়িয়ে পড়ে আগুন। তখন শহরের ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে কথা হলেও সমস্যার সমাধান আজও হয়নি। শহরের বিদ্যুৎ সঞ্চালন-ব্যবস্থা মাটির নিচে নেওয়ার উদ্যোগ এখনো আছে পরীক্ষামূলক অবস্থায়।
অন্যদিকে ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চকবাজারের চুড়িহাট্টায় যে আগুন রাস্তা থেকে রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে, সেখানে গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণই ছিল প্রধান কারণ। আর গলি আগুনের নদীতে পরিণত হয় বাড়িতে বাড়িতে দাহ্য রাসায়নিক পদার্থের গুদাম থাকায়। সেই অগ্নিকাণ্ডে ৭৮ জন মানুষ প্রাণ হারালেও এখনো রয়ে গেছে রাসায়নিকের গুদাম। পুরান ঢাকার বাইরে রাসায়নিক গুদাম নিয়ে যাওয়ার সরকারি উদ্যোগ এগোচ্ছে ধীরগতিতে।
এমন নানা কারণে পুরান ঢাকায় অগ্নিঝুঁকি বেশি, এ বিষয়ে সকলেই একমত। অথচ সেই তুলনায় অগ্নিনির্বাপণ-ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ব্রিটিশ আমলে সেই তুলনায় অবকাঠামো ভালো ছিল। কয়েক বছর আগে আমাকে এমন তথ্য জানিয়েছিলেন ঢাকা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আজিম বখশ। তার ভাষ্যমতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও পুরান ঢাকার মদন সাহা লেনে—এই গলির মধ্যে কিন্তু বড় বড় ট্যাঙ্ক করা ছিল। পাকা সেই ট্যাঙ্কের মধ্যে পানি ছিল। এগুলো মূলত ফায়ার হাইড্র্যান্ট। আগুন লাগলে তা ব্যবহার করা হতো।
আমাদের শহরে আগুনের ঝুঁকি থাকা ঘিঞ্জি চকবাজারের মতো অনেক এলাকা আছে। আবার আছে ঝুঁকিপূর্ণ অনেক ভবনও। তবে ঢাকা শহরে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সুনির্দিষ্ট তালিকা কখনোই তৈরি হয়নি। সরকারের একেক প্রতিষ্ঠান একেক রকম সংখ্যা জানিয়েছে। ২০১৬ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের জানানো হিসাবে শহরে ঝুঁকিতে আছে এমন ভবনের সংখ্যা ৭২ হাজার। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) এক দশক আগের একটি হিসাবে ঢাকা শহরে ভবনের সংখ্যা ২২ লাখ। সেই সময় তারা অতি ঝুঁকিপূর্ণ বলেছিল ৩২১টি ভবনকে। যার মধ্যে পুরান ঢাকায় রয়েছে ৩৯টি। তবে তাদেরই এক জরিপ থেকে জানা যায়, ঢাকা নগরের ৭৫ শতাংশ ভবনই কোনো না কোনোভাবে নিয়ম লঙ্ঘন করেছে। এ হিসাবে সেসব ভবনে নিরাপত্তাহীনতার বিষয় রয়েছে।
রাজধানী ঢাকার সেবা সংস্থাগুলোর অপরিকল্পিত সঞ্চালন লাইনের কারণে অনেক এলাকা বিপজ্জনক পরস্থিতিতে পড়তে পারে। আবাসিক ভবনের পাশে কলকারখানা গড়ে ওঠার কারণে ঝুঁকি তৈরি হয়। বাড়িতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার যথাযথ অবকাঠামো না থাকার কারণেও ঝুঁকি তৈরি হয়। মগবাজারে পাঁচ বছর আগে গ্যাস বিস্ফোরণে ১১ জনের প্রাণহানি হয়েছিল। সেখানে গ্যাস লাইনের ত্রুটির বিষয়টি সামনে আসে। আবার বর্জ্য জমে মিথেন গ্যাস তৈরির সম্ভাব্য কারণের কথাও বলা হয়েছিল তখন। এর দায় কিন্তু নগরের সংশ্লিষ্ট পরিষেবা সংস্থারও।
কমবেশি দায় রয়েছে প্রায় সব তদারকি কর্তাদের। যেমন যেখানে নির্মাণের নীতিমালা মেনে যথাযথ ভূমিকম্প প্রতিরোধী ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকলে ভবনের বাসিন্দারা ঝুঁকিতে পড়েন, সেটাতে অবশ্যই রাজউক ও দমকল বাহিনীর হেলাফেলার ব্যাপার থাকে। এই ঢাকা শহরে ভবন নির্মাণে নকশা না মানার অভিযোগ অনেক পুরোনো, যা রাজউকের গাফিলতির চিত্রটাকে আরও করুণ হিসেবেই দেখায় আসলে। প্রশাসনের এই ঘাটতির কারণে ঘটতে পারে প্রাণহানি। যেমন ২০১৯ সালের ২৮ মার্চ বনানীর ২২ তলা ভবন এফআর টাওয়ারে আগুন ধরে যায়। এতে ২৬ জনের মৃত্যু হয়। আহত হয় ৭০ জন। সেই ভবনে অগ্নিকাণ্ডের জন্য দ্রুত বের হওয়ার বিকল্প কোনো সিঁড়িই ছিল না। অনেকেই তাই কাচের দেয়াল ভেঙে লাফিয়ে পড়ে আহত-নিহত হন। তবে এই ভবন নিয়ে বড় অভিযোগ হলো নকশা লঙ্ঘন। এফ আর টাওয়ার রাজউক থেকে ১৮ তলার নকশার অনুমোদন নিয়ে ২৩ তলা করা হয়। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পরে নকশার এই অনিয়ম নিয়ে মামলাও হয়েছিল।
নগর নিরাপত্তার অনেক বিষয় আসলে আদালত অবধি গড়িয়েছে। অনেক ইতিবাচক রায়ও এসেছে। কিন্তু বাস্তবায়ন ঘটে না খুব একটা। বিষয়টি এমন, বেড়ালের গলায় ঘণ্টাখানি বাঁধবে কে? আদর্শ হতে পারেন কোনো একজন নগরপিতা। সামনে তো কেউ না কেউ জিতে আসবেন, কেউ কি এমন কিছু করে দেখাতে পারবেন? অন্তত চকবাজারের অগ্নিকাণ্ড আবার যে অশনিসংকেত দিয়ে গেল, নতুন দিনের কোনো হবু মেয়র কি পারবেন, সেটা ধরে নগরবাসীর নিরাপত্তা পরিকল্পনা ঢেলে সাজাতে?
 

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz