বাংলাদেশের ভেতরে রাজনৈতিক ডামাডোলে অস্থির সমাজ-জীবন। দেশের মানুষের এসব নিয়ে তেমন মাথাব্যথা হয় না। সইতে সইতে সয়ে গেছে। মনকে খুব একটা হয়রান করতে পারে না। ধরে নিয়েছে চক্রান্ত কিছু ঘটে গেলেও সেটা বড়জোর সরকার পতন হতে পারে। চব্বিশের পর বিজয়ের উত্তেজনার বশে কেউ আর বলবে না, নতুন স্বাধীনতার কথা। মানুষ ধরে নিয়েছে তাদের নামে সব ঘটনা ঘটবে, কিন্তু তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক কোনো পরিবর্তন আসবে না। মানুষ সবাই চেয়ে চেয়ে দেখবে, কেউ বেশি খেয়েছে, কেউ কম খাচ্ছে অথবা উল্টোটা।
এবার বাংলাদেশের বাইরে যা ঘটতে চলেছে, তা সংবার্ষিক কোনো ঘটনা নয়। বাংলাদেশ এত দিন সেই রাখাল বালক আর বাঘের গল্পের মতো বাঘ আসছে বাঘ আসছে আওয়াজ শুনলেও এবার সত্যি সত্যি সেই বাঘের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের সীমান্তে। এবং এই বাঘ হানা দিচ্ছে দিনের আলোয় নয়, রাতের অন্ধকারে। তাদের নিশি অভিযান মনে করিয়ে দেয় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানিদের হামলে পড়ার কথা। সেই অভিযানও ছিল মধ্যরাতে, বাঙালিরা যখন ঘুমিয়ে ছিল। ঘুমন্ত বাঙালিদের ওপর আক্রমণ চালানো সহজ মনে হয়।
পাকিস্তানি শাসকেরা ঘুমন্ত বাঙালিদের ওপর হামলা চালিয়ে তাদের হত্যা করেছিল। শুভেন্দু অধিকারী পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেই প্রথমে বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্তে অসম্পূর্ণ কাঁটাতারের বেড়া সম্পূর্ণ করার নির্দেশ দেন। শুভেন্দু তাতেও তৃপ্ত নন। শুরু করেছেন ভারতীয় বাঙালি মুসলমানদের সীমান্তে ধরে এনে গভীর রাতে বাংলাদেশে জোর করে ঠেলে দেওয়া। ভারতীয় বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সÑবিএসএফ এই কাজটি করছে। তাদের পুশইনের কয়েকটি চেষ্টা ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ বিজিবির সদস্যরা ঠেকিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ধনুকভাঙা পণ। তিনি জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গকে বাঙালি মুসলিম-মুক্ত করবেনই। তাই একবার না পারিলে দেখো শতবার পণ নিয়ে মাঠে নেমেছেন। পুশইনের পাশাপাশি শুভেন্দুর ঠাঙ্গারেরা নির্বাচনের পরপরই দাঙ্গা বাধিয়ে বাঙালি মুসলমানদের হত্যা করার পথ বেছে নিয়েছে। তারা মসজিদে মসজিদে হামলা চালাচ্ছে। জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিচ্ছে বাঙলি মুসলমানদের ঘরবাড়ি। সীমান্তে বিএসএফের হত্যাকাণ্ডও বৃদ্ধি পেয়েছে।
‘পাক-ভারত মাল্টি অ্যালাইনমেন্টে বাংলাদেশ’-গত ১৩ মে সংখ্যায় ঠিকানার প্রধান শিরোনাম। সেখানে দেখা যাচ্ছে, শুভেন্দু অধিকারীর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার দিনই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা সীমান্তে বিএসএফ দুই বাংলাদেশিকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণায় শুভেন্দুর বিজয়ের আভাস পাওয়া মাত্রই দাঙ্গাবাজরা সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর চড়াও হয়। পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী সহিংসতায় এসব হামলা সংঘটিত হয়। অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রটেকশন অব সিভিল রাইটস নামের নাগরিক অধিকার রক্ষায় নিয়োজিত একটি মানবাধিকার সংগঠনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ-সংক্রান্ত সংবাদ ও ছবি ভাইরাল হয়ে পড়ে। তাতে কখন, কোথায়, কতটা দাঙ্গা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, তা সবিস্তারে ভাইরাল হয়েছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এসব ঘটনার প্রতিবাদ জানানো হলেও কে শোনে কার কথা। মানবাধিকারের প্রতি দৃষ্টি দেওয়ার সময় নেই শুভেন্দুর। সদ্য বিজেপিতে যোগ দিয়ে তিনি প্রমাণ দিয়ে দেখাতে চান, মূল বিজেপির সদস্যদের চেয়ে কত বেশি বিজেপি তিনি। তাই তৃণমূলে থাকাকালীন যিনি বাঙালি মুসলমানদের রক্ষা করেছেন, সেই শুভেন্দু অধিকারীর হাত থেকে পশ্চিমবঙ্গে মুসলমান বাঙালিরা কতটা রক্ষা পান, তা কেবল ভবিষ্যৎই বলে দিতে পারে।