শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ :

শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

​বৃক্ষশ্রেণিশোভিত প্যারিস রোডে

​বৃক্ষশ্রেণিশোভিত প্যারিস রোডে

বিজ্ঞাপন
নিসর্গের প্রতিটি দিন প্রতিটি ক্ষণ যেন একেকটি আবেগি কবিতা। দিগন্তবিস্তৃত মাঠে সবুজ ধান খেতে ঝিরিঝিরি হাওয়া আর আলো-ছায়ার লুকোচুরি খেলায় দৃষ্টি আটকে থাকে। মন হেসে ওঠে নৈসর্গিক সৌন্দর্যে। এই নিসর্গপ্রেম যে করে, সেই জানে শুধু, সেই বোঝে এর আসল মর্মকথা-যেমন বুঝেছিল রাসেল রহমান। তাই তো সুযোগ পেলেই সে ছুটে যায় প্রকৃতির সৌন্দর্যের কাছে। প্রকৃতির বিচিত্র রঙের মেলায় মন ভিজিয়ে, শিশিরের ছায়ায় শরীর জুড়িয়ে, জম্পেশ আড্ডা শেষে মাত্র ঘরে ফিরেছে সে।
সাহিত্য আড্ডা থেকে ঘরে ফিরেই রাসেল ফোন করল সালমাকে।
হ্যালো, সালমা?
জি বলছি। কে? রাসেল ভাই?
হ্যাঁ।
একটু থেমে সালমা বলল, কেমন আছেন?
ভালো। তুমি?
এই আছি একরকম।
তারপর কিছুক্ষণ নীরবতা। নীরবতা ভেঙে সালমার প্রশ্ন, কী করছেন?
তেমন কিছু না। আজকে আমাদের সাহিত্য আড্ডার আসর ছিল। প্রতি মাসের প্রথম শনিবারে আড্ডা বসে। আয়োজনের প্রায় পুরোটাই সামলাতে হয়। আসর থেকে ফিরেই তোমাকে কল করছি।

সালমা খুশি হয়ে বলল, বাহ! দারুণ তো! জেনে খুব ভালো লাগল। আজ নিশ্চয়ই অনেক ধকল গেছে আপনার। এখন বিশ্রাম করুন, পরে কথা হবে...
রাসেল তাড়াতাড়ি বলল, আরে না-না, তেমন ক্লান্ত নই। বরং কোনো সাহিত্যের আসরে গেলে সত্যিই মনটা অন্য রকম হয়ে যায়। সূক্ষ্ম গভীর এক ভালো লাগায় মনটা ভরে ওঠে...
সালমা বলল, তবু এখন বিশ্রাম করুন। পরে আপনার সঙ্গে কথা হবে রাসেল ভাই, বলে হাসতে হাসতে ফোনটা রেখে দিল সালমা।
সাথে সাথে মধুময় প্রীতিময় অতীতে হারিয়ে গেল রাসেল...
প্রায় ১০ বছর পর সালমার সাথে দেখা, ঢাকার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সাহিত্য আসরে! এভাবে তাদের দেখা হবে কল্পনাও করেনি রাসেল! প্রথমে চিনতেই পারেনি। মাইক্রোফোনে সালমা যখন নিজের নাম এবং পরিচয় দিচ্ছিল, তখনই রাসেল চিনতে পারল সালমাকে। এই দশ বছরে অনেক বদলে গেছে সালমা। এত দিন পরে একে অপরের সাথে যেন আবার নতুন করে পরিচয় হলো।
আসর শেষে হাঁটতে হাঁটতে অনেক কথা হলো ওদের। দীর্ঘ ১০ বছরের জমানো কথা যেন শেষই হতে চায় না...
কথার এক ফাঁকে রাসেল জিজ্ঞেস করল, সালমা, তুমি বিয়ে করোনি? তোমার স্বামী কোথায়? তাকে নিয়ে এলে না কেন?
সালমা নীরব। মাথা নিচু করে পথ হাঁটছে...
একটু পরে রাসেল আবার জিজ্ঞেস করল, কী হলো, কিছু বলছ না যে?
সালমা একটু গম্ভীর হয়ে বলল, আপনি একসঙ্গে এতগুলো প্রশ্ন করেছেন কোনটার উত্তর আগে দিই তাই ভাবছি। হ্যাঁ, বিয়ে করেছিলাম। আমার বর একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করত। ভালোই চলছিল আমাদের। কিন্তু কপালে বেশি দিন সুখ সইলো না রাসেল ভাই!
কেন? কী হয়েছিল, সালমা!?

সড়ক দুর্ঘটনা! অফিস থেকে বাসায় আসার পথে...!
দীর্ঘক্ষণ কারও মুখে কোনো কথা ছিল না। কীভাবে সান্ত্বনা দেবে, কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছিল না রাসেল।
অবশেষে সালমাই মুখ খুলল, আমার এক মেয়ে, ক্লাস সেভেনে পড়ে। আর আমি একটা কলেজে পড়াই। উত্তরায় থাকি। দীর্ঘদিন লেখালেখি থেকে দূরে ছিলাম। এই কিছুদিন হলো শুরু করেছি। কিন্তু কী আশ্চর্য দেখুন, সাহিত্য আসরে এসেই আজ আপনাকে খুঁজে পেলাম; তাও এত বছর পর...!

এর পর থেকে সালমা আর রাসেল নিয়মিত ফোনে কথা বলে। ফেসবুকের আইডি আদান-প্রদান করে। কবিতা লেখে, কবিতা পড়ে। এভাবে ওদের কত বিনিদ্র রজনী পার হয় কথা বলতে বলতে...!
একদিন হঠাৎ সালমা জিজ্ঞেস করে, আপনার বউয়ের কী হয়েছিল, রাসেল ভাই?
এমন প্রশ্নে মোটেই প্রস্তুত ছিল না রাসেল। কী বলবে ভেবে পায় না। কীভাবে জানাবে সে তার অন্ধকার জীবনের কথা? তবু ওর মনে হলো, সত্যটা সালমার জানা উচিত।

রাসেল তাই কোনো ভণিতা না করে সরাসরি বলল, তুমি তো জানতে, আমি খুব বেশি স্মোক করতাম। ছাত্রজীবন শেষে বেকার জীবনে এসে এর মাত্রা আরও বাড়তে থাকে। একসময় সিগারেটের ভেতরে গাঁজার পুরিয়া ঢুকে যায়। আমি ধীরে ধীরে নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ি... তারপর হঠাৎ একদিন বাবা-মায়ের অনুরোধে আমার বিয়ে হয়ে যায়। বউ রিমা আমার কাছে সংসার চেয়েছিল, ভালোবাসা চেয়েছিল। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমি আমার বেকার জীবনে আরও বেশি সময় নেশায় বুঁদ হয়ে পড়ে থাকি... ধীরে ধীরে আমাদের সম্পর্ক বিষাক্ত হতে লাগল। মাঝে মাঝে আমি ওর গায়ে হাত তুলতে লাগলাম। তারপর একদিন ওর বাবা-মা এসে ওকে নিয়ে গেল...
আপনি কি এখনো নেশা করেন?

কী জবাব দেবে রাসেল ভেবে পায় না। তারপর হাসতে হাসতে বলে, হ্যাঁ করি। কিন্তু আমি এই অন্ধকার জীবন থেকে বের হতে চাই, আমি বড় ক্লান্ত, সালমা।
এভাবেই কথা বলতে বলতে ওরা কখন যেন একে অপরের খুব কাছাকাছি এসে যায়। প্রায়ই রাত জেগে জেগে, প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় হাজারো কথা বলে। কথা বলতে বলতে কখনো হাসিতে লুটিয়ে পড়ে, কখনো ফিরে যায় ফেলে আসা মতিহারের সবুজ চত্বরে...
আজ রাসেলের সব মনে পড়ে যায়। কখন সালমার সাথে প্রথম দেখা হয়েছিল, কী কথা হয়েছিল, কোন রঙের কী কাপড় সে পরিধান করেছিল, সবই মনে পড়ে রাসেলের...
ভাগ্যের ওপর প্রচণ্ড বিশ্বাস ছিল সালমার। তাই বোটানিক্যাল গার্ডেনে সেদিন প্রথম রাসেলের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে সালমা বলেছিল, ভালো করে দেখো তো আমার কপালে প্রেম আছে কি না? সেদিন রাসেল অনেকক্ষণ ধরে সালমার ভাগ্য গণনা করেছিল। সেই প্রথম স্পর্শ! প্রথম কাঁপুনির অনুভূতি-আজও জেগে আছে রাসেলের বুকের গভীরে!। মাঝে মাঝে রাসেল চোখ বন্ধ করে ডুব দেয় তাতে। কখনো সাঁতার কাটে ক্লাসরুমে, লাইব্রেরিতে, আমতলায়, কলা ভবনের করিডোরে...!

দুই.
আজ অনেক দেরিতে ঘুম ভাঙল রাসেলের। শুয়ে শুয়ে গত রাতে সালমার কথাগুলো মনে করার চেষ্টা করল। দূরে ঘুঘু পাখির একটানা ডাক রাসেলকে আনমনা করল। প্রতিদিনকার পাখপাখালির ডাকাডাকিতে রাসেলের মনটা আনচান করে ওঠে। সাথে সালমার আগমনে জীবনের গভীর শূন্যতা ধীরে ধীরে পূর্ণ হতে থাকে...!
আজকাল পাখি-প্রেমে পড়েছে রাসেল।
সকালে হাঁটতে গেলে পাখির সঙ্গে কত কথা বলে। সালমার কথা মনে হলে মনটা গুনগুন করে গেয়ে ওঠে। নেচে ওঠে সালমা-সংগীতে...!
রাসেল এখন স্বাস্থ্যসচেতন। প্রতিদিন সকালে হাঁটতে বেরোয়। পাখির গান শুনে খুশি খুশি মন নিয়ে ঘরে ফেরে।
ঘরে ফিরে দেখে, মা তখনো জায়নামাজে বসে সন্তানের জন্য মঙ্গল কামনা করছেনÑএই দৃশ্যটা রাসেলের খুব প্রিয়। কখনো কখনো রাসেল মায়ের কাছে গিয়ে বসে। মায়ের হাত দুটো হাতে নিয়ে মুখপানে চেয়ে থাকে অপলক, এ যেন এক স্বর্গীয় অনুভব।
এভাবে একদিকে সালমা ও অন্যদিকে প্রকৃতির প্রেমে রাসেলের সকাল-সন্ধ্যা বেশ কাটতে থাকে। বেশির ভাগ রাত কাটে ফোনালাপে। প্রতিদিন দু’একবার কথা না বললে রাসেলের মন ছটফট করে ওঠে। মনে মনে শুধু একটি ফোনের প্রতীক্ষাÑকখন ফোন দেবে সালমা?
বেশির ভাগ সময় রাসেলই ফোন করে সালমাকে।
আজও তার ব্যতিক্রম নয়।

হাসতে হাসতে সালমা বলে, রাতে ভালো ঘুম হয়েছে আপনার?
সালমার হাসিতে যোগ দিয়ে রাসেল বলল, আজ অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছি। আর ঘুমের ভেতরে তোমাকে স্বপ্নে দেখেছি...
সালমা বিস্ময় নিয়ে বলল, ও তাই বুঝি? তাহলে আজ আমাকে নিয়ে একটা রোমান্টিক কবিতা লিখে ফেলুন, হা-হা- হা- হা-
সালমার সেই মিষ্টি মধুর হাসি, কত দিনের চেনা। রাসেল চোখ বন্ধ করে সালমার মধুমাখা হাসিখানা বুকের ভাঁজে রেখে বলল, তুমি কি এখনো কবিতা লেখো?
দীর্ঘশ্বাস ফেলে সালমা বলল, সময় পেলে একটু-আধটু লেখার চেষ্টা করি।
এবারের বইমেলায় তোমার কোনো বই আসবে? একটু চুপ করে থেকে সালমা বলল, জানি না রাসেল ভাই, পাণ্ডুলিপি তৈরি আছে। হাতে টাকা-পয়সা নেই। তা ছাড়া বিধবা মানুষকে কে টাকা ধার দেবে বলুন?
রাসেল বলল, তা ঠিক। সেটা আমি জানি। তবু তো তুমি চাকরিজীবী, সালমা। আর আমি যে এখনো পুরোপুরি বেকারÑবলেই হো-হো করে হেসে উঠল রাসেল।
একটু থেমে সালমা বলল, থ্যাংকস গড, আমি এখনো কাজ করে ঘরে কিছু টাকা আনি। কিন্তু সংসারের খরচ চালাতে পুরোটাই চলে যায়। একার রোজগার। মাসের শেষে একেবারে হিমশিম খেতে হয়, রাসেল ভাই। থাক সেসব বৈষয়িক কথাবার্তা। আমার কবিতার বইয়ের ভালো একটা নাম চাই।

রাসেল বলল, তুমি কি কিছু ভাবোনি?
সালমা আমতা-আমতা করে বলল, ভেবেছি কয়েকটা নাম। ‘মতিহারের মণিদীপ’ নামটা কেমন লাগে আপনার?
রাসেল উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, বাহ চমৎকার নাম! আমার খুব পছন্দ হয়েছে, সালমা।
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, রাসেল ভাই। আপনার পছন্দ হয়েছে জেনে খুব খুশি হলাম।
একটু থেমে রাসেল বলল, মতিহারের স্মৃতি এখনো হৃদয়ে ধারণ করে আছো তাহলে?
একটা গভীর শ্বাস নিয়ে সালমা বলল, হৃদয়ে মতিহার আছে জন্যই তো আজও বেঁচে আছি। আজও হাসি, গান গাই, স্বপ্ন দেখি...!
আমরা রাবিয়ান, এটাই আমাদের বড় পরিচয়, তাই না সালমা?
সালমা বলল, ঠিক বলেছেন রাসেল ভাই। আমি যদি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়তে আসতাম, তাহলে অনেক কিছুই অপূর্ণ থেকে যেত। জীবনে অনেক কিছু মিস করতাম। যেমন আপনাকে মিস করতাম। আপনার অ্যাস্ট্রোলজি মিস করতাম। একটু থেমে সে আবার বলল, আমাদের প্রথম দেখা হবার কথা কি আপনার মনে আছে?
রাসেল বলল, সে কথা কি কখনো ভোলা যায়, সালমা?

একটা গভীর শ্বাস নিয়ে সালমা বলল, সেই ক্যাম্পাস, ক্যাফেটেরিয়া, লাইব্রেরি, প্যারিস রোড, জুবেরী ভবন, শহীদ মিনার, কলাভবন, সেই পদ্মার পাড়, শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা, বোটানিক্যাল গার্ডেন সেই যে আমার নানান রঙের দিনগুলি রাসেল ভাই...!
রাসেল কোথায় যেন হারিয়ে যেতে যেতে বলল, আমারও খুব মনে পড়ে। মন পোড়ে। আমার রুমে বেড়াতে আসার কথা তোমার মনে আছে?
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সালমা বলল, আপনার সেই ২০৭ নম্বর রুমের কথা আমি কাউকে জানাতে চাই না, রাসেল ভাই। জানাতে চাই না আমার হৃদয়ের প্রথম তোলপাড়। প্রথম কাঁপুনি। প্রথম সর্বনাশের কথা...!
রাসেল বলল, সর্বনাশ কেন বলছ, সালমা?

সালমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, সবকিছু হারিয়ে গেলে মানুষ তো সর্বনাশই বলে নাকি? কিছুই ভুলিনি আমি। সব মনে আছে। সেদিন আপনি কী রঙের শার্ট পরে ছিলেন, তাও মনে আছে। আপনারা কয় বন্ধু ছিলেন, আমরা ক’জন বান্ধবী ছিলাম। আপনি প্রথম আমাকে সেদিন কী কথা বলেছিলেন-সবই আমার মনে আছে।
একটু দম নিয়ে সালমা আবারও বলল, স্কুল-কলেজে আমার কোনো প্রেম হলো না। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিঁড়িতে পা দিতে না দিতেই একজোড়া ইননোসেন্ট চোখের গভীরে আমি সবই হারালাম...!
তুমি এভাবে বলে আমাকে আর কষ্ট দিয়ো না, সালমা। তোমার সেদিনের সেই সাদা ওড়নার বাহার, আজও আমার হৃদয়াকাশে দোলপূর্ণিমার মতো দোলা দেয়...!

সালমা কিছুটা উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল, তাই যদি হবে, তবে কেন সেদিন আমাকে এভাবে বঞ্চিত করেছিলেন? কিছুই তো চাইনি আমি? শুধু আপনার হাত ধরে বাকিটা জীবন পাশাপাশি হাঁটতে চেয়েছিলাম। আপনার জাদুমাখা মুখের কথা শুনতে চেয়েছিলাম, সেটা কি খুব বেশি চাওয়া ছিল, রাসেল ভাই? আপনি আপনার অভাবী পরিবারের কথা বলতেন। ছোট্ট একটা ঘরে আপনাদের অনেক কষ্টে রাত্রিযাপনের কথা বলতেন। কিন্তু আমি তখন আপনার সাথে খোলা আকাশের নিচে থাকার জন্যে যে মনে-প্রাণে তৈরি ছিলাম, তার কোনো মূল্যই আপনি দেননি।

না-না-না, সে রকম ঠিক নয়, সালমা...
হ্যাঁ-হ্যাঁ, সেটাই ঠিক, রাসেল ভাই। আপনি বলতেন, ‘এই আবেগ দুই দিনের। অভাবের কশাঘাতে প্রেম-ভালোবাসা সব জানালা দিয়ে পালিয়ে যায়।’ আপনার সেই দর্শনে মস্ত ভুল ছিল, রাসেল ভাই। একটি দুরন্ত হরিণীর ছোটোছুটিকে আপনি সেদিন গলাটিপে হত্যা করেছিলেন! আর সেই থেকে আমার সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল। নিয়মিত ক্যাফেটেরিয়া, প্যারিস রোড, জুবেরী ভবন, বোটানিক্যাল গার্ডেনে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। আপনার হলে আর কোনো দিন যাওয়া হলো না আমার! কিন্তু তার পরও আমি আপনার পদধ্বনি শুনতে পেতাম। ভেবেছিলাম, একদিন হয়তো আপনাকে আবারো আমার হলের সামনে দেখা পাব। হয়তো একদিন আমার হলের ‘খালা’ এসে বলবেন, ‘আপা, আপনার ভিজিটর এসেছেন।’ বিকেল হলেই এমনি এক গভীর ভাবনা আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখত। তারপর ধীরে ধীরে সেও একদিন ফ্যাকাশে হতে হতে নিভে গেল সব! কেউ কোনো দিন আর আমার হলের গেটের সামনে এল না!

সালমার কথা অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। মুঠোফোন হাতে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ চুপচাপ দুজনে। কী বলবে রাসেল ভেবে পায় না...
খুব আবেগতাড়িত হয়ে রাসেল বলল, তুমি তো তখন আমাকে নাম ধরে ডাকতে, তুমি করে বলতে। এখন কেন আপনি আপনি করছ?
সালমা কিছুটা রাগান্বিত হয়ে বলল, কেন? কার কী লাভ হয়েছে তাতে? আমি কারো নাম ধরে তসবি জপতে জপতে শেষে সেই মানুষটাকেই হারিয়ে ফেলেছি। তুমি করে বলতে বলতে সেই তুমি কবে আবার আপনি হয়ে গেছে? আর এর জন্যে আপনিই দায়ী, রাসেল ভাই।
আবারো দীর্ঘ নীরবতা নেমে আসে। কারও মুখে কোনো কথা থাকে না...
অবশেষে সালমাই নীরবতা ভেঙে বলল, ওসব কথা থাক, রাসেল ভাই। সেসব বিবর্ণ দিনের হৃদয়ভাঙার কথা শুনলে আপনার মিছেমিছি কষ্ট হবে।

বরং কখনো যদি আবারো আপনাকে আমার মন থেকে ‘তুমি’ বলতে ইচ্ছে করে, আমি বলব। প্লিজ, কোনো কিছুতে আমাকে জোরাজুরি করবেন না। আপনাকে মনে হয় আমি দুঃখ দিলাম, সরি রাসেল ভাই। এখন ছাড়ছি, পরে আবার ফোন করব...

তিন.
বড় ভারাক্রান্ত মন নিয়ে সারাটা দিন কাটল রাসেলের। কোনো কাজে মন নেই ওর। পড়ার টেবিলে বসে অনর্থক কবিতা লেখার চেষ্টা করল। আজকাল কবিতার খাতায় শুধুই সালমার মুখ! কী লিখবে রাসেল? সালমার কথা লিখবে? নাকি তার জীবনের হাহাকারের কথা? তা ছাড়া কী হবে এসব লিখে? শুধু শুধু মানুষের করুণা কুড়ায়ে কী লাভ? তার চেয়ে এই ভালোÑথাক না তাদের প্রণয়, তাদের হাসি-কান্না, সবকিছু খুব গোপনে রুপার বাক্সে তোলা থাক...
মনটা ভালো করার জন্য মায়ের কাছে গিয়ে বসল রাসেল।
মা রাসেলের মুখের দিকে চেয়ে বললেন, কিরে খোকা, তোর মুখটা এত শুকনা শুকনা লাগছে কেন? জ্বর করেনি তো? আয় তো দেখিÑবলেই মা তাঁর নরম হাত রাসেলের ললাটে রেখে বললেন, কই, সব তো ঠিকই আছে...
রাসেল চক্ষু বন্ধ করে মনে মনে মাকে বলল, জননী, আপনি কীভাবে বুঝবেন আমার ভেতরের উথাল-পাতাল? কীভাবে বুঝবেন আমার হৃদয়ের সুনামি? সর্বস্ব হারিয়ে আজ আমি পথের ফকির-এসব বললে আপনার যে বড় কষ্ট হবে, মা। তার চেয়ে এই ভালো, সব তোলা থাক জননী আমার। আপনার হাসি, আপনার খুশি, আপনার আনন্দ, আজ আমার জীবনের একমাত্র পাথেয়, মাÑমনে মনে এই কথাগুলো বলতে বলতে রাসেল বেরিয়ে এল খোলা আকাশের নিচে। বাড়ির পাশেই আত্রাই নদী। নদীর ধারে গিয়ে বসল কিছুক্ষণ। মন খারাপ হলেই এখানে আসে সে। নদীর ঢেউয়ের সাথে কথা বলে। নদীর সাথে কথোপকথনে মন কিছুটা ভালো হয়ে ওঠে। তখন রাসেল মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, সালমাকে সে আর কখনো কোনো দিন দুঃখ দেবে না। কষ্ট দেবে না, কান্নার কারণ হবে না।

চার.
এরপর কোনো যোগাযোগ ছাড়াই অনেক দিন পার হয়ে গেল। ধীরে ধীরে রাসেলের উৎকণ্ঠা বাড়তে লাগল। তারপর হঠাৎ এক রাতে সালমাই ফোন করল রাসেলকে। মুঠোফোনটা হাতে নিয়ে রাসেল বলল, কী খবর, সালমা? অনেক দিন পর? সালমা হাসতে হাসতে বলল, এখন থেকে আপনাকে আর কোনো কিছু বলব না। রাসেল আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল, বলবে না কেন?
সালমা হাসতে হাসতে বলল, বলব না মানে-লিখব। আমার অনেক কিছু লিখতে ইচ্ছে করছে...
রাসেল বলল, কী ধরনের লেখা?

একটু থেমে সালমা বলল, দারুণ একটা প্লট মাথায় এসেছে! অদ্ভুত কিছু বিষয় নিয়ে ভাবছি। আমার এক চাচাতো বোন আসমা, সোশিওলজির অধ্যাপক। অনেক নাম-যশ। তাঁর সাথে আজ সারাটা দিন কাটল। অনেক ঘুরেছি আমরা। টুকিটাকি কিছু শপিংও করেছি। তখন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমরা অনেক কথা বলেছি। আজ রাত আটটা পর্যন্ত আমরা বেঙ্গল লাইব্রেরিতেই ছিলাম...
খুব উৎসাহ নিয়ে রাসেল বলল, বাহ চমৎকার। তবে তোমার অদ্ভুত বিষয়টা কী? সেটা আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে।
সালমা একটু ভেবে নিয়ে বলল, এই যেমন ধরুন, বিজ্ঞান বলছেÑবৃক্ষ কী মেসেজ পাঠাতে পারে? জিপিএস সিস্টেমে পাখিরা কী করে চলে? কী করে প্রাণী ঘর চেনে? মুনিব চেনে? এ রকম। তারপর ঈশ্বর নিয়ে, দার্শনিক প্লেটোর ‘আত্মার’ বিষয়টি নিয়ে, হেগেলের ‘দ্বান্দ্বিক মতবাদ’ নিয়ে, আরো অনেক বিষয়ে কথা বলেছি আমরা। তারপর ধরুন, এই যে আপনার সাথে আবার আমার দেখা হলো, সেটাও কিন্তু বহু বছরের আয়োজন-কী, আশ্চর্য হচ্ছেন তো? ছোট্ট একটি ঘটনার পেছনে অনেক ঘটনাই কাজ করে...তাই মনস্থির করেছি, সেগুলোকে নিয়ে আমি একটা বিশেষ ধরনের লেখা লিখব। প্রার্থনা করবেন, আমি যেন লেখাটা শেষ করতে পারি।

তাড়াতাড়ি রাসেল বলল, আমি অবশ্যই প্রার্থনা করি। আর আমি জানি তোমার ভেতরে সেই প্রতিভা আছে। আছে আলোর বিচ্ছুরণ। আমি মতিহারে থাকতেই তোমাকে দেখেছি, তোমাকে বুঝেছিÑআমি জানি তুমি অবশ্যই পারবে, সালমা।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সালমা বলল, মেঘে-মেঘে বেলা তো কম হলো না, রাসেল ভাই! এখন আমি প্রায় বুড়ি হয়ে গেছি, আর সেই সৌন্দর্য নেই, মনের জোরটাও তেমন পাই না...
সালমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে রাসেল বলল, তার পরও তুমি এখনো অনেক সুন্দরী। তোমার ওপর আমার পূর্ণ আস্থা। তোমার সেই বুদ্ধিদীপ্ত মুখশ্রী আজো আমার হৃদয়ে ভাসে। তোমার ডাগর ডাগর কালো অক্ষিতারায় চিকমিক করে যে জ্ঞানের আলো, সেই আলো সহসা কোথাও দেখা মেলে না, সালমা। সত্যি তুমি অনন্যা।

সালমা গভীর শ্বাস ফেলে বলল, কিন্তু কী হলো তাতে? তার পরও তো বিধাতা আমাকে বিমুখ করল! বৃক্ষশ্রেণিশোভিত প্যারিস রোডের সেই পথ, এখন আমার কাছে শুধুই সাহারা...!
রাসেল তাড়াতাড়ি বলল, এমনভাবে বলে না, সালমা। জীবনে যতই ঝড়-তুফান আসুক না কেন, তোমার ওপর আমার বিশ্বাস আজও অবিচল আছে এবং থাকবে।
সালমা একটু গম্ভীর হয়ে বলল, আমাকে খুব বেশি ভালো জানেন, ভালোবাসেন বলেই আপনার এমনটা মনে হয়। এটা আমার ওপর আপনার একরকম অন্ধত্বই, রাসেল ভাই...
রাসেল তাড়াতাড়ি বলে উঠল, হোক অন্ধত্ব। অন্ধ হয়েই আমি সারা জীবন তোমার কাছে থাকতে চাই, সালমা। আমার হাত ধরে তুমি পথ দেখাবে আর আমি নিশ্চিন্তে তোমাকে ভাবতে ভাবতে এগিয়ে যাব...
সালমা হাসতে হাসতে বলল, আমি নিজেই সেই কবে থেকে অন্ধ হয়ে আছি, আমি কি পারব রাসেল ভাই?
একটু ব্যাকুল হয়ে রাসেল বলল, তুমি অবশ্যই পারবে। এক অন্ধই পারে আরেক অন্ধকে পথ দেখাতে, ভালোবাসতে। তা ছাড়া আমরা তো রাবিয়ান সালমা, আমাদেরকে যে পারতেই হবে। মতিহার সবুজ চত্বরের মতো আমাদের ভালোবাসা চিরকাল আলো ছড়াবে...
সালমা মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল, তাই তো সেই কবে থেকে তোমাকে আমি চিনি, তোমাকে আমি জানি, রাসেল।
কতখানি জানো, সালমা?
সালমা হাসতে হাসতে বলল, সেটা তো মেপে-জুকে বলতে পারব না, তবে অ-নে-ক খানি...
বলেই হেসে উঠল দুজন। সেই হাসির ঝংকারে ওদের তখন মনে হলো, ফোনের ভেতরে নিরবচ্ছিন্ন দুলছে মতিহারের শিরিষ গাছের পাতাগুলো...

হঠাৎ সালমা বলে উঠল, রাসেল, তোমাকে কে যেন ডাকছেন? আমি ফোনে শুনতে পাচ্ছি...
রাসেল হাসতে হাসতে বলল, আমার মা জননী। কাল সকালে বাজার করতে হবে আর সেই বাজারের লিস্টিটা এখন না করে রাখলে তাঁর ঘুম আসবে না, খুবই অস্থির মানুষ...
তাহলে আমি রাখছি। তুমি মায়ের কাছে গিয়ে বাজারের লিস্ট তৈরি করো, যাও। আর মাকে আমার সালাম দিয়ো, ক্যামন?
রাসেল বলল, ঠিক আছে যাচ্ছি। তবে...
তবে আবার কী?
আমাকে আরেকবার তুমি বলো। আরেকবার আমাকে নাম ধরে ডাকো, সালমা...
পাগলামি করো না, রাসেল। যাও। ওই যে মা আবার ডাকছেন, প্লিজ যাও...
রাসেল তাড়াতাড়ি বলল, যাচ্ছি বাবা, যাচ্ছি। তবে তোমার কি কিছু লাগবে? মানে আগামীকাল বাজার থেকে তোমার জন্য কিছু কি কিনে আনব?

সালমা হাসতে হাসতে বলল, জি জনাব, আমার অনেক কিছুই লাগবে। তবে কালকে আমার জন্য আপাতত কেশর আলু, পানিফল, ধনেপাতা আর দুই ডজন রেশমি চুড়ি নিয়ে এসো, হা-হা-হা-হা...
রাসেলও হাসতে হাসতে বলল, গুড গার্ল। এই তো আমাদের রাবির সেই হাস্যোদ্দীপক সালমা খাতুন।
সালমা তাড়াতাড়ি বলে উঠল, এটা রাবির কৃষ্ণপক্ষের সালমা। ক’দিন পরে সে একেবারেই ফুরিয়ে যাবে...
না-না, তা হবে কেন? তুমি আমার আকাশে শুক্লপক্ষের চাঁদ সালমা, বুঝতে পেরেছ?
গভীর একটা শ্বাস ফেলে সালমা বলল, কী জানি...

পাঁচ.
চনমনে উতলা মন নিয়ে রাসেল ফোনটা রেখে যখন ঘরের বাইরে এল, তখন পৌষের শুক্লপক্ষের চাঁদের আলোয় ধুয়ে যাচ্ছিল চারিধার। ধুয়ে যাচ্ছিল সবুজ গাছ-গাছালি, গাঁয়ের মেঠো পথ আর রাসেলের মনের প্রাঙ্গণ। নিসর্গের সেই স্নিগ্ধ মিষ্টি আলোর ভেতরে রাসেলের চোখে তখন দৃষ্টিনন্দন মতিহারের মতিকন্যা সালমা খাতুন। যে সালমা খাতুন একদিন বৃক্ষশ্রেণিশোভিত প্যারিস রোডে ভেসে বেড়াত, আর দোল খেত রঙিন প্রজাপতির মতো। সেই সালমা খাতুন আজ রাসেলের জীবনে, দখিনা হাওয়ায় সাদা ওড়না উড়িয়ে ছুটে চলা এক চঞ্চলা হরিণী।

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz