(পূর্ব প্রকাশের পর)
রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হওয়ার পর ‘বাংলাকে’ পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার জন্য পরিষদ একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং সেই সঙ্গে পাকিস্তান গণপরিষদে সরকারি ভাষার তালিকা থেকে বাংলা ভাষাকে বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ সমগ্র পূর্ব বাংলায় সাধারণ ধর্মঘটের আহ্বান জানিয়ে অপর একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার নিমিত্তে এটাই ছিল উল্লেখযোগ্য আনুষ্ঠানিক সাংগঠনিক কার্যকর প্রথম পদক্ষেপ।
১১ মার্চ সাধারণ ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ায় ধর্মঘট সফল করার জন্য কর্মীরা বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করে। অন্যদিকে ধর্মঘট বানচাল করার উদ্দেশ্যে মুসলিম লীগ ও সরকারপক্ষ থেকে নানা ধরনের তৎপরতা শুরু হয়। ১১ মার্চের ধর্মঘট সম্পর্কে বিস্তারিত কর্মসূচি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে ১০ মার্চ রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের একটি সভা হয়। ১১ মার্চ পর্যন্ত ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করা না হলেও প্রতিকূল পরিস্থিতির উদ্ভব হলে কী কর্মপন্থা অবলম্বন করা দরকার, সে বিষয়ে এই সভায় আলোচনা হয়। এ ছাড়া পরদিন ধর্মঘটের সময় বিভিন্ন এলাকায় পিকেটিং সফল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
১১ মার্চ সকাল থেকে ইডেন বিল্ডিংয়ের প্রথম ও দ্বিতীয় গেট, রমনা পোস্ট অফিস, পলাশী ও নীলক্ষেত ব্যারাক, জেলা আদালত, হাইকোর্ট, রেলওয়ে ওয়ার্কশপ ইত্যাদি স্থানে বিশেষ পিকেটিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়। এই ব্যবস্থা অনুযায়ী ১১ মার্চ খুব ভোর থেকেই ছাত্ররা পিকেটিংয়ের জন্য পূর্বনির্ধারিত স্থানে উপস্থিত হয়। রেলওয়ে ওয়ার্কশপে কাজ শুরু হতো ভোর পাঁচটা থেকে। সে জন্য ছাত্ররা সেখানে ভোর পাঁচটার আগেই উপস্থিত হয়। অফিসের লোকজন যেসব এলাকায় তখন বসবাস করত, সেসব এলাকায়, যেমন নীলক্ষেত ও পলাশী ব্যারাকে ছাত্ররা অফিস শুরু হওয়ার বেশ আগেই উপস্থিত হয়। রমনা ডাকঘরের সামনে ছাত্ররা পিকেটিং করার সময় তাদের কয়েকজনকে পুলিশ গ্রেফতার করে। হাইকোর্টের গেটের সামনে ছাত্ররা পিকেটিং শুরু করে উকিলদেরকে সেদিনের জন্য আদালত বর্জনের অনুরোধ ও চাপ প্রয়োগ করতে থাকলে উকিলদের মধ্যে কারও কারও সঙ্গে ছাত্রদের বাদানুবাদ শুরু হয়। এ প্রসঙ্গে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক অমৃতবাজার পত্রিকার এক প্রতিনিধিকে বলেন :
‘বেলা ১০টা ৩০ মিনিটের সময় আমি হাইকোর্টের সামনে উপস্থিত হই, কিন্তু ছাত্ররা সেখানে পিকেটিং করতে থাকার ফলে ভেতরে ঢুকতে অসমর্থ হই। ছাত্রদেরকে আমি বলি যে আমার প্রায় আটটি কেস কোর্টে আছে এবং আমার অনুপস্থিতিতে আমার মক্কেলরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু তাদেরকে এ ব্যাপারে কিছুতেই রাজি করাতে সক্ষম না হয়ে অবশেষে আমি বাড়ির দিকে রওনা হই।’
শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক সাহেবের বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান প্রণীত ‘প্রভু নয় বন্ধু’ বইয়ে। আইয়ুব খান ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং ছিলেন। ওই সময়ে তিনি হাইকোর্টে প্রবেশকালে ছাত্রদের সঙ্গে শেরেবাংলা ফজলুল হক সাহেবের বাদানুবাদ লক্ষ করে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট থাকাবস্থায় স্মৃতিচারণে ‘প্রভু নয় বন্ধু’ বইতে ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন।
১১ মার্চ সকালে সেক্রেটারিয়েটে পিকেটিংয়ের জন্য ছাত্ররা তোপখানা এবং আবদুল গনি রোডস্থ উভয় গেটের সামনেই উপস্থিত হয়েছিল। আবদুল গনি রোডে উপস্থিত ছিলেন শামসুল হক, (আওয়ামী লীগের প্রথম সাধারণ সম্পাদক) শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ প্রমুখ। তোপখানা রোডে উপস্থিত ছিলেন কাজী গোলাম মাহবুব, শওকত আলী, বরকত প্রমুখ। পিকেটিং চলাকালে পুলিশের সঙ্গে শামসুল হক, শওকত আলী, কাজী গোলাম মাহবুব, বরকত প্রমুখের অনেক তর্ক-বিতর্ক হয়। পুলিশকে নানাভাবে বাধা দেওয়ার জন্য সেক্রেটারিয়েটের উভয় গেট থেকে শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, শওকত আলী, কাজী গোলাম মাহবুব প্রমুখকে গ্রেফতার করে ওয়াইজঘাটের কোতোয়ালি থানায় নিয়ে যায়। সেখানে কিছু জিজ্ঞাসাবাদের পর বিকেলের দিকে তাঁদের সকলকেই গ্রেফতার দেখিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রেরণ করা হয়।
১১ মার্চের ধর্মঘটের সময় ছাত্রদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ এবং অন্যান্য নির্যাতনের প্রতিবাদে বেলা আড়াইটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় সভাপতিত্ব করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের আহ্বায়ক নঈমুদ্দিন আহমদ। এই সভায় বক্তারা সরকারের বিরুদ্ধে উত্তেজনাপূর্ণ বক্তৃতা দেন এবং একটি প্রস্তাবে ছাত্রদের ওপর সেদিনকার পুলিশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা ও প্রতিবাদ করেন। এ ছাড়া তাঁরা অন্য একটি প্রস্তাবে পাকিস্তান গণপরিষদের যেসব পূর্ববঙ্গীয় সদস্য বাঙালিদের স্বার্থরক্ষা করতে অক্ষম হন, তাদের পদত্যাগও দাবি করেন।
সেদিনের ধর্মঘটে ছাত্রদের সঙ্গে সেক্রেটারিয়েট ও রেলের কিছুসংখ্যক কর্মচারীও যোগদান করার ফলে ঢাকায় কিছু সময়ের জন্য হলেও আংশিক রেল ধর্মঘট হয়। রেলওয়ে ওয়ার্কশপে ধর্মঘটের জন্য পিকেটিং করার সময় পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদের এক সংঘর্ষ ঘটে এবং কয়েকজন ছাত্র সেখান থেকে গ্রেফতার হয়।
১১ মার্চ শুধু ঢাকাতেই নয়, ঢাকার বাইরেও অনেক জায়গায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে পূর্ণ ধর্মঘট পালিত হয়। পূর্ব বাংলার প্রায় সর্বত্র ওইদিন ছাত্র-ছাত্রীরা পূর্ণ ধর্মঘট পালন করে। প্রায় সকল স্থানেই মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে ধর্মঘট পালিত হলেও যশোরে ধর্মঘটে ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর জেলা কর্তৃপক্ষ পুলিশের মাধ্যমে হামলা চালায়। এই হামলার প্রতিবাদে সেদিন যশোরে সরকারবিরোধী উত্তেজনা বিরাজ করতে থাকে এবং বিকেলের দিকেও এই ঘটনার প্রতিবাদে সমস্ত দোকানপাট বন্ধ রাখা হয়।
১২ মার্চ তারিখে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের আহ্বায়ক নঈমুদ্দিন আহমদ সংবাদপত্রে একটি বিবৃতির মাধ্যমে পূর্বদিনের ধর্মঘটের সময় ছাত্রদের ওপর সরকারি নির্যাতনের প্রতিবাদ করেন। এই বিবৃতিতে তিনি ১১ মার্চের বিভিন্ন ঘটনায় নিহত, আহত ও পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতারকৃত ছাত্রদের যে হিসাব দেন, সে হিসাবমতে আহত ২০০, গুরুতরভাবে আহত ১৮, গ্রেফতার ৯০০ (এদের মধ্যে অনেককে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়) এবং জেলে বন্দী ৬৯।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস অব পাকিস্তান পরিবেশিত একটি সংবাদে বলা হয়, ১২ মার্চ সকালের দিকে জগন্নাথ কলেজে একটি ছাত্রসভা চলাকালে বেলা সাড়ে বারোটার দিকে প্রায় একশ লোক বাইরে থেকে এসে সভার লোকজনের ওপর ইট-পাটকেল ছুড়তে শুরু করে। এই হামলার ফলে কেউ কেউ আহত হন।
জগন্নাথ কলেজের এই ঘটনা ছাড়াও ঢাকায় বিক্ষিপ্তভাবে ওইদিন আরও কয়েকটি ঘটনা ঘটে। দুই ব্যক্তিকে কমিউনিস্ট সন্দেহে লোহার রড দ্বারা আঘাত করা হয়। সেদিন সেক্রেটারিয়েটের সামনের সমস্ত এলাকায় সশস্ত্র পুলিশ পাহারাসহ সেক্রেটারিয়েটের সামনে দিয়ে জনসাধারণের যাতায়াত বন্ধ থাকে। এসব সত্ত্বেও ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয় এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় মিছিল বের করে পুলিশি জুলুম ও বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।
১৩ মার্চ সরকার কলকাতা থেকে প্রকাশিত অমৃতবাজার পত্রিকা, আনন্দবাজার পত্রিকা এবং কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র দৈনিক স্বাধীনতা পাকিস্তান সরকার পূর্ব বাংলায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সেই আদেশ অনুযায়ী ওইদিন তেজগাঁও বিমানবন্দরে এই পত্রিকাগুলো এসে পৌঁছালে সেগুলো পুলিশ হস্তগত করে বাজেয়াপ্ত করে।
১১ মার্চ পুলিশি জুলুমের প্রতিবাদে ও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৩ মার্চ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোর, খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুর ইত্যাদি শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীরা ব্যাপকভাবে ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করে এবং সংগ্রাম পরিষদ ওই ধর্মঘট ১৫ মার্চ পর্যন্ত অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কারণ ওই দিনটি ছিল পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক সভার প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার তারিখ। এভাবেই রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার দাবির গোড়াপত্তন শক্তিশালী হয়। (চলবে)
লেখক : জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও কলামিস্ট।