রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬

রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

পিটিআই শাসিত খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা, গভর্নর শাসন জারি

পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে যাচ্ছে প্রদেশের প্রশাসন, সংবিধানের ২৩২ ও ২৩৪ ধারা প্রয়োগ
পিটিআই শাসিত খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা, গভর্নর শাসন জারি

বিজ্ঞাপন
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) শাসিত খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে জরুরি অবস্থা ও গভর্নর শাসন জারি করেছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। রোববার (১১ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার সুপারিশে প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন। এর ফলে প্রদেশটির নির্বাচিত পিটিআই সরকারের ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়েছে।

পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডন জানিয়েছে, প্রদেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠকের পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনেও জরুরি অবস্থা জারির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রেসিডেন্টের দপ্তর জানিয়েছে, সংবিধানের ২৩২ ও ২৩৪ ধারার আওতায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সংবিধানের ২৩৩ ধারায় জরুরি অবস্থার সময় কিছু মৌলিক অধিকার স্থগিত করার ক্ষমতার বিধানও রয়েছে।

ইমরানকে মুক্তির দাবিতে লংমার্চ
খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এল, যখন কারাবন্দি ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে পিটিআইয়ের আন্দোলন জোরালো হচ্ছে। গত ৫ অক্টোবর থেকে রাজধানী ইসলামাবাদ অভিমুখে লংমার্চ শুরু করেছে দলটি। এতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রদেশটির মুখ্যমন্ত্রী সোহাইল আফ্রিদি।

ইমরান খান ২০২২ সালে পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে প্রধানমন্ত্রীর পদ হারান। ২০২৩ সালে গ্রেপ্তারের পর বিভিন্ন মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে দণ্ড দেওয়া হয়। এসব মামলার বিচার ও দণ্ড নিয়ে পাকিস্তানের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পিটিআই। দলটির দাবি, ইমরান খানের মুক্তি এবং তাঁর যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।

লংমার্চের লক্ষ্য ইসলামাবাদে পৌঁছে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা। তবে রাজধানীতে বিক্ষোভকারীদের প্রবেশ ঠেকাতে সরকার নিরাপত্তা জোরদার করেছে। ডন ও রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, লংমার্চকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় সরকার ও পিটিআইয়ের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে জরুরি অবস্থা ও গভর্নর শাসন জারির সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করতে পারে।

সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় প্রাদেশিক সরকারের ভূমিকা নিয়ে বিরোধ
কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য, খাইবার পাখতুনখাওয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় প্রাদেশিক সরকারের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের কার্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই থেকে প্রাদেশিক সরকারের ইচ্ছাকৃতভাবে দূরে থাকার বিষয়টি মন্ত্রিসভা বিবেচনায় নিয়েছে।

মন্ত্রিসভার বৈঠকে শেহবাজ শরিফ বলেন, পিটিআইকে দেশের অর্থনীতি অস্থিতিশীল করতে দেওয়া হবে না। তাঁর ভাষ্য, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার যে প্রচেষ্টা চলছে, তা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে ব্যাহত হতে দেওয়া যায় না।

পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এই প্রদেশে দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গি তৎপরতা ও নিরাপত্তা সংকট রয়েছে। আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। কেন্দ্রীয় সরকার এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রাদেশিক প্রশাসনের আরও সক্রিয় ভূমিকা দাবি করে আসছে। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে কেন্দ্র ও পিটিআই সরকারের মতবিরোধের পাশাপাশি ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে আন্দোলনও বর্তমান সংকটের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট।

কী আছে পাকিস্তানের সংবিধানে
পাকিস্তানের সংবিধানের ২৩২ ধারায় যুদ্ধ, বহিঃআক্রমণ অথবা প্রাদেশিক সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণে জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিধান রয়েছে। এ ধারার প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রাদেশিক পরিষদের প্রস্তাব-সংক্রান্ত শর্ত রয়েছে। প্রেসিডেন্ট নিজ উদ্যোগে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলে তা অনুমোদনের জন্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে উপস্থাপনের বিধানও সংবিধানে রয়েছে।

২৩৩ ধারায় জরুরি অবস্থার সময় নির্দিষ্ট কিছু মৌলিক অধিকার প্রয়োগ স্থগিত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ২৩৪ ধারায় প্রদেশে সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থা পরিচালনা অসম্ভব হয়ে পড়লে গভর্নর শাসন জারির বিধান রয়েছে। এ ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্ট গভর্নরের মাধ্যমে প্রাদেশিক সরকারের নির্দিষ্ট ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন এবং সংবিধান অনুযায়ী প্রাদেশিক প্রশাসনের কার্যক্রমে কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

ডনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জরুরি অবস্থা ও গভর্নর শাসন জারির সিদ্ধান্তের মাধ্যমে খাইবার পাখতুনখাওয়ার প্রশাসনে কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপের পরিধি বাড়বে। তবে জরুরি অবস্থা জারি এবং নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকারকে সাংবিধানিকভাবে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করার বিষয়টি এক নয়; এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক বিধান ও পরবর্তী সরকারি পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ।

পিটিআইয়ের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
খাইবার পাখতুনখাওয়া পিটিআইয়ের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ঘাঁটি। প্রদেশটিতে দলটির সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে ইমরান খানের সমর্থকেরা জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছেন। ফলে এই প্রদেশে কেন্দ্রীয় সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত পিটিআইয়ের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এর আগে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি অবস্থা বা গভর্নর শাসন জারির সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল। পিটিআই নেতারা এ ধরনের পদক্ষেপের বিরোধিতা করে আসছিলেন। তাঁদের বক্তব্য, রাজনৈতিক সংকটের সমাধান বলপ্রয়োগ বা প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে নয়, বরং রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে হওয়া উচিত। মুখ্যমন্ত্রী সোহাইল আফ্রিদিও গভর্নর শাসন বা জরুরি অবস্থা জারির যেকোনো পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন।

এখন জরুরি অবস্থা ও গভর্নর শাসন কার্যকর হওয়ার পর পিটিআই কীভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাবে, তা পাকিস্তানের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে লংমার্চ ইসলামাবাদে পৌঁছাতে পারে কি না এবং কেন্দ্রীয় সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে আলোচনার নতুন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় কি না, সেদিকেও নজর থাকবে।

পাকিস্তানের চলমান এই সংকট শুধু কেন্দ্র ও প্রদেশের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিরোধী দলের রাজনৈতিক অধিকার এবং কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মুক্তির প্রশ্ন। ফলে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারির পরবর্তী পরিস্থিতি দেশটির গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সূত্র : ডন, রয়টার্স

ঠিকানা/এসআর

সূত্র: ডন, রয়টার্স

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz