দেশজুড়ে কন্যাশিশু নির্যাতনের একটা মহোৎসব চলছে। ৩ থেকে ১৪, যারা এখনো নিতান্তই শিশু। জীবন, যৌবন কিছু সম্পর্কেই জ্ঞান একেবারে সীমিত, যাদের পুতুল নিয়ে খেলার কথা, সেই তারাই এখন একশ্রেণির দুর্বৃত্তের হামলায় ক্ষত-বিক্ষত। শুধু তা-ই নয়, মৃত্যুর মতো ভয়াল পরিস্থিতির শিকার। অবশ্য কন্যাশিশু নির্যাতন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেই যে বিরাজমান তা নয়, সারা বিশ্বের পরিবেশে কোথাও শিশুকন্যার জীবনে কোনো সুবাতাস নেই।
চৌদ্দ শ’ বছর আগে আরবের জীবনব্যবস্থায়ও এমনই দৃশ্য ছিল। ইসলামের আবির্ভাবের আগের সময়কালকে বলা হতো ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’ অর্থাৎ অন্ধকার যুগ। সেই সময়কালে সদ্য জন্ম নেওয়া একটি কন্যাকে জীবন্ত কবর দিত তার জন্মদাতা জনক। আসন্ন প্রসবা জননীর কাছে একটি গর্ত খুঁড়ে রাখা হতো। আর সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুটি কন্যা হলে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে মাটিচাপা দিয়ে খুন করত পরিবারের পুরুষ সদস্য। সে হয়তো কন্যাটির পিতা, পিতামহ অথবা পিতৃব্য টাইপের কেউ হতো। বাংলাদেশের পাশের দেশটির নাম ভারত। ভারতবর্ষের আইন অনুযায়ী সেখানেও কন্যাশিশুর স্বাভাবিকভাবে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার নেই। জন্মের আগেই নির্ধারণ হয়ে যায় তার বাঁচা-মরার বিষয়টি। আলট্রাসনোর মাধ্যমে মায়ের পেটে থাকা একটি মানবভ্রূণ যখন কন্যাসন্তানের পরিচয় নিয়ে পৃথিবীতে আগমনের দিন গোনে, সেই অবস্থাতেই পরিবারের পুরুষ সদস্যরা সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলে তাকে শেষ করে দেওয়ার। আর এ-সংক্রান্ত খবরের অংশ হলো ভারতে প্রতিবছর মায়ের পেটে থাকা অবস্থাতেই ৫০ হাজার কন্যাসন্তানের ভ্রূণ খুন করা হয় শুধু পরিবারের পুরুষ সদস্যদের ইচ্ছানুযায়ী। বাংলাদেশ অবশ্য এতটা এগিয়ে যেতে পারেনি, তবে কন্যাশিশু নির্যাতনের দিক দিয়ে অনেক উন্নত বিশ্বের তালিকা অনুযায়ী এগিয়ে আছে দেশটি। তার কারণগুলোর ভেতরে অন্যতম হলো দারিদ্র্য, অশিক্ষা, কুশিক্ষা এবং সংসারে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার প্রভাব। একই সঙ্গে গ্রামীণ সমাজ-কাঠামোয় নারীর কোনো সম্মানজনক স্থান না থাকা, সেই সঙ্গে অর্থনৈতিক বিষয়েও নারীর কোনো ভূমিকা না থাকা। যদিও স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশে গার্মেন্ট শিল্পের প্রসার ঘটায় সমাজের অবহেলিত অংশ হিসেবে চিহ্নিত নিম্নবিত্ত পরিবারের নারী সদস্যদের সামনে একটি অর্থনৈতিক পরিবর্তনের দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে এবং এই সুযোগ গ্রহণ করে তারা নিজেদের জীবনেরও মোড় পরিবর্তনে বেশ বড় মাত্রার একটা ভূমিকাও পালন করার সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু সাধারণ পরিবারের একজন নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি অন্য মাত্রার আরও একটি সমস্যা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আর তা হলো সাংসারিক জীবনের প্রতি উপার্জনক্ষম নারীটির অন্য ধরনের এক অনীহা। এখন তারা আর মাথা নিচু করে মার খেতে রাজি নয়, আর ঠিক সে কারণেই যৌথ জীবনে ভাঙনের হার বাড়ছে। পুরুষও দুর্বিনীত হয়ে উঠছে। জৈবিক লালসা চরিতার্থ করার পাশাপাশি তাদের লক্ষ্য একটাইÑসময়ের সীমারেখা অতিক্রম করে যেকোনো উপায়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্ষমতার মসনদে টিকে থাকা। আর সে কারণেই যখন আওয়ামী লীগ সরকারের পেটোয়া বাহিনী কোনো অন্যায় অরাজকতায় জড়িয়ে পড়ত, ঠিক তখন সরকারের একেবারে উচ্চ পর্যায়ে আসীন ব্যক্তিটি নির্দ্বিধায় দাঁত কেলিয়ে বলতেন, ‘ছাত্রদল কোনো দোষ করলে মিডিয়া সেই খবর জানার ভান করে আর ছাত্রলীগের কোনো দোষ ছোট আকারের হলেও ব্যানার নিউজ করে পত্রিকাগুলো।’
পুলিশ সদর দফতরের তথ্যানুযায়ী, আওয়ামী লীগের শাসনামলের সময়কাল অর্থাৎ ২০১৯ থেকে ২০২৩-শুধু ওই সময়কালের ভেতরে দেশে ধর্ষণ ও নিপীড়নের ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছিল ৩৪ হাজার ৪৭০টি। আর তার ভেতরে শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে সাত হাজারের মতো। অবশ্য বর্তমান সময়কালে একেবারে নাবালিকা ধর্ষণসহ মৃত্যুর মতো ঘটনা ঘটছে, সেটা সত্য। তবে ওই সময় গৃহবধূ থেকে কিশোরী কেউই নিরাপদ ছিলেন না ছাত্রলীগ নামধারী হায়েনাদের হাতে। বিএনপিকে ভোট দেওয়ার অজুহাতে একাধিক সন্তানের জননীকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। বিগত সরকারের আমলে তনুর মতো এক তরুণ শিক্ষার্থী দেশের বিশেষ বাহিনীর কতিপয় সদস্যের দ্বারা ধর্ষিত হওয়ার পরে খুন হয়েছেন, এমন ঘটনায় দেশের ভেতরে তোলপাড় তুললেও সরকার দুর্বৃত্তদের বিচারে কোনো পদক্ষেপ নিতে এগিয়ে আসেনি। ফেনীর সোনাগাজী মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহানকে ২০১৯ সালের ১০ এপ্রিল তার নিজ প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ সিরাজুল ইসলামের প্ররোচনায় গায়ে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে মারার ঘটনায় সারা দেশের মানুষ স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল। সেই ঘটনাকেও ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কারণ এর পেছনেও আওয়ামী লীগের এক পাতিনেতা জড়িত ছিলেন। ঘটনাটায় দেশজুড়ে প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ায় ছাত্রীটির সঙ্গে শ্লীলতাহানির অভিযোগে অভিযুক্ত অধ্যক্ষকে তার কয়েকজন সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করা হয়। বিচারে নিম্ন আদালত ১৬ জনকে ফাঁসির দণ্ড দিয়েছিলেন। কিন্তু ঘটনার পরে ছয় বছরের বেশি সময় পার হওয়ার পরও শুধু উচ্চ আদালত ডেথ রেফারেন্স শুনানিতে আটকে দিয়েছেন বলে কথিত সেই সব অপরাধী বহাল তবিয়তে জেলে বসে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় আহার-নিদ্রা সুন্দরভাবেই চালিয়ে যাচ্ছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন মানিকের সাহস ছিল যেন ইতিহাসের আরেক অধ্যায়। ১৯৯৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ছাত্রী ধর্ষণের শততম বার্ষিকী উদ্্যাপনের ঘোষণা দিয়ে সে দেখিয়ে গেছে সরকারের ছত্রচ্ছায়ায় থাকলে বুকের পাটা কতটা বড় হয়। তার বিরুদ্ধেও তৎকালীন সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। একইভাবে ২০২০ সালের ২৪ পেপ্টেম্বর সিলেটের বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমসি কলেজের কতিপয় ছাত্রলীগের দুর্বৃত্তের সম্মিলিত আক্রমণের মুখে একজন নববিবাহিত তরুণী স্বামীর সামনেই নিজের সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন। এখানেও তৎকালীন সরকারের কোনো ভূমিকা পালনের খবর নেই। এ রকম আরও একটি ঘটনা ছিল রেইন ট্রি ধর্ষণ মামলা। স্বয়ং মহিলা বিচারক সময়ের দীর্ঘসূত্রতার অজুহাত খাড়া করে মামলাটি ডিসমিস করে দেন। পরে তৎকালীন প্রধান বিচারপতির হস্তক্ষেপে এবং দেশের ৮০ জন বুদ্ধিজীবীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সেই মহিলা বিচারপতির বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। ওইসব ঘটনা ছিল শেখ হাসিনার শাসনামলের প্রতিচ্ছবি। পুলিশের তথ্যমতে, আওয়ামী লীগের শেষ ছয় বছরে ধর্ষণ ও নিপীড়নের শিকার হয়েছে সাত হাজার কন্যাশিশু এবং মহিলাসহ নিপীড়িত মানুষের সংখ্যা ছিল ৪৩ হাজারের মতো। পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কন্যাশিশুর প্রতি পুরুষের লোভের পরিমাণটা বাড়া শুরু হয়েছিল এবং তারপর বিএনপির বিগত সাড়ে তিন মাসের সময়কালে সেই সর্বগ্রাসী লোভের পরিমাণ এখন এতটাই আকাশছোঁয়া দশায় উপনীত হয়েছে যে বিশ্ববিবেক একেবারে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছে।
গত মে মাসে ঢাকার মিরপুরে রামিসা নামের এক মাসুম কন্যাশিশু ধর্ষিত হওয়ার পর খুন হলো। ফুলের মতো একটি শিশুর কর্তিত মাথা বাথরুমের ভেতরে একটা বালতিতে রক্তের বন্যায় ভাসতে দেখে অনেকের বুকের ভেতর তোলপাড় তুলল, কী করে এতটা সাহস দেখাতে পারে মানুষ? যখন সাধারণ জনগণের পক্ষ থেকে দাবি উঠল দোষীকে প্রকাশ্য দিবালোকে ফাঁসি দেওয়ার, তখন সরকারের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, এটা মধ্যযুগ নয় যে প্রকাশ্যে ফাঁসি দিতে হবে। দেশে আইন আছে, সেভাবেই বিচার হবে। দেশে যে কী ধরনের আইন আছে-সেটা মানুষের বোধগম্যের বাইরের কোনো বিষয় নয়। মানুষ জানে আইন আছে ঠিকই এবং ভেতরে আইনের ফাঁকও আছে। আর সে কারণে সেই ফাঁক-ফোকরের ভেতর দিয়েই দিব্বি একজন চিহ্নিত আসামি বহাল তবিয়তে বেঁচে থাকতে পারে এবং থাকছেও। ঠিক সে কারণেই দোষী ব্যক্তিরা এতটা সাহস দেখাতে পারছে। এর পেছনের অন্যতম কারণ দেশে বিচারহীনতার কালচার। দোষীরা জানে, যেকোনো ফাঁক-ফোকর দিয়ে তারা ঠিকই বেরিয়ে যাবে। যদিও আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার অপরাধে মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। পাশাপাশি সোহেল রানাকে ৫ লাখ ও স্বপ্না আক্তারকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। বিচার শুরুর পর মাত্র ছয় কার্যদিবসে ৭ জুন রায় ঘোষণা করেন আদালত। রামিসা হত্যার এ রায় দেশের ইতিহাসে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এত স্বল্প সময়ে রায় ঘোষণা করা এটাই প্রথম। রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা। তিনি বলেন, আমরা প্রত্যাশিত রায় পেয়েছি। দ্রুত রায় কার্যকর চাই।
দেশজুড়ে অপরাধপ্রবণতার হার ক্রমেই বাড়ছে। আর তার শিকারে পরিণত হয়ে ৪ থেকে ১৪ বয়সের শিশুকন্যারা ধর্ষিত হয়ে মৃত্যুকোলে ঢলে পড়ছে প্রতিদিন। একেবারে আপনজনের কাছে ধর্ষিতা হওয়ার নজির বাংলাদেশে এতটাই বাড়ছে যে অবাক হওয়ার মতো ঘটনা হলো একজন পিতার কাছেও তার শিশুকন্যাটি আর কোনো অবস্থাতেই নিরাপদ নয়। এমনকি আপন নানা, আপন দাদা এবং আপন ভাইয়ের নামও উঠছে ধর্ষকের তালিকায়।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে পারিবারিক নির্যাতনে ৪৭টি কন্যাশিশু মৃত্যুবরণ করেছে। বাবার হাতে খুন হয়েছে, এমন কন্যাশিশুর নামও রয়েছে সেই তালিকায়। এর মধ্যে ৩৫টি শিশু রয়েছে, যাদের বয়স ছয় বছরের কম। এ এক ভয়ংকর দুঃসংবাদ জাতির জন্য। দুর্বৃত্তদের এ ধরনের কাজ করার পেছনে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ না থাকাটাই প্রধান কারণ বলে মনে করছেন অনেকেই। যদি প্রকাশ্যে ধর্ষকদের ফাঁসির ব্যবস্থা করত সরকার, তাহলে অপরাধের মাত্রা কমে যেত, সন্দেহ নেই। কিন্তু সরকার তেমন আইন করতে রাজি নয়।
এটা সত্যি, যেকোনো সরকারের জন্য তিন থেকে সাড়ে তিন মাস বেশি সময় নয়। বুঝতে বুঝতেই তো সময় চলে যায় সময়ের পথে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক সত্য হচ্ছে, এই অল্প সময়ের মধ্যেই মানুষের ভেতরে অন্য ধরনের একটা গুঞ্জন ক্রমেই মাথা তোলা শুরু করেছে, তা হলো ‘সরকার চালায় কে এবং কোন জায়গা থেকে?’ আসলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী খাল কাটা কর্মসূচি এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য কার্ড বিতরণের যে কাজ শুরু করেছেন, তা আমরা ছোট চোখে মূল্যায়ন করতে চাই না। দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে এসব কাজের দরকার ঠিকই আছে; তা সত্ত্বেও জনগণের মনোভাবকে বোঝার কাজটাও তার জন্য জরুরি। দরকার আইনের শাসন কায়েমের মধ্য দিয়ে মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা। আমরা গভীর আগ্রহ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আছি। তিনি কি বুঝতে পারছেন বিষয়টা?