প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৯
•
অনলাইন সংস্করণ
দেশ গড়ার কাজ শুধু সরকার, রাজনৈতিক দল বা সুশীল সমাজ কারও একার নয় বরং সরকারের পাশাপাশি দেশে বা বিদেশে অবস্থানরত দেশের সকল নাগরিকের ওপর এ দায়িত্ব অর্পিত। তবে মূল দায়িত্ব বর্তায় সরকারের ওপর। কারণ নাগরিকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে তাদের পক্ষে দেশ পরিচালনার মূল দায়িত্ব ও কর্তব্য সরকারের। সরকারের বাইরে দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সরকারের সঠিক কাজে সহযোগিতা ও উৎসাহ প্রদান এবং দেশের ও জনগণের স্বার্থ পরিপন্থী কাজের সমালোচনার মাধ্যমে ভুল ধরিয়ে দেওয়া এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য করা। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সরকার ও জনগণের সম্পর্ক এমনই হতে হয়। তবে এ জন্য দেশে প্রকৃত গণতান্ত্রিক চর্চার বিকল্প নেই। ডিজিটাল যুগের পূর্বে একটা সময় ছিল প্রকৃত খবরাখবর বা প্রয়োজনীয় তথ্য জানার জন্য তেমন কোনো প্রচারমাধ্যম ছিল না। যা ছিল তাও সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকার ফলে সরকারের চাওয়ার বাইরে প্রকৃত তথ্য পাওয়া ছিল দুষ্কর। কিন্তু এখন মূলধারার প্রচারমাধ্যমের বাইরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হয়ে উঠেছে শক্তিশালী প্রচার নেটওয়ার্ক। যার মাধ্যমে শুধু তথ্য জানাই নয় বরং সাথে সাথে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও প্রশংসা সবকিছুর সুযোগ রয়েছে। ফলে যে কারও পক্ষে অগ্রহণযোগ্য কথা, কাজ বা অন্যায় আচরণ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়লেও তা যে একেবারে থেমে গেছে, তা নয়। তবে প্রতিবাদ ও প্রতিকার বহুলাংশে সহজ হয়েছে, তাই কিছুটা হলেও কমেছে।
ইংরেজি Diplomacy-ই বাংলায় কূটনীতি, যা বিষয় হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি শাখা। সাধারণ অর্থে কূটনীতি হচ্ছে কোনো রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পরিচালিত সরকারি কার্যক্রম। মূলত কূটনীতি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পারস্পরিক সম্পর্ক, সমঝোতা ও স্বার্থ রক্ষার কৌশলপূর্ণ মাধ্যম। এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এমন একটি চালিকাশক্তি, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলো যুদ্ধ বা সংঘাত এড়িয়ে আলোচনা ও চুক্তির মাধ্যমে নিজেদের লক্ষ্য অর্জন করে। ১৯৬১ সালের কূটনৈতিক সম্পর্কের ভিয়েনা কনভেনশন বর্তমান আধুনিক কূটনীতির আন্তর্জাতিক নিয়ম, পদ্ধতি ও আচরণের প্রধান কাঠামো হিসেবে কাজ করে। কূটনৈতিক বোঝাপড়ায় যে রাষ্ট্র যত দক্ষ, পারস্পরিক বোঝাপড়ায় অন্য রাষ্ট্রের কাছ থেকে সে রাষ্ট্র তত সুযোগ-সুবিধা লাভে সক্ষম। এ জন্য প্রয়োজন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসসমূহে দক্ষ ও পেশাদার কূটনীতিক, যারা নিজ স্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দেন। এ ছাড়া প্রবাসী যারা কর্মসংস্থানের তাগিদে ও অভিবাসী মর্যাদাপ্রাপ্ত হয়ে স্থায়ীভাবে বিভিন্ন দেশে বসবাস করছেন, তারাও মূলত দেশের জন্য ব্র্যান্ড অ্যামবাসাডর হিসেবে কাজ করে থাকেন। তাদের নীতি-নৈতিকতা, আচার-আচরণ বসবাসকারী দেশের নিকট নিজ নিজ দেশের কৃষ্টি-কালচার প্রভাবকের ভূমিকা পালন করতে পারে। এ জন্য দূতাবাস ও কনস্যুলেটসমূহ প্রবাসীদের সাথে নিবিড় যোগাযোগ ও প্রয়োজনে নির্দিষ্ট সময়ান্তে সভা-সেমিনারের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। বিষয়টি দেখভালের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও সৃষ্ট বাধাসমূহ দ্রুততার সাথে সমাধানের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অনেক সময় শোনা যায় স্বজনপ্রীতির কারণে দক্ষদের পরিবর্তে নিজ আত্মীয় ও দলীয় লোকদের এসব প্রতিষ্ঠানে পদায়নে প্রাধান্য দেওয়া হয়ে থাকে, যা রাষ্ট্রীয় স্বার্থের পরিপন্থী। এ রকম কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে আশু তার সমাধান প্রয়োজন।
সত্তরের দশক থেকেই দেশের বাইরে কর্মসংস্থানের জন্য যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হলেও আশির দশক থেকে ব্যাপকভাবে তা বৃদ্ধি পায়। এর ফলে বর্তমানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংখ্যা এক কোটিরও বেশি বলে ধারণা করা হয়, যার প্রকৃত সংখ্যা অজ্ঞাত। যার মধ্যে সংখ্যায় মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা ও মালয়েশিয়া প্রধান। বাংলাদেশি আমেরিকানরা আধুনিক বাংলাদেশি আমেরিকান এবং ভারতীয় আমেরিকানদের বৃহত্তর গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। ২০২০ সালের জনসংখ্যাতাত্ত্বিক আদমশুমারি অনুসারে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৪,৫৩,১৯১ জন মানুষ বাংলাকে তাদের প্রধান ভাষা হিসেবে বা অন্যান্য ভাষার পাশাপাশি ব্যবহার করেন। এটি জনসংখ্যার প্রায় ০.১৪%। এ ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৬ লাখেরও বেশি অনাবাসী বাংলাদেশি বসবাস করেন। নিউইয়র্ক শহর দীর্ঘদিন ধরে বাঙালি বসতির প্রধান কেন্দ্র। আমেরিকান অভিবাসী বাংলাদেশি অন্য দেশে বসবাসকারীদের তুলনায় শিক্ষা সচেতনতায় অগ্রসর। নেটিজেনদের তুলনায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও মানসম্পন্ন কর্মসংস্থানে তারা কোনো অংশে পিছিয়ে নেই। এখানে ইংরেজি সংবাদপত্রের পাশাপাশি প্রচুর বাংলা সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রাধান্য লক্ষ করা যায়। যার প্রভাবে আমেরিকার মূলধারায় প্রবেশ অনেকটা সহজ হয়েছে। অভিবাসী অন্যান্য কমিউনিটির তুলনায় বাংলাভাষী কমিউনিটি সর্ববিষয়ে অগ্রগামী। বিভিন্ন স্টেটে আইনপ্রণেতা ও বিচারকের আসন লাভ যার অন্যতম ইতিবাচক দিক।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ অদ্যাবধি সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়নি। যার অন্যতম কারণ হিসেবে রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা, দেশের থেকে দল এবং দলের চেয়ে ব্যক্তি বড় এই নীতির কারণে দেশ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে আজও পৌঁছাতে পারেনি বলে অনেকের ধারণা। অবশ্য এর ব্যতিক্রমও আছে। তবে যারাই দেশের জন্য নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজের চেষ্টা করেছে, দেশি-বিদেশি অনেক স্বার্থান্বেষী মহল তাদের পথ বন্ধুর করে তুলেছে। দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বাক্্স্বাধীনতা দেশে-বিদেশে প্রশ্নবিদ্ধ হলেও তখনকার ক্ষমতাসীন দল সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে দলীয় ও ব্যক্তিস্বার্থের প্রতিই বেশি নজর দিয়েছে। দেশে বারবার গণতন্ত্র সুসংহত করার সুযোগ তৈরি হলেও হীন স্বার্থে তা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমান সরকার যেহেতু একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে আইন প্রণয়নের সুযোগ পেয়েছে, তাই দেশি-প্রবাসী সবাই বিগত দিনের ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে বলে আশা পোষণ করে।
ইন্টেরিম সরকারের অনেক ইতিবাচক সিদ্ধান্ত, যা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি, অতি দ্রুত তা বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। কারণ এটি তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার, যা পালন করা অপরিহার্য। এ ব্যাপারে নির্বিকার থাকলে দেশ, জনগণ ও সরকার কারও জন্যই তা মঙ্গলজনক হবে না। অতীত থেকে শিক্ষা না নেওয়া ইতিহাসের একটি অন্যতম পাঠ এবং সে জন্য খেসারত দিতে কারও কম হয়নি। তাই সময় এসেছে এর পুনরাবৃত্তি যাতে না হয় সেদিকে লক্ষ রাখা। উন্নত দেশসমূহে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি রোধে সেবা ও লেনদেন অনলাইনে করার কারণে সেখানে দুর্নীতি নেই বললেই চলে। তবে সে জন্য সার্বক্ষণিক ইন্টারনেট সার্ভিস সচল থাকা দরকার আর তা নিশ্চিত করতে দরকার সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ। এই দুটো সার্ভিস ঠিক করা গেলেই দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরায় বহুলাংশে সফলতা আসবে। তবে সে জন্য প্রয়োজন সর্বোচ্চ আন্তরিকতার এবং সেটা চায় কি না তা কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করা। যা দেশি-প্রবাসী সবার জন্যই স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে।
দেশ গঠনে দেশে বসবাসকারীদের চেয়ে প্রবাসীদের ভূমিকা ও অবদান কোনো অংশে কম নয়। কোভিডের সময় দেশের অর্থনীতি যখন হুমকির সম্মুখীন, প্রবাসীদের রেমিট্যান্স তখন দেশকে সে সংকট থেকে সফলভাবে ঘুরে দাঁড়াতে অবদান রেখেছে। আবার ফ্যাসিবাদ-বিরোধী আন্দোলনের সময় রেমিট্যান্স-প্রবাহ বন্ধ রেখে আন্দোলন ত্বরান্বিত করেছে। যা প্রমাণ করে, প্রবাসীদের সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ অত্যন্ত যুক্তিসংগত ছিল। সরকারের পাশাপাশি প্রবাসীরা বিভিন্ন পর্ব-পার্বণে তাদের গরিব ও দুস্থ আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীদের সাহায্য-সহযোগিতা করে থাকেন। এর বাইরেও প্রবাসীদের দেশের প্রতি ইতিবাচক ভাবনা ও কর্তব্যবোধ প্রতিনিয়ত দেশের অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করছে। তা সত্ত্বেও প্রবাসীদের কিছু বাস্তব চাহিদা ও দাবিদাওয়া মেটানো অসম্পূর্ণ রয়েছে। প্রবাসীদের দেশে থাকা সম্পদ প্রায়ই বেহাত হওয়া এবং তা উদ্ধারে যথাযথ সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের, যা নিরসন হওয়া খুবই দরকার। প্রবাসীদের ভোটে অংশগ্রহণের সুযোগপ্রাপ্তির দাবি ছিল দীর্ঘ দিনের। ইন্টেরিম সরকার সে দাবি পূরণ করলেও প্রবাসী ভোটারদের জাতীয় সংসদে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতের দাবিও ছিল অন্যতম কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। অবশ্য এ জন্য নীতিগত সিদ্ধান্ত ও আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধনী আবশ্যক, যা বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে প্রবাসীরা বিশ্বাস করেন।
দেশ থেকে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো একটি জটিল সমস্যা, যা সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা খুবই জরুরি। জাতিসংঘ সম্মেলনের সাইডলাইনে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। সরকারপ্রধানের জাতিসংঘ সম্মেলনে যোগদানের সময় প্রবাসীদের সাথে তাদের দাবিদাওয়া ও সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।
সব মিলিয়ে সরকারপ্রধানের আসন্ন জাতিসংঘ সম্মেলন ও সাইডলাইনে সংশ্লিষ্টদের সাথে জাতীয় সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ ফলপ্রসূ হওয়ার বিষয়ে দেশের প্রতি অঙ্গীকারের ফলস্বরূপ প্রবাসীদের সাফল্য কামনা ও সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, গীতিকার, কলামিস্ট ও গবেষক।