বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ :
• প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী মার্কিন প্রতিষ্ঠান • ১২ অক্টোবর জানা যাবে ইউপি ভোটের তফসিল ও ধাপ : ইসি সানাউল্লাহ • সাহিত্যে নোবেল পেলেন কানাডীয় লেখিকা অ্যান কার্সন • সাহিত্যে নোবেল পেলেন কানাডার অ্যান কারসন • বিশ্বের চোখে বাংলাদেশের  মর্যাদা ব্যাপক ক্ষুণ্ন করছে শাহজালাল বিমানবন্দর! • শিশির মনিরকে জামায়াত থেকে বহিষ্কার চাইলেন রাশেদ খাঁন • জঙ্গল সলিমপুরে হবে পুলিশ একাডেমি : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী • নিউইয়র্কে নিখোঁজের পাঁচ দিন পর বাংলাদেশি খোকনের মরদেহ উদ্ধার • চট্টগ্রামের এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি সই • বাংলাদেশে স্টারলিংকের মোবাইল সেবা চালু

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

​বাঙালি ও বাঙালির ভাষা (চার)

​বাঙালি ও বাঙালির ভাষা (চার)

বিজ্ঞাপন
(পূর্ব প্রকাশের পর)
১৯৪৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় ছাত্র এবং অধ্যাপকের উদ্যোগে তমদ্দুন মজলিস নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন গঠিত হয়। ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে এই প্রতিষ্ঠানটি বাংলা ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম ও আইন-আদালতের ভাষা করার পক্ষে প্রচার-প্রচারণা চালায়। ওই বছরই ১৫ সেপ্টেম্বর ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু?’ নামে তারা একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে। সেই পুস্তিকায় বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার বাহন, আদালতের ভাষা, অফিসের ভাষা ও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ভাষা করার দাবি উপস্থাপন করে। পুস্তিকাটিতে রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে বলা হয়, ‘লাহোর প্রস্তাবেও পাকিস্তানের প্রত্যেক ইউনিটকে সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার অধিকার দেওয়া হয়েছে। কাজেই প্রত্যেক ইউনিটকে তাদের স্ব-স্ব প্রাদেশিক রাষ্ট্রভাষা কী হবে তা নির্ধারণ করবার স্বাধীনতা দিতে হবে।’ উল্লিখিত প্রস্তাবটি ছিল তমদ্দুন মজলিসের প্রধান কর্মকর্তা অধ্যাপক আবুল কাসেম কর্তৃক প্রণীত। এ ছাড়া পুস্তিকাটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন এবং তৎকালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেহাদ-এর সম্পাদক আবুল মনসুর আহমদের ভাষা সম্পর্কিত প্রবন্ধও ছাপা হয়েছিল।

১৯৪৭ সালের ৫ ডিসেম্বর ঢাকায় বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির অর্থাৎ বিভাগ-পূর্ব আমলের অখণ্ড বাংলার প্রাদেশিক মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সর্বশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকে ওয়ার্কিং কমিটি এই মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, উর্দুকে পূর্ব বাংলার সরকারি ভাষা করা হবে না। এ বিষয়ে কমিটির সভাপতি মওলানা আকরাম খাঁকে সংবাদপত্রে একটি ঘোষণা প্রকাশ করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়। মুসলিম লীগের এই বৈঠক প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের সরকারি বাসভবন বর্ধমান হাউসে অনুষ্ঠিত হওয়ার সময় বহু সংখ্যক ছাত্র ও কয়েকজন শিক্ষক সেখানে উপস্থিত হয়ে বাংলাকে অবিলম্বে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। মওলানা আকরাম খাঁ তাঁদেরকে আশ্বাস দেন, তাঁদের দাবি সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।

ইতিপূর্বে করাচিতে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে একটি শিক্ষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং তাতে অংশগ্রহণ করে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রী হবিবুল্লাহ বাহার এবং আবদুল হামিদ ঢাকায় প্রত্যাবর্তনের পর ৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার জন্য সর্বসম্মতিক্রমে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে।’ এই বিবৃতি ৬ ডিসেম্বরের মর্নিং নিউজে প্রকাশিত হওয়ার আগের দিন অর্থাৎ ৫ ডিসেম্বর এপিআই পরিবেশিত ও মর্নিং নিউজে প্রকাশিত অপর একটি প্রস্তাব করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। সেই খবরে বলা হয়, শিক্ষা সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে উর্দুকে পাকিস্তানের ‘লিংগুয়া ফ্রাঙ্কা’ সিদ্ধান্তের ভার পাকিস্তান গণপরিষদের ওপর অর্পিত হয়েছে।

শিক্ষা সম্মেলনের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ৬ ডিসেম্বর দুপুর দুইটার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে যে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়, সেটি ছিল রাষ্ট্রভাষার দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সর্বপ্রথম সাধারণ ছাত্র-সমাবেশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ, জগন্নাথ ইন্টারমিডিয়েট কলেজ এবং অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা এই সমাবেশে যোগদান করে। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও তমদ্দুন মজলিসের সম্পাদক আবুল কাসেম। সমাবেশে বক্তৃতা দেন মুনীর চৌধুরী, আবদুর রহমান, কল্যাণ দাশগুপ্ত, একেএম আহসান, এস আহমদ প্রমুখ। সমাবেশটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট ফরিদ আহমদ নিম্নোক্ত প্রস্তাবসমূহ পেশ করলে সেগুলো সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয় :
১. বাংলাকে পাকিস্তান ডোমিনিয়নের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা এবং পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম করা হোক।
২. রাষ্ট্রভাষা এবং লিংগুয়া ফ্রাঙ্কা নিয়ে যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে তার মূল উদ্দেশ্য আসল সমস্যাকে ধামাচাপা দেওয়া এবং বাংলা ভাষা ও পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা।
৩. পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রী ফজলুর রহমান (সালমান এফ রহমানের পিতা) এবং প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রী হবিবুল্লাহ বাহার উর্দু ভাষার দাবিকে সমর্থন করার জন্য সভা তাঁদের আচরণের তীব্র নিন্দা করে।
৪. সভা ‘মর্নিং নিউজ’-এর বাঙালিবিরোধী প্রচার-প্রচারণার প্রতি নিন্দা জ্ঞাপনসহ জনসাধারণের ইচ্ছার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের জন্য পত্রিকাটিকে সাবধান করে দেয়।

এই ছাত্রসভাটি শেষ হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে ছাত্ররা মিছিলসহকারে বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করে সেক্রেটারিয়েট ভবনে উপস্থিত হয়। সেক্রেটারিয়েট থেকে তারা মন্ত্রী নূরুল আমিন এবং হামিদুল হক চৌধুরীর বাসায় উপস্থিত হয়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানায়। এরপর মিছিলটি প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিনের বাসভবনে উপস্থিত হয়। ইতিপূর্বে প্রাদেশিক মন্ত্রী মোহাম্মদ আফজাল এবং নূরুল আমিন বাংলা ভাষার দাবি সমর্থন করার প্রতিশ্রুতি দিলেও নাজিমুদ্দিন সে ধরনের কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে অসম্মত হন। সে সময় তিনি অসুস্থ থাকার অজুহাতে ছাত্রদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে অক্ষমতা জানান এবং সেই সঙ্গে তাঁদের কাছে পাঠানো একটি লিখিত নোটে বলেন, মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটি ও পার্লামেন্টারি পার্টির মতামত না জানা পর্যন্ত তিনি ভাষার প্রশ্নে কোনো সুনির্দিষ্ট মত প্রকাশ করতে পারবেন না। শিক্ষা সম্মেলন সম্পর্কে ঢাকা বিমানবন্দরে হবিবুল্লাহ বাহারের সাক্ষাৎকার সম্পর্কিত যে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল, তার প্রতিবাদ করে ১১ ডিসেম্বর তিনি সংবাদপত্রে এক বিবৃতিতে বলেন, তাঁর বক্তব্য বিকৃত করা হয়েছে এবং তিনি সে সময় বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত সম্মেলনে নেওয়া হয়নি।’

শিক্ষা সম্মেলনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে অন্যান্য স্থানে যে সময় বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হতে থাকে, সে সময় সিলেটের কিছু সংখ্যক নাগরিক উর্দুর সমর্থনে খাজা নাজিমুদ্দিনের কাছে একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন। স্মারকলিপিটিতে বলা হয় :
‘একদল লোক নিজেদেরকে বিরাট সাহিত্যিক, শিল্পী ও পণ্ডিত বলে জাহির করে উর্দুর বিরুদ্ধে দারুণ প্রচারণা শুরু করেছে। পূর্ব বাংলার লোকেরা একটি জাতি, এই উদ্ভট ধারণার বশবর্তী হয়ে তারা উর্দুকে জাতীয়তাবিরোধী ও বিদেশি ভাষা হিসেবে বর্জন করতে বদ্ধপরিকর হয়েছে। সীমিত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেশপ্রেমের মুখোশ পরে তারা বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার জন্য চারদিকে তোলপাড় আরম্ভ করেছে। জনমতের প্রতিনিধিত্ব করার ভাব দেখিয়ে তারা নিজেরাই বাংলার মতো এমন এক ভাষার দাবি তুলেছে, যে ভাষার একটি মুসলিম রাষ্ট্রের জাতীয় ভাষার মর্যাদা লাভের মতো যোগ্যতা একেবারেই নেই। মুসলিম সংস্কৃতির গৌরবময় ঐতিহ্যবাহী উর্দু ভাষাকে বর্জন করার এই নির্লজ্জ প্রচেষ্টা যে শুধু ধ্বংসাত্মক তাই নয়, তা পশ্চাৎমুখী, নিন্দনীয় এবং সর্বোপরি সর্বজনীন ইসলামী ভ্রাতৃত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জস্বরূপ।’

স্মারকলিপিতে তাঁরা আরও বলেন, ‘পবিত্র কোরআন এবং অন্যান্য ইসলামী সাহিত্য থেকে প্রেরণাপ্রাপ্ত উর্দু ভাষাকে অবহেলা করে আমরা যদি প্রধানত রামায়ণ, মহাভারত, উপনিষদ, বেদ এবং অন্যান্য সংস্কৃত সাহিত্য থেকে প্রেরণাপ্রাপ্ত বাংলা ভাষার দিকে যাই, তাহলে আমরা আমাদের জাতীয় সত্তাকেই অস্বীকার করব। পৃথক সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং দৃষ্টিভঙ্গি গঠিত ভারতের মুসলমানদের পৃথক জাতিত্বের ওপর ভিত্তি করেই পাকিস্তান ধারণার জন্ম। ভারতীয় মুসলমানদের জাতীয় ভাষা এবং ইসলাম ও আধুনিক বিজ্ঞানবিষয়ক সাহিত্যে সমৃদ্ধ উর্দুই পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হওয়ার জন্য সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত ভাষা।’ (চলবে) 
লেখক : জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও কলামিস্ট।

নিউজটি শেয়ার করুন


সর্বশেষ আপডেট

© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz