প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:৫৩
•
অনলাইন সংস্করণ
২১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আমেরিকা অভিযাত্রা। ৬ দিন আগে বাংলাদেশে ঘটলো বিস্ময়কর ঘটনা। আওয়ামী লীগের পলাতক ৭ নেতাকে দেয়া হলো ফাঁসি। কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের আলোচিত সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ফাঁসির তালিকায় আরো— সাবেক এমপি আফম বাহাউদ্দিন নাসিম। সাবেক প্রতিমন্ত্রী আরাফাত। যুবলীগ সভাপতি শেখ ফজলে শামস্ পরশ। যুবলীগ সম্পাদক মাইনুল হোসেন নিখিল। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন। সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান প্রমুখ।
জুলাই আন্দোলনের অপরাধীদের মৃত্যুদন্ডের রায় দিয়েছে আইসিটি আদালত। ট্রাইবুনাল-২ থেকে রায় দেন বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী। ২০১৬-তে তিনি ছিলেন ফাঁসিপ্রাপ্ত মীর কাসেম আলীর কৌশলী। জামায়াত রাজনীতির পিলারসম নেতার ঘনিষ্ঠজন। সমালোচকেরা বলছেন জামায়াত প্রভাবিত বর্তমান ফাঁসির সময়কাল। তারেক রহমানের মার্কিন সফরে জটিলতা তৈরিই জামায়াতের উদ্দেশ্য।
রায়ের পরেই ঢাকায় ককটেল ফুটেছে, ফুটছেও। খন্ড মিছিল হয়েছে দেশের নানা স্থানে। দন্ডপ্রাপ্ত নেতারা বিদেশ থেকে প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিরোধী পক্ষ সোচ্চার। নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেনও সক্রিয়। ফেসবুকে বলছেন ‘আই ডোন্ট কেয়ার’। তিনি জোর প্রতিবাদ কর্মসূচির আহ্বান জানাচ্ছেন। ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনকে জোরালো করতে বলছেন। দলের প্রবাসী শক্তিকে বেগবান হতেও আহবান জানাচ্ছেন।
২১—৩০ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিউইয়র্কের অতিথি। বরাবর বিরোধী পক্ষ নেতিবাচক শ্লোগানে বিমানবন্দর উত্তপ্ত করে। জাতিসংঘের সামনেও জোরালো প্রতিবাদ জানায়। গতবছর প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস বিশেষ কৌশল নেন। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি প্রতিনিধিকে সঙ্গে নেন।
বিশেষ সতর্কতার মাঝেও জেএফকে-তে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। বিএনপির মির্জা ফখরুল, জামায়াতের ডা. তাহের কৌশলে নিষ্ক্রান্ত হন। কিন্তু এনসিপি সম্পাদক ডিম-থেরাপি ভোগ করেন। আক্রমণকারী যুবলীগ নেতাকে শেখ হাসিনা ফোনে ধন্যবাদ জানান।
বিএনপি চেয়েছে তারেক রহমানের আগমন ঝামেলামুক্ত হোক। এজন্যে আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ করছিলো। কারাগারে দমন পীড়ন-নির্যাতন নিয়ন্ত্রণ করেছে। গ্রেফতারকৃত নেতারা পূর্বের তুলনায় ফুরফুরে মেজাজে। দুদকের মামলা-যন্ত্রণা আওয়ামী লীগের চেয়ে এনসিপির ঘাঁড়ে বেশি।
সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া তোপের মুখে। ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের জোর অভিযোগ। ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলনের মুখ্য কারিগর তিনি। আত্মপক্ষ সমর্থন সূচক বক্তব্যে বলছেন— এসব কি? দুদক বা বিএনপি সরকার কি পেলো? আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কোন মামলা-মোকদ্দমা নেই। অথচ প্রথম মামলাটি করলো আমার বিরুদ্ধে। জুলাই যোদ্ধাদের ভালোবাসার বদলে যন্ত্রণা দিচ্ছে বিএনপি। তাদের আওয়ামী-প্রীতি অচিরে তাদেরকেই ডোবাবে।
২০২৪-এর ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। ৮ আগস্ট ২০২৪ ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার। জুলাই আন্দোলনকালেই গড়ে ওঠে আওয়ামী বিরোধী মহাঐক্য। বিপ্লবী নয়, সাংবিধানিক সরকার গঠিত হয়। ইউনূস সরকার রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে শীর্ষ সিদ্ধান্তগুলো নেয়। শুরুতে ছাত্রনেতা ও অন্যান্যের মধ্যে ঐক্যের সুর ছিলো প্রবল।
এনসিপি গঠনের পূর্বে তিন ছাত্রনেতা ছিলেন সরকারে। বিএনপি প্রভাবশালী থাকলেও সুযোগ্য দল ছিলো জামায়াত। এই মহা-ঐক্যে প্রথম ফাটল রাষ্ট্রপতি বিতর্কে। হাসিনাকালের রাষ্ট্রপতি মুক্তিযোদ্ধা সাহাবুদ্দীন চুপ্পুকে নিয়ে বিতর্ক। জামায়াত-এনসিপি ছিলো বদলের পক্ষে। তাদের পছন্দের নেতা কর্নেল (অব.) অলি, বীরবিক্রম। অন্যদিকে বিএনপি টিকিয়ে রাখে আওয়ামী লীগ পক্ষীয় সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে। বিএনপি’র বিশ্বাস— নির্বাচনে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ‘ধানের শীষে’ ভোট দিয়েছে। জামায়াতকে ঠেকাতে বিএনপি’র বিকল্প ছিলো না, নেইও।
২০২৬-এর ১২ ফেব্রুয়ারির বিজয়মাল্য বিএনপি পরেছে। কিন্তু শপথের দিন থেকেই বেঁকে গেছে ঐক্যপথ। জুলাই সনদ ও গণভোট ইস্যূতে মহা-বিভাজন। বিএনপি এমপিরা একটি শপথ নেয়। বিরোধী দল গ্রহণ করে দুটি শপথ। এরপর প্রায়শ ওয়াক আউট, সরকার বিরোধী লংমার্চ।
স্বতন্ত্র নির্বাচন করায় বিএনপি বহিষ্কার করে রুমিন ফারহানাকে। ২০১৯-এর হাসিনা-প্রধান সংসদে ছিলেন বিএনপির বাঘিনী। নারী কোটায় ৫০ নম্বর এমপি ছিলেন রুমিন। কিন্তু ২০২৬-এর নির্বাচনে বিএনপি নমিনেশন দিতে পারেনি। জমিয়তে ইসলামীর সঙ্গে আসন ভাগাভাগিতে যেতে হয়। অভিমানী রুমিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় স্বতন্ত্র নির্বাচন করে জেতে। শপথের দিনে তিনি বিএনপির ‘সিঙ্গেল ওথ’ অনুসরণ করেন। কিন্তু ৬ মাসের ব্যবধানে বিপ্লবী অগ্নিকন্যার রূপ ধারণ।
বিদ্যুৎ-গ্যাস-আইন শৃঙ্খলা, চাঁদাবাজি নিয়ে সংসদ-টকশো কাঁপাচ্ছেন। জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। আওয়ামী বিরোধী রাজনীতির ঐক্যে ছিলেন মুখর। তিনি এখন বলছেন, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন সময়ের দাবি।
জামায়াত-এনসিপিও বিএনপি বিরোধিতায় মহাসক্রিয়। ‘ভিপি নূর’, ‘আম তারেক’, রাশেদ খাঁন’রা বিএনপি ঘরানায়। অন্যদিকে জাগপাসহ ১১ দলীয় জোট সরকার পতনে ব্যস্ত। মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল অলি, মেজর (অব.) আখতার জোটের প্রধান মুখপাত্র। তারেক রহমান সরকারকে বিপদাপন্ন করতে চলছে প্রক্রিয়া।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিল এখন জাতিসংঘের চলমান অধিবেশনের সভাপতি। ‘রাজাধিরাজের মেজাজে’ নিউইয়র্ক সফরের কথা তারেক রহমানের। কিন্তু আওয়ামী লীগের ৭ নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ায় পরিস্থিতি ভিন্ন। প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ কর্মসূচিতে সংযুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা।
জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী তারেকের সফরটি নির্বিঘ্ন হবে না। ‘গো ব্যাক’ স্লোগান উঠবে, কালো পতাকাও উড়বে। আইসিটির নতুন রায়টি আরেকটু পেছানো যেতো। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাবর্তনের পর। কিন্তু রহস্যজনকভাবে মৃত্যুদন্ড ঘোষিত হলো ১৫ সেপ্টেম্বর। ২১ সেপ্টেম্বর তারেক রহমান সম্ভাষিত হবেন কালো পতাকায়। যদিও বিএনপি ও অঙ্গদল ফুলেল শুভেচ্ছা জানাবে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনগুলোর অগ্নি-বিস্ফোরণ হবে দ্বিগুণ।
সচেতন মহলের মতে আওয়ামী বিরোধী ঐক্য কোথায়? ভারতের সহযোগিতায় নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ কৌশলে খেলছে। আওয়ামী বিরোধী মহা-ঐক্যে ফাটল ধরিয়েছে। এটি ঠেকানো না গেলে বিএনপি অচিরেই কলংকিত হবে। একক শক্তিতে বিএনপি সাফল্যের বদল হতাশাও আনতে পারে।
আওয়ামী বিরোধী ঐক্যের প্রধান কৃশীলব ড. ইউনূস। হাসিনা আমলে ৬৬৬ কোটি টাকার শুল্কফাঁকির মামলা ছিলো। ক্ষমতায় থাকতে তিনি তা মওকুফ করে নেন। কিন্তু বিএনপি সরকার মামলাটি আবার হাইকোর্টে তুলেছে। তাতে সেই অর্থদন্ড আবার বহাল হয়েছে। ফলে, নোবেলজয়ী ইউনুস-এর অনুরাগীরা মহাক্ষুন্ন। বিএনপি সরকারের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করছে। বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্বের ভাবমূর্তি তলানিতে ঠেকছে।
ভারতের আমন্ত্রণকে গুরুত্ব দেননি তারেক রহমান। ‘ব্রিকস’ সম্মেলনেও ভারত সফর করেননি। চীন, রাশিয়া, ইরান, মলয়েশিয়ায় রাষ্ট্রপ্রধানরা এলেন। দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের সুবিধা নিতে ব্যর্থ হলো দেশ। যদিও জাতিসংঘে অনেকের সঙ্গেই বৈঠক হতে পারে। বাণিজ্য চুক্তির কারণে আমেরিকাও গুরুত্ব দেবে। তবে রাজনীতিতে বিএনপি অনেকটা ‘একা’ হচ্ছে। আওয়ামী লীগ বিরোধী ঐক্যে মহাফাটল। সেই ফাঁকে ডিসেম্বরে বিশাল ধাক্কা আসতে পারে। জুলাই পক্ষীয়রা এজন্যে আতংক অনুভব করছেন।