পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে কেন নতুন করে পুরান ঢেঁকুর?
মোস্তফা কামাল
প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৮
•
অনলাইন সংস্করণ
বয়ান-ক্ষোভ-সমালোচনা বহু পুরনো। গত ক’দিন আবার নতুন করে চর্চা-প্যাঁচাল। সব ক্যান রহমানদের ফ্যামিলিতে? শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন। এই রহমান সাহেবের মেয়ে শেখ হাসিনাও দিয়েছেন। জিয়াউর রহমান জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছেন। তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছেন। তাদের সন্তান তারেক রহমানও দিয়েছেন। সব তারা তারাই। তা কেন? পাল্টা প্রশ্ন, তারা ছাড়া কি অন্য কোনো রহমান ঘরের কেউ রাষ্ট্র প্রধান বা সরকার প্রধান আছেন? বা হওয়ার নমুনা আছে?
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের পর ক্ষমতায় এলো মুজিব পরিবার। পঁচাত্তরে পতন। কিছুদিন পর ক্ষমতায় এলেন জিয়া। একাশিতে মৃত্যু। বিরাশিতে সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতায় এরশাদ। নব্বইর ছাত্র গণঅভ্যুত্থানে তার পতনের পর নির্বাচনের মাধ্যমেই ক্ষমতায় আসে জিয়া পরিবার। ছিয়ানব্বইতে ২১ বছর পর ক্ষমতার দৃশ্যপটে মুজিব পরিবার। ২০০১-এ জিয়া পরিবার। ২০০৮-এ মুজিব পরিবার। ২০২৬ সালে আবার জিয়া পরিবার। মানে এই ৩ পরিবারের হাতেই ৫৫ বছর। এরশাদ পরিবারের এককভাবে ক্ষমতায় আসার সুযোগ আর নেই। কিন্তু ভারতের নির্দেশনা মোতাবেক আওয়ামী লীগের সাথে জোট করে ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট কম খেয়েছে এরশাদ পরিবার?
হাল বুঝে তাই এ দুই পরিবারের চাকর হয়ে থাকার বাস্তবতাকে আলিঙ্গন করে তাদের টিকে থাকা, এগিয়ে যাওয়া। এটি বাংলাদেশের দুটি রহমান পরিবারের গৌরবের বিষয়। পরিবারতন্ত্রের জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক প্রমাণও। প্রকারান্তরে যা জন্মই একমাত্র পুণ্যের মতো। এ ছিলছিলা শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতেও। শেখ হাসিনা হাল না ধরলে আওয়ামী লীগ টুকরো টুকরো হয়ে বিলীন হয়ে যেতো সেই কবে। একই অবস্থা হতো বিএনপির খালেদা নেতৃত্বে না এলে। এখন তারেক। ভারতের নেহরু পরিবারের কথাই বা বাদ যাবে কেন?
আমাদের এ উপমহাদেশে গণতন্ত্রের চর্চা পরিবার তন্ত্রের আড়ালে সেই ১৯৪৭ সালের পর থেকেই। ভারতে রাজীব গান্ধীর পরে কংগ্রেস দুজন প্রধানমন্ত্রী দিয়েছে। পি ভি নরসীমা রাও এবং ড. মনমোহন সিং। আর নেহেরুর মৃত্যুর পরে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন লাল বাহাদুর শাস্ত্রী। এ ছাড়া সাময়িকভাবে দুবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলেছেন গুলজারিলাল নন্দ। নেহেরু পরিবার থেকে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন নেহেরু ছাড়া ইন্দিরা গান্ধী এবং রাজীব গান্ধী। রাজনৈতিক কারণে পরিবারের বাইরে অনেক সিনিয়র নেতা কারাদণ্ডিত হয়েছেন। অপমানিত-নির্যাতিত হয়েছেন। কিন্তু দিনশেষে তারা রাষ্ট্র কিংবা দলের প্রধান হতে পারেননি। তা জুটেছে দলীয় প্রধানের স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, ভাই-বোনদের। তাদের রাজনৈতিক ত্যাগ-প্রজ্ঞা দলের অনেক নেতার চেয়ে বেশি না কম, সেটি ঘটনা নয়। আর এ অবস্থা কি কেবল কেন্দ্রেই? জেলা-উপজেলাসহ তৃণমূলেও কম?
উত্তরাধিকাররের এ রাজনৈতিক বলয় ভাঙার সম্ভাবনা নেই— তা বুঝবানেরা ভালো মতো জানেন। তাদের এগিয়ে চলা সেই দৃষ্টেই। এছাড়া রহমান পরিবারতন্ত্রের বাইরে মন্ত্রী, এমপি, মেয়র, জেলা, উপজেলা, পৌরসভা, ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বাররা কি কম যান? এর বাইরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান-কর্পোরেশনে যাদেরকে হোমড়া-চোমড়া বানানো হয়, তারাও হেডম কম দেখান? দেশের বারোটা কম বাজান? ফিসফাস থাকলেও এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ-আন্দোলনের মুরদ ক’জন দেখাতে পারেন? কোন দেশের জনগণ নির্দিষ্ট পরিবার থেকে তাদের নেতা বা নেতৃত্ব মেনে নিলে কার কী? আমাদের দেশের বামরা পরিবারতন্ত্রের বাইরে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করে জনগণের কত শতাংশের সমর্থন আদায় করতে পেরেছে? কিংবা কত শতাংশ ভোট পেয়ে জামানত রক্ষা করতে পেরেছেন? তাই এ দুই পরিবারের চাকর হয়ে থাকার বাস্তবতাকে আলিঙ্গন করে তাদের টিকে থাকা, এগিয়ে যাওয়া।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট, ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন, ঢাকা।