বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক নিহত, জাতিসংঘ মহাসচিবের তীব্র নিন্দা * গুতেরেসের আহ্বান-‘এসব হামলা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে’
ইয়েমেনে ফের পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের আশঙ্কা
ঠিকানা রিপোর্ট
প্রকাশ : ১২ অক্টোবর ২০২৬, ২০:৩২
•
অনলাইন সংস্করণ
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। নিহতদের মধ্যে অন্তত দুই বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন। আহতদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে বেসামরিক নাগরিক ও স্থাপনায় হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।
জাতিসংঘের ১১ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শনিবার গভীর রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে গুতেরেস বলেন, বেসামরিক নাগরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে। তিনি বলেন, এসব হামলা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ রোববার জানায়, কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় ৩০৯ জন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত করা হয় এবং একাধিক ফ্লাইট অন্য বিমানবন্দরে সরিয়ে নেওয়া হয়।
নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশি ও মার্কিন নাগরিক রয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে অন্তত চারজন সৌদি নাগরিক, দুইজন বাংলাদেশি এবং একজন মার্কিন নাগরিক রয়েছেন। এ ছাড়া মিসর, জর্ডান, সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও সুদানের নাগরিকও প্রাণ হারিয়েছেন।
বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক স্থাপনায় হামলায় বিভিন্ন দেশের নাগরিক হতাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে নিহতদের সবার পরিচয় এবং আহতদের বিস্তারিত অবস্থা সম্পর্কে আরও তথ্য প্রকাশের প্রয়োজন রয়েছে।
জাতিসংঘ মহাসচিবের বক্তব্যে বেসামরিক মানুষের জীবন রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংঘাতের পক্ষগুলোর প্রতি বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বানও এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে নতুন করে সামনে এসেছে।
এক সপ্তাহে তৃতীয় হামলা হলো। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এটি এক সপ্তাহের মধ্যে হুথিদের তৃতীয় হামলা। এর আগে গত বৃহস্পতিবারের হামলায় তিনজন সৌদি নাগরিক নিহত হন। নিহতদের মধ্যে সৌদি এয়ারলাইনসের একজন পাইলট ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরও আগে কিং খালিদ ও আবহা বিমানবন্দরে হামলায় আরও তিনজন নিহত এবং ৩৬ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
পরপর হামলার ঘটনায় সৌদি আরবের বিমান চলাচল, যাত্রীদের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রাখা ও ফ্লাইট অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার ফলে যাত্রীদের ভোগান্তিও বেড়েছে।
হুথি-নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমের দাবি, রোববার ইয়েমেনের রাজধানী সানার বিমানবন্দরেও বিমান হামলা চালানো হয়েছে। গোষ্ঠীটি এ হামলার জন্য সৌদি আরবকে দায়ী করেছে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন যাচাই সম্পর্কে প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট রোববার আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি হুথিদের হামলা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এভাবে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও পাল্টা বিমান হামলা অব্যাহত থাকলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
২০১৪ সাল থেকে চলা যুদ্ধ আবারও তীব্র। ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহী এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের মধ্যে ২০১৪ সাল থেকে সংঘাত চলছে। সৌদি আরব ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন করে আসছে, অন্যদিকে হুথিরা ইরানের সমর্থন পেয়ে আসছে।
২০২২ সালে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি দীর্ঘ সময় অনেকাংশে কার্যকর থাকলেও চলতি বছরের গ্রীষ্ম থেকে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরে হুথিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলবর্তী এলাকায় অগ্রসর হয়ে মোখা বন্দর এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির কয়েকটি দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
চলতি মাসের শুরুতে ইয়েমেন সরকারের বাহিনী সৌদি নেতৃত্বাধীন বিমান হামলার সমর্থন নিয়ে পাল্টা অভিযান শুরু করে। তাদের লক্ষ্য হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চলগুলো পুনরুদ্ধার করা, যার মধ্যে রাজধানী সানাও রয়েছে।
এর জবাবে হুথিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
লোহিত সাগর ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ইয়েমেনের সংঘাতের প্রভাব এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ওপরও পড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। বাব আল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যকার একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনে এ পথের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির জন্য লোহিত সাগরের গুরুত্ব বেড়েছে। সৌদি কর্মকর্তারা ও ইয়েমেন সরকার দাবি করেছে, তারা লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে। তবে হুথিরা এ দাবি অস্বীকার করেছে।
সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, পণ্য পরিবহন ব্যয় এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে তেল ও গ্যাস পরিবহনের পাশাপাশি বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
নিরাপত্তা পরিষদে ইয়েমেন পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ। গত শুক্রবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে ইয়েমেন পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। জাতিসংঘের ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষ দূত হান্স গ্রুন্ডবার্গ বলেন, দেশটি আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে ফিরে গেছে। সংঘাত তীব্র হওয়ায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়ছে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
জাতিসংঘের উপ জরুরি ত্রাণ সমন্বয়ক মোহাম্মদ ইয়াহিয়া জানান, আগস্ট থেকে ইয়েমেনে দুই লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার পর এটিই নতুন করে বাস্তুচ্যুত মানুষের সর্বোচ্চ সংখ্যা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুদ্ধের বিস্তার, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং বাস্তুচ্যুতির এই পরিস্থিতি ইয়েমেনের মানবিক সংকটকে আরও গভীর করছে।
হামলা বন্ধে আন্তর্জাতিক উদ্যোগের প্রয়োজন বলে মন্তব্য করা হয়েছে। রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের বক্তব্যে বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধার বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। বিমানবন্দরসহ বেসামরিক স্থাপনায় হামলা সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে এবং সংঘাতের মানবিক মূল্য বাড়িয়ে দেয়।
ইয়েমেনে যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়া, সৌদি আরবের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ ঘিরে উত্তেজনা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। সংঘাতের পক্ষগুলোকে হামলা বন্ধ করে আলোচনায় ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।