বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা হতে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। যেসব দেশের মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় (জিএনআই) একটি নির্দিষ্ট মাঝারি সীমার মধ্যে থাকে, সেগুলোকে মধ্যম আয়ের দেশ বলা হয়। বিশ্বব্যাংক দেশের নাগরিকদের গড় বার্ষিক আয়ের ওপর ভিত্তি করে এই শ্রেণি নির্ধারণ করে থাকে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, মধ্যম আয়ের দেশকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয় :
নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ : যেসব দেশের মাথাপিছু বার্ষিক আয় ১,১৭৬ ডলার থেকে ৪,৬৩৫ ডলারের মধ্যে হয়ে থাকে।
উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ : যেসব দেশের মাথাপিছু বার্ষিক আয় ৪,৬৩৬ ডলার থেকে ১৪,৩৭৫ ডলারের মধ্যে হয়ে থাকে।
(উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাংক প্রতিবছর জুলাই মাসে এই আয়ের সীমাগুলো হালনাগাদ বা আপডেট করে থাকে)।
এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ বলতে বোঝায়, একটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকের এমন এক ইতিবাচক পরিবর্তন, যার ফলে দেশটিকে আর আন্তর্জাতিকভাবে স্বল্পোন্নত বা গরিব দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না এবং দেশটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে।
জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিল UN ECOSOC-এর অন্তর্ভুক্ত কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (CDP) প্রতি তিন বছর পরপর স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সামগ্রিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে। একটি দেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য তিনটি সুনির্দিষ্ট সূচকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হয় :
এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের তিনটি মূল সূচক হলো :
১. একটি দেশের মানুষের গড় বার্ষিক আয় জাতিসংঘের নির্ধারিত একটি নির্দিষ্ট সীমার ওপরে থাকতে হবে।
২. মাথাপিছু জাতীয় আয়ের চক কষে ও দেশের মানুষের পুষ্টি, স্বাস্থ্য, শিশুমৃত্যুর হার, স্কুলে ভর্তির হার এবং প্রাপ্তবয়স্কদের সাক্ষরতার হারের সন্তোষজনক উন্নতি হতে হবে।
৩. অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচক নির্ণয় করে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি, জনসংখ্যার আকার, ভৌগোলিক দূরত্ব এবং বিশ্ববাজারে রপ্তানি পণ্যের ধাক্কা সামলানোর মতো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকতে হবে।
যদি কোনো দেশ পরপর দুটি মূল্যায়নে এই তিনটি সূচকের মধ্যে অন্তত দুটিতে অথবা শুধু মাথাপিছু আয়ের সূচকে দ্বিগুণ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হয়, তবে জাতিসংঘ সেই দেশকে এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে যাওয়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়।
বাংলাদেশ ২০১৮ এবং ২০২১ সালের মূল্যায়নে অত্যন্ত সফলভাবে তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়েছিল। এর ফলে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। ২০২৬ সালের নভেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বা চূড়ান্ত রূপান্তর সম্পন্ন হওয়ার কথা।
গ্র্যাজুয়েশনের পর কী কী পরিবর্তন ঘটতে পারে? এটি একদিকে যেমন একটি দেশের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে বিশাল বড় মর্যাদার বিষয়, অন্যদিকে এর কিছু বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জও রয়েছে। যেমন এলডিসি হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে যে বিনা শুল্কে পণ্য রপ্তানির সুবিধা বা Duty-Free Quota-Free - DFQF - GSP বা এঝচ সুবিধা পাওয়া যেত, তা বাতিল হয়ে যায়। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংক, এডিবি বা বিভিন্ন উন্নত দেশ থেকে আগের মতো খুব কম সুদে বা সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া বন্ধ হয়ে যায় এবং ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি পায়।
অপরদিকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে কিছু সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়। যেমন বিশ্ব দরবারে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়, আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং বাড়ে এবং দেশে বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) আসার সম্ভাবনা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) তালিকা থেকে উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত সুবিধা ধরে রাখা এবং কঠিন শর্তের ঋণের ফাঁদ এড়ানো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
এই উত্তরণকালীন ধাক্কা সামলাতে বাংলাদেশকে একই সঙ্গে আক্রমণাত্মক অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং কঠোর অভ্যন্তরীণ আর্থিক সংস্কার নীতি গ্রহণ করতে হবে।
দক্ষ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশলগুলো নিচে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করে দেওয়া হলো :
প্রথমত, বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখার কূটনৈতিক কৌশল
জিএসপি প্লাস (GSP+) নিশ্চিতকরণ করতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের একক বৃহত্তম রপ্তানি বাজার। উত্তরণের পর ইইউ-এর GSP+ সুবিধা পেতে হলে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার, যেমন ইপিজেডে ট্রেড ইউনিয়ন, মানবাধিকার এবং পরিবেশ-সংক্রান্ত ২৭ থেকে ৩২টি আন্তর্জাতিক কনভেনশন বা শর্ত কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি FTA/CEPA করতে হবে। একতরফা বাণিজ্য সুবিধার দিন শেষ হয়ে আসছে। বাংলাদেশকে ভারতের সঙ্গে CEPA, জাপানের সঙ্গে EPA এবং চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি FTA স্বাক্ষর করতে হবে। ভিয়েতনাম ইতিমধ্যেই ইইউয়ের সঙ্গে এফটিএ করে বড় সুবিধা পাচ্ছে।
উত্তরণকালীন সময়সীমা বাড়ানোর লবিং সচল করতে হবে। ২০২৬ সালের মূল সময়সীমার পর বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO) এবং বিভিন্ন প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের কাছ থেকে অন্তত আরও তিন বছরের একটি রূপান্তরকালীন সময় (Transition Period) বা গ্রেস পিরিয়ড আদায়ের জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার রাখা অপরিহার্য।
ঋণের ফাঁদ এড়ানোর অর্থনৈতিক কৌশল গ্রহণ করতে হবে। সহজ শর্তের বহুজাতিক ঋণকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করতে হবে। শুধু চীন বা অন্য কোনো দেশের একক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক ঋণ, যার সুদের হার বেশি এবং শর্ত কঠিন যুক্ত, তা বর্জন করতে হবে।
এ সকল বেশি বা কঠিন শর্তের পরিবর্তে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা ADB এবং এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক বা AIIB-এর মতো বহুজাতিক সংস্থার সহজ শর্তের রেয়াতি ঋণ বা Concessional Loans নেওয়ার কৌশল বজায় রাখতে হবে।
রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ বা Export Diversification আনতে হবে। শুধু তৈরি পোশাকের (RMG) ওপর ৮৫% নির্ভরশীলতা দেশের অর্থনীতিকে যেকোনো সময় ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। সরকারি নীতিমালার মাধ্যমে ওষুধশিল্প, আইসিটি/সফটওয়্যার, চামড়াজাত পণ্য, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং কৃষিজাত পণ্য রপ্তানিতে নগদ প্রণোদনা ও কর ছাড় দিয়ে এগুলোকে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতাপূর্ণ করতে হবে।
অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি ও ব্যাংকিং সংস্কার করে কর-জিডিপি অনুপাত বা Tax-to-GDP ratio বর্তমানের অত্যন্ত কম ৬.৬%—৭.৮% অবস্থা থেকে বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ (NPL) কমিয়ে আর্থিক খাতে সুশাসন আনতে হবে (এনপিএল হলো Non-Performing Loan বা খেলাপি ঋণ, যা এমন একটি ঋণ যেখানে গ্রহীতা দীর্ঘ সময় ধরে—সাধারণত ৯০ দিন বা তার বেশি—কোনো কিস্তি বা সুদ পরিশোধ করছেন না); যাতে করে মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য বিদেশি ঋণের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে না হয়। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) ও FDI এর প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি করতে হবে। নতুন অবকাঠামো বা পোর্ট তৈরিতে শতভাগ ঋণ না নিয়ে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপি মডেলে কাজ করতে হবে। এতে বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) আসবে, প্রযুক্তি হস্তান্তর হবে এবং দেশের ওপর ঋণের বোঝা চাপবে না।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ২০২৬—২০২৭ অর্থবছরের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখনো নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ (Lower-Middle-Income Country) হিসেবে বজায় রয়েছে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ প্রথম নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়। তবে জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী ২০২৬ সালের নভেম্বর মাসের মধ্যে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) তালিকা থেকে চূড়ান্তভাবে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশ (Developing Country) হিসেবে পরিগণিত হতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি (Economic Overview) অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু জাতীয় আয় (GNI Per Capita) প্রায় ২,৮২৪ মার্কিন ডলার।
বিশ্বব্যাংক ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচক অনুযায়ী সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিছুটা ধীরগতির হয়ে ৩.৫% থেকে ৪.১% এর মধ্যে ওঠানামা করছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো তৈরি পোশাকশিল্প, যা মোট রপ্তানি আয়ের ৮০%-এর বেশি জোগান দেয়। এ ছাড়া প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে। পরিশেষে বলা যায়, অনেক আলোচনা-সমালোচনা এবং পক্ষে-বিপক্ষে মতামত থাকার পরও বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পথে অগ্রসর হচ্ছে। এতে আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম হোক—এটাই সবার প্রত্যাশা।
লেখক : কবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, নিউইয়র্ক।