শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬

শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন
​মামদানি ও এল-সায়েদকে রিপাবলিকানদের নিশানা

মধ্যবর্তী নির্বাচনে মুসলিম রাজনীতিকদের ঘিরে উত্তাপ

মধ্যবর্তী নির্বাচনে মুসলিম রাজনীতিকদের ঘিরে উত্তাপ

বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক লড়াইয়ে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন মুসলিম আমেরিকান রাজনীতিকেরা। রিপাবলিকান পার্টির শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতা নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি এবং মিশিগানের ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদকে অভিবাসন, অপরাধ, সমাজতন্ত্র ও শরিয়া আইনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে তীব্র সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু করছেন। ডেমোক্র্যাট ও মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, রাজনৈতিক মতাদর্শের সমালোচনা ক্রমেই মুসলিম পরিচয়কেন্দ্রিক আক্রমণে রূপ নিচ্ছে। রিপাবলিকানদের পাল্টা বক্তব্য, তাদের আপত্তি ধর্ম নিয়ে নয়, বরং সংশ্লিষ্ট রাজনীতিকদের নীতি ও রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে।
ডালাসে রিপাবলিকানদের মধ্যবর্তী নির্বাচনকেন্দ্রিক সম্মেলনে বিতর্কটি আরও তীব্র হয়ে ওঠে। টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজ তাঁর বক্তৃতায় মামদানি, এল-সায়েদ ও টেক্সাসের ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থী জেমস তালারিকোর নাম উল্লেখ করে শরিয়া আইন ও ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বামঘেঁষা রাজনীতির সমালোচনা করেন। এ সময় দর্শকসারি থেকে ‘তাকে গুলি করা উচিত’ বলে চিৎকার শোনা যায়। ক্রুজ বক্তব্য চালিয়ে যান। তবে তিনি ওই মন্তব্য শুনেছিলেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।
ঘটনাটি বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে কারণ সম্মেলনে একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধেও বক্তব্য দেওয়া হচ্ছিল। ফলে কোনো প্রার্থী বা জনপ্রতিনিধিকে লক্ষ্য করে প্রকাশ্যে এমন মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক মেরুকরণ ও সহিংস ভাষার ব্যবহার নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
এল-সায়েদ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এটি রাজনৈতিক মতবিরোধের সাধারণ বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং সহিংসতার আহ্বান, যার দলমত নির্বিশেষে নিন্দা হওয়া উচিত।
মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস বা সিএআইআর-ও ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে। সংগঠনটির বক্তব্য, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যার আহ্বানের মতো বক্তব্যের নিন্দা না করলে তা রাজনৈতিক সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তোলার ঝুঁকি সৃষ্টি করে এবং জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
সম্মেলনে ক্রুজের বক্তব্যের অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল শরিয়া আইন। তিনি বলেন, শরিয়া আইনের যুক্তরাষ্ট্রে কোনো স্থান নেই এবং এটি মার্কিন সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটও তাঁর বক্তব্যে রাজ্যে শরিয়া আইন পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার অঙ্গীকার করেন।
এল-সায়েদ অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে শরিয়া আইনসংক্রান্ত অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর বক্তব্য, তিনি কোনো ধর্মীয় আইন রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার বিরোধী। যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যেক মানুষের নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা থাকা উচিত বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
রিপাবলিকান কৌশলবিদদের দাবি, মুসলিম পরিচয় নয়, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বামপন্থী রাজনীতিই তাদের সমালোচনার মূল লক্ষ্য। রিপাবলিকান কৌশলবিদ ব্রায়ান সাইটচিক বলেন, বিষয়টি ‘মুসলিমবিরোধী’ নয়, বরং সমাজতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দর্শনের বিরোধিতা। তাঁর মতে, মামদানি ও এল-সায়েদের মতো রাজনীতিকেরা ডেমোক্র্যাটিক পার্টির পরিবর্তিত রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতীক।
তবে এল-সায়েদ নিজেকে ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট হিসেবে পরিচয় দেন না এবং তিনি ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার সদস্যও নন।
ডেমোক্র্যাটিক কৌশলবিদদের মতে, মুসলিম রাজনীতিকদের ঘিরে রিপাবলিকানদের এই প্রচার উল্টো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে মিশিগানের মতো রাজ্যে, যেখানে মুসলিম ও আরব আমেরিকান ভোটারদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। তাদের যুক্তি, অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মতো বিষয় ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ থাকায় শুধু ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিতর্ক দিয়ে নির্বাচনী আলোচনাকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও সাম্প্রতিক সময়ে এল-সায়েদের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছেন। ডালাস সম্মেলনে তিনি এল-সায়েদের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টের সমালোচনা করেন, যেখানে ভ্যান্সের পারিবারিক ইতিহাস এবং তাঁর স্ত্রী উষা ভ্যান্সের ভারতীয় অভিবাসী পরিবারের প্রসঙ্গ এসেছিল। ভ্যান্সের অভিযোগ, এল-সায়েদের মন্তব্য তাঁর পরিবারকে অন্যায্যভাবে উপস্থাপন করেছে। এল-সায়েদের বক্তব্য ছিল, তাঁর পোস্টটি ভ্যান্সের আগের মন্তব্যের জবাব।
এ বিতর্কের মধ্যে সিনেটর ক্রুজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ‘রেড-গ্রিন অ্যালায়েন্স’ বা কমিউনিস্ট ও ইসলামপন্থীদের কথিত জোট নিয়ে সতর্ক করেছেন। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট ও মুসলিম অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এ ধরনের রাজনৈতিক ভাষা মুসলিম আমেরিকানদের একটি সামগ্রিক হুমকি হিসেবে উপস্থাপনের ঝুঁকি তৈরি করে।
মুসলিম আমেরিকানদের রাজনৈতিক উপস্থিতিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। মামদানি ও এল-সায়েদ বর্তমানে জাতীয় পর্যায়ে আলোচিত মুসলিম ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে রয়েছেন। আবার রিপাবলিকান রাজনীতিতেও মুসলিম ব্যক্তিত্ব রয়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের সেন্টারস ফর মেডিকেয়ার অ্যান্ড মেডিকেইড সার্ভিসেসের প্রশাসক মেহমেত ওজ ২০২২ সালে পেনসিলভানিয়া থেকে রিপাবলিকান সিনেট মনোনয়ন পেয়েছিলেন।
বিদ্বেষমূলক কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণকারী গবেষকদের উদ্বেগ, নির্বাচনী প্রচারে ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক বা নিরাপত্তা হুমকির সঙ্গে বারবার যুক্ত করা হলে তার প্রভাব নির্বাচনী মঞ্চের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বেগের মধ্যে ডালাসের ‘গুলি করা উচিত’ মন্তব্যটি সেই আশঙ্কাকে আরও সামনে এনেছে।
অন্যদিকে রিপাবলিকানদের অবস্থান হলো, তাদের লক্ষ্য কোনো ধর্মীয় জনগোষ্ঠী নয়; বরং যেসব নীতি ও রাজনৈতিক দর্শনকে তারা মার্কিন সাংবিধানিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর মনে করে, সেগুলোর বিরোধিতা করা।
ফলে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারে অর্থনীতি, অভিবাসন ও অপরাধের পাশাপাশি ধর্মীয় পরিচয়, শরিয়া আইন এবং রাজনৈতিক সহিংসতার ভাষাও বড় বিতর্ক হয়ে উঠছে। ডালাসের ঘটনা সেই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবং রাজনৈতিক মতবিরোধের ভাষা কত দূর পর্যন্ত যেতে পারে, সেই প্রশ্নও আবার সামনে এনেছে।

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz