পুকুর চোর এদের কাছে তুচ্ছ। সাগর চুরিতেও এরা রেকর্ডধারী। সরকারের অন্যতম ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গৃহহীনের গৃহদান প্রজেক্ট খেয়েছে। কবর খেতেও না লাজ, না ভয়। তা’হলে মসজিদই বা বাকি থাকবে কেন? দেশের প্রতিটি জেলা অসুখের নাম খাই-খাই অষুধের নাম কী?
ও উপজেলায় একটি হিসেবে মোট ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপনে তারা কি-না করেছে! তা ধরা পড়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নে। প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ থেকে শুরু করে নির্মাণ পর্যন্ত পরতে-পরতে চুরি আর চুরি। ভাবা যায়? ভাবা না গেলেও চোরেরা যা করার করে নিয়েছে। ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের ইশতেহার ছিল ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা বিকাশের অবকাঠামোগত সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে নান্দনিক স্থাপত্য শৈলীবিশিষ্ট, ইসলামিক কার্যক্রমের সুযোগ-সুবিধা সংবলিত প্রতিটি জেলা-উপজেলায় মডেল মসজিদ নির্মাণের কথা। তখন কারো কারো ধারণা ছিলÑ ইশতেহারে তো এমন কতো কথাই থাকে। সরকার তা বাস্তবায়নে হাত দিয়েছে ২০১৭ সালে এসে। বাজেট বিশাল। ২০১৭ সালের ২৫ এপ্রিল একনেক সভায় প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় একটি করে ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্প অনুমোদন হয়। প্রকল্পটিতে ছিল এপ্রিল ২০১৭ থেকে ডিসেম্বর ২০১৯ মেয়াদে এবং ৯ হাজার ৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বাস্তবায়নের কথা। আর পায় কে?
কাজের আগেই শুরু হয়ে যায় দফায়-দফায় বরাদ্দ ও সময় বাড়ানোর কাণ্ড। এপ্রিল ২০১৭ থেকে জুন ২০২২ এবং ব্যয় ৮ হাজার ৭২২ কোটি টাকা নির্ধারণ করে প্রথম সংশোধন করা হয়। কাজ শেষ করতে না পারায় ২০২১ সালের ৭ ডিসেম্বর এর মেয়াদ ও ব্যয় উভয়ই বাড়ানো হয়। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে জুন ২০২৪ করা হয়। আর ব্যয় ধরা হয় ৯ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা। এ পর্যন্ত ২০০টি মডেল মসজিদ নির্মাণ শেষে উদ্বোধন হয়েছে। সেইসঙ্গে চলেছে দুর্নীতি আর চুরি। এতে কি বেশি গুনাহ হবে? মসজিদ-মন্দির, কবর আর শ্মশান সেই ভাবনা চোরদের থাকে না। মৃতকে জীবিত বা পুরুষকে নারী, তাও বিধবা বানালেও গুনাহ না হওয়ার একটা গ্যারান্টি তারা হাছিল করেছে। দুস্থ ও পিছিয়ে পড়াদের প্রশিক্ষণে ৫০৩ কোটি টাকার প্রকল্পে নয়-ছয় করতে তাদের বাঁধবে কেন? কেনই বা দুনিয়া-আখেরাতের ভয় পাবে? প্রকল্পগুলোর উদ্দেশ্য শোনানো হয় কতো চমৎকার করে। বাড়ির আঙিনায় ‘গ্রিনহাউসে’ কীভাবে সবজি চাষ করা যায়, তার প্রশিক্ষণ দিতে সরকারের কাছ থেকে ৪৯ কোটি টাকা নিয়েছিল প্রগতি সমাজ উন্নয়ন সংস্থা। কথা ছিল, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীত নারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। তাঁরা পাবেন ৩০ হাজার টাকা দামের একটি করে গ্রিনহাউস। তাতে সবজি চাষ করে নারীরা স্বাবলম্বী হবেন। বাস্তবে কী হয়েছে? বিধবা বা স্বামী নিগৃহীত নন- এমন নারীকে সামনে এনেও যা করার করে নিয়েছে চোরেরা। করোনাকালে দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি ও স্বাবলম্বী করে তোলার নামে এমন ২১টি প্রকল্পে সমাজসেবা অধিদপ্তর ৫০৩ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এর মধ্যে ১৩টি প্রকল্পের কাজ শেষ, ৮টির কাজ শেষের পথে। সেগুলোতেও অবিশ্বাস্য চুরি, দুর্নীতি, অনিয়ম পেয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে জড়িত এনজিওগুলোর কোনো কোনোটির পরিচালনা পর্ষদে রয়েছেন রাজনীতিবিদ, সাবেক আমলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, চলচ্চিত্রের অভিনেতাসহ প্রভাবশালীরা। ২১টি প্রকল্পের ৭টিই একক অথবা যৌথভাবে গেছে সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদের নির্বাচনী এলাকা লালমনিরহাটের আদিতমারী ও কালীগঞ্জ উপজেলায়। জামালপুর ও গোপালগঞ্জে বাস্তবায়ন হয়েছে তিনটি করে। দেশে সবজি চাষে বিস্ময় তৈরির আওয়াজে অবিশ্বাস্য কাণ্ডকীর্তি সেরে নেয়া হয়েছে এ ধরনের প্রকল্পে। সুফলভোগী হিসেবে সমাজসেবা অধিদপ্তরের দেওয়া তালিকায় থাকা ৩১ জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের একজন শুধু গ্রিনহাউস পেয়েছেন। তবে ব্যবহার করেন না। বিধবা বা স্বামী নিগৃহীত নারীদের এই প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা থাকলেও প্রশিক্ষণার্থীদের তালিকায় শিক্ষার্থী ও স্বচ্ছল ব্যক্তির পাশাপাশি রয়েছেন পুরুষও। দুস্থ, বিধবা, বেকার, প্রতিবন্ধী, হিজরাসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের নামে এসব দুস্কর্মে খোদার আরশ কি কাঁপছে? দুস্কর্মের হোতাদের কাছে তা খোদার আরশ দূরে থাক, তা কি চকি কাঁপার মতোও অপরাধ?
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন, ঢাকা।