শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ :

শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

মেডিকেইডের ৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারের জালিয়াতি : জাকিয়া খানের সাড়ে ৬ বছরের কারাদণ্ড

মেডিকেইডের ৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারের জালিয়াতি : জাকিয়া খানের সাড়ে ৬ বছরের কারাদণ্ড

বিজ্ঞাপন
নিউইয়র্কের মেডিকেইড ব্যবস্থায় প্রায় ৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারের বিশাল জালিয়াতির ঘটনায় ব্রুকলিনের সোশ্যাল অ্যাডাল্ট ডে-কেয়ার মালিক জাকিয়া খানকে ৭৬ মাস বা ছয় বছর চার মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন ফেডারেল আদালত। কাগজে-কলমে সেবা দেখিয়ে বিল, মেডিকেইড সুবিধাভোগীদের নগদ অর্থে প্রলুব্ধ করা এবং বিনিময়ে সরকারি স্বাস্থ্য কর্মসূচি থেকে কোটি কোটি ডলার আদায়ের এই প্রতারণা প্রায় সাত বছর ধরে চলেছে। শেষ পর্যন্ত আন্ডারকভার অভিযানে গোপন ক্যামেরায় কিকব্যাক দেওয়ার দৃশ্য ধরা পড়ার পর তদন্তে বেরিয়ে আসে জালিয়াতির বিস্তৃত চিত্র।

শুধু কারাদণ্ডই নয়, ৫৫ বছর বয়সী জাকিয়া খানকে প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ হিসেবে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। পাশাপাশি অপরাধলব্ধ প্রায় ৫০ লাখ ডলারের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে দুটি সম্পত্তি, নগদ অর্থ এবং তাঁর ব্রুকলিনের বাড়িতে তল্লাশির সময় উদ্ধার করা বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার।

ব্রুকলিনের ফেডারেল আদালতে ইউএস ডিস্ট্রিক্ট জজ নাতাশা মার্লে বুধবার এ সাজা ঘোষণা করেন। গত আগস্টে স্বাস্থ্যসেবা জালিয়াতির ষড়যন্ত্র এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে প্রতারণার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেছিলেন জাকিয়া খান।

ফেডারেল প্রসিকিউটরদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত কোনি আইল্যান্ডে জাকিয়া খানের দুটি সোশ্যাল অ্যাডাল্ট ডে-কেয়ার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই জালিয়াতি চালানো হয়। প্রতিষ্ঠান দুটি হলো হ্যাপি ফ্যামিলি ও ফ্যামিলি সোশ্যাল।

অভিযোগ অনুযায়ী, মেডিকেইড সুবিধাভোগীদের নগদ অর্থসহ বিভিন্ন ধরনের কিকব্যাক ও অবৈধ প্রণোদনা দেওয়া হতো। এর বিনিময়ে তাঁদের নামে এমন সব সেবার বিল মেডিকেইডে পাঠানো হতো, যা বাস্তবে দেওয়া হয়নি। এভাবে প্রতিষ্ঠান দুটি প্রায় ৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারের দাবি জমা দেয়। এর মধ্যে প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার পরিশোধ করে মেডিকেইড।

মামলার সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দিক হয়ে ওঠে ২০২৩ সালের একটি আন্ডারকভার অভিযান। একজন আন্ডারকভার কর্মকর্তা নিজেকে মেডিকেইড সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচয় দিয়ে জাকিয়া খানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আদালতের নথি অনুযায়ী, কোনি আইল্যান্ডের ওয়েস্ট ৩২তম স্ট্রিটে হ্যাপি ফ্যামিলির কার্যালয়ে বৈঠকের সময় খানকে ওই ব্যক্তিকে কিকব্যাক হিসেবে নগদ অর্থ দিতে দেখা যায়।

পুরো ঘটনাটি গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা হয়। ভিডিওতে জাকিয়া খানকে হাসিমুখে টাকার বান্ডিল গুনতে দেখা যায়। পরবর্তী সময়ে এই ভিডিও তদন্তকারীদের হাতে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়ে ওঠে।

তদন্তের একপর্যায়ে জাকিয়া খানের ব্রুকলিনের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে নগদ অর্থ ও বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়। আদালতের আদেশ অনুযায়ী, তাঁর দুটি সম্পত্তিসহ প্রায় ৫০ লাখ ডলারের অপরাধলব্ধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে।

মামলার ব্যাপ্তি শুধু অর্থের অঙ্কেই নয়, সময়ের হিসাবেও উল্লেখযোগ্য। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় সাত বছর ধরে এই কার্যক্রম চলেছে। ফলে এত দীর্ঘ সময় ধরে কীভাবে বিপুল অঙ্কের ভুয়া দাবি মেডিকেইড ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে পরিশোধ হয়েছে, তা সরকারি স্বাস্থ্য কর্মসূচির তদারকি ও জালিয়াতি শনাক্তকরণ ব্যবস্থা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

মেডিকেইড যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি। নিউইয়র্কে নিম্নআয়ের পরিবার, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ এই কর্মসূচির ওপর নির্ভরশীল। ফলে জালিয়াতির মাধ্যমে মেডিকেইডের অর্থ আত্মসাৎ শুধু সরকারি কোষাগারের ক্ষতি নয়; প্রকৃত সুবিধাভোগীদের জন্য বরাদ্দ সম্পদের ওপরও এর প্রভাব পড়ে।

নিউইয়র্কে বিশেষ করে হোমকেয়ার ও কমিউনিটিভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা খাতে জালিয়াতি, অতিরিক্ত বিল এবং সরকারি অর্থের অপব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। কনজ্যুমার ডিরেক্টেড পারসোনাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম বা সিডিপ্যাপের প্রশাসন ও তদারকি নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে জাকিয়া খানের মামলাটি সিডিপ্যাপ জালিয়াতির মামলা নয়। তাঁর বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ ছিল সোশ্যাল অ্যাডাল্ট ডে-কেয়ার প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে মেডিকেইড সুবিধাভোগীদের কিকব্যাক দেওয়া এবং বাস্তবে দেওয়া হয়নি এমন সেবার জন্য মেডিকেইডে বিল জমা দেওয়া।

এই মামলার পরিসংখ্যানই জালিয়াতির ব্যাপকতা তুলে ধরে—প্রায় ৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারের ভুয়া বিল, তার বিপরীতে মেডিকেইড থেকে প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার পরিশোধ এবং প্রায় সাত বছর ধরে চলা প্রতারণা। শেষ পর্যন্ত কারাদণ্ডের পাশাপাশি সেই ৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার ফেরত এবং আরও প্রায় ৫০ লাখ ডলারের অপরাধলব্ধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ এসেছে।

নিউইয়র্কে স্বাস্থ্যসেবা খাতের সঙ্গে যুক্ত হাজার হাজার বৈধ প্রতিষ্ঠান নিয়ম মেনে সেবা দিয়ে আসছে। তবে এ ধরনের বড় জালিয়াতির ঘটনা পুরো খাতের ওপরই বাড়তি নজরদারি ডেকে আনতে পারে। একই সঙ্গে মামলাটি একটি কঠোর বার্তাও দিচ্ছে—সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচির অর্থ আত্মসাৎ বা ভুয়া বিলের মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হলে কারাদণ্ডের পাশাপাশি বিপুল অর্থ ফেরত এবং সম্পদ বাজেয়াপ্ত হওয়ার পরিণতিও অপেক্ষা করতে পারে।

ঠিকানা/এসআর

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz