বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন হতে শুরু করে বাড়তি যত্নেরও। ঠিক যেমনটা প্রয়োজন হয় শিশুদের ক্ষেত্রে। বয়স্করাও ধীরে ধীরে অনেকটা শিশুর মতো হয়ে যান। কোন খাবারগুলো ক্ষতিকর, কোনগুলো নয় তা নিয়ে তারা খুব একটা বাছ-বিচার করেন না। সুস্বাদু বলে অনেক সময় এমন অনেক খাবার খেয়ে ফেলেন, যেগুলো স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই আপনার বয়স যখন ষাটের কাছাকাছি, এই খাবারগুলো এড়িয়ে চলতে হবে-
প্রক্রিয়াজাত মাংস : প্রক্রিয়াজাত মাংসে উচ্চ মাত্রায় সোডিয়াম এবং প্রিজারভেটিভ থাকে, অনেকেরই এটি পছন্দের প্রধান খাদ্য। কিন্তু এটি রক্তচাপ বাড়াতে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করতে পারে। এর ব্যবহার কমানো অত্যন্ত জরুরি, বিশেষ করে ষাট বছর বয়সের পর। হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে মুরগি বা মাছের মতো তাজা খাবার বেছে নিন।
বেশি করে উদ্ভিদ-ভিত্তিক প্রোটিন গ্রহণ করাও উপকারী হতে পারে। প্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর নির্ভর না করে খাবারে স্বাদ আনার উপায় খুঁজে বের করলে তা আপনার খাদ্যাভ্যাসকে ইতিবাচকভাবে পরিবর্তন করতে পারে।
ভেষজ ও মসলা দিয়ে রান্না করলে ক্ষতিকর সংযোজন ছাড়াই খাবারের স্বাদ বজায় রাখা যায়। আপনার খাদ্যাভ্যাসে সামান্য পরিবর্তন আনলেও এর রয়েছে উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্য উপকারিতা।
মিষ্টি পানীয় : মিষ্টি পানীয় দ্রুত তৃষ্ণা মেটাতে পারে, কিন্তু এটি অতিরিক্ত ক্যালোরি ও চিনি বহন করে, যা ওজন বৃদ্ধি এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে বিপাক ক্রিয়া ধীর হয়ে আসায় বিচক্ষণতার সঙ্গে পানীয় বেছে নেওয়া অপরিহার্য।
পানিই সর্বোত্তম বিকল্প, যা অতিরিক্ত ক্যালোরি ছাড়াই শরীরকে আর্দ্র রাখে। স্বাদের জন্য পানিতে ফল বা ভেষজ মিশিয়ে পান করার কথা ভাবতে পারেন।
ভেষজ চা আরেকটি চমৎকার বিকল্প, যা চিনি ছাড়াই বৈচিত্র্য এনে দেয়। মিষ্টি পানীয় গ্রহণ কমালে তা কেবল ওজন নিয়ন্ত্রণেই সাহায্য করে না, বরং সার্বিক স্বাস্থ্যও ভালো রাখে।
সাদা পাউরুটি : সাদা পাউরুটি নরম এবং সুবিধাজনক হলেও বার্ধক্যজনিত শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাব এতে থাকে। এর উচ্চ গ্লাইসেমিক ইনডেক্স রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে, যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সমস্যা তৈরি করে।
হোল-গ্রেইন বা পূর্ণ শস্যের খাবার গ্রহণ করলে উন্নত পুষ্টি এবং টেকসই শক্তি পাওয়া যায়। এতে উচ্চ মাত্রায় ফাইবার থাকে, যা হজমশক্তি এবং হৃদপিণ্ডের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে।
এই পরিবর্তনের মাধ্যমে আপনি দীর্ঘমেয়াদী প্রাণশক্তি এবং সুস্থতা বজায় রাখতে পারেন। হোল-গ্রেইনের স্বাদও হয় আরও সমৃদ্ধ, যা খাবারের তৃপ্তি বাড়ায়। আপনার শরীরকে কার্যকরভাবে পুষ্টি জোগানোর পাশাপাশি পছন্দের স্বাদ খুঁজে পেতে বিভিন্ন ধরনের শস্যের কথা বিবেচনা করুন।
ভাজা খাবার : ভাজা খাবারে অস্বাস্থ্যকর চর্বি এবং ক্যালোরি থাকে। এগুলো হৃদপিণ্ড এবং কোমরের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তাই ষাটোর্ধ্বদের জন্য এগুলো তেমন উপযুক্ত নয়।
স্বাস্থ্যকর বিকল্প হিসেবে বেকিং বা গ্রিলিং করা বুদ্ধিমানের কাজ, কারণ এতে অতিরিক্ত তেল ছাড়াই স্বাদ বজায় থাকে। রান্নার বিভিন্ন পদ্ধতি চেষ্টা করলে আপনার স্বাদে আনন্দদায়ক পরিবর্তন আসতে পারে।
মসলা ও সিজনিং নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলে স্বাভাবিকভাবেই খাবারের স্বাদ বাড়ে। এই কৌশলগুলো অবলম্বন করলে তা হৃদস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী এবং একটি সুষম খাদ্যতালিকা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
ফুল ফ্যাট দুগ্ধজাত পণ্য : ফুল ফ্যাটযুক্ত দুগ্ধজাত খাবার ক্রিমি ও তৃপ্তিদায়ক হলেও, এগুলোতে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ বেশি থাকে, যা কোলেস্টেরলের মাত্রাকে প্রভাবিত করতে পারে। কম-ফ্যাটযুক্ত বা নন-ডেইরি বিকল্প বেছে নিলে অতিরিক্ত ঝুঁকি ছাড়াই একই রকম তৃপ্তি পাওয়া যায়।
আমন্ড, সয়া বা ওট মিল্ক সুস্বাদু বিকল্প হতে পারে। সচেতনভাবে দুগ্ধজাত পণ্য বেছে নিলে তা ওজন নিয়ন্ত্রণে এবং কার্ডিওভাসকুলার স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে, যা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনে উপকারী প্রমাণিত হয়।
উচ্চ-সোডিয়ামযুক্ত খাবার : উচ্চ-সোডিয়ামযুক্ত খাবার টিনজাত এবং প্রক্রিয়াজাত পণ্যে বেশি পাওয়া যায়, এগুলো উচ্চ রক্তচাপ এবং অন্যান্য কার্ডিওভাসকুলার সমস্যাকে বাড়িয়ে তুলতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সোডিয়াম গ্রহণের পরিমাণ পর্যবেক্ষণ করা অপরিহার্য হয়ে ওঠে।
রক্তচাপ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে তাজা ফল ও সবজি এবং কম সোডিয়ামযুক্ত বিকল্প বেছে নিন। একেবারে গোড়া থেকে রান্না করলে উপকরণ এবং মসলার ওপর আরও ভালো নিয়ন্ত্রণ রাখা যায়।
ভেষজ ও মসলার ব্যবহার খাবারের স্বাদকে স্বাভাবিকভাবেই বাড়িয়ে তুলতে পারে। এই অভ্যাসটি হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং সার্বিক সুস্থতা বৃদ্ধি করে। লবণাক্ত খাবারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আপনি আপনার খাদ্যাভ্যাস এবং স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলেন।
পেস্ট্রি এবং কেক : পেস্ট্রি এবং কেক সুস্বাদু হলেও এগুলোতে উচ্চ মাত্রার চিনি এবং অস্বাস্থ্যকর চর্বি থাকে। এগুলো নিয়মিত খেলে ওজন বৃদ্ধি এবং কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। মিষ্টির স্বাস্থ্যকর বিকল্প খুঁজে বের করাই মূল বিষয়। ফল বা দই খেলে মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছা পূরণ হয় এবং পুষ্টিও পাওয়া যায়।
শস্যদানা দিয়ে বেকিং করা এবং রেসিপিতে চিনির পরিমাণ কমানোও স্বাস্থ্যকর বিকল্প। এই পরিবর্তনগুলো করার মাধ্যমে আপনি স্বাদের সাথে আপোস না করেই স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে পারেন। মিষ্টি বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে সচেতন থাকা একটি সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং উন্নত স্বাস্থ্য অর্জনে সহায়তা করে।