শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ :

শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

​নারীর নিরাপত্তা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি

​নারীর নিরাপত্তা ও  সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি

বিজ্ঞাপন
একটি আধুনিক ও সভ্য সমাজের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি হলো সেখানে নারীর নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত। আজকের যুগে নারীরা মহাকাশ গবেষণা থেকে শুরু করে করপোরেট বিশ্ব, রাজনীতি কিংবা খেলাধুলা সব ক্ষেত্রেই নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিচ্ছেন। কিন্তু এই দৃশ্যমান অগ্রগতির আড়ালে একটি রুগ্্ণ বাস্তবতা এখনো আমাদের তাড়া করে ফেরে ‘নারীর সার্বিক নিরাপত্তা’। এই নিরাপত্তার বিষয়টি কেবল শারীরিক সহিংসতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি।

আমাদের সমাজে নারী নিরাপত্তার বিষয়টি এখনো ঘরের চার দেয়াল থেকে শুরু করে রাজপথ, কর্মক্ষেত্র এবং ডিজিটাল মাধ্যম-সবখানেই প্রশ্নের মুখে। প্রতিদিনের সংবাদপত্র খুললেই যৌন হয়রানি, পারিবারিক নির্যাতন, ধর্ষণ কিংবা সাইবার বুলিংয়ের মতো ঘটনার খবর চোখে পড়ে।

অনেকে মনে করেন, কঠোর আইন প্রণয়ন করলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়ে যাবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আইন হলো অপরাধের বিচার করার মাধ্যম, অপরাধের মানসিকতা তৈরি বন্ধ করার মাধ্যম নয়। যতক্ষণ না সমাজের প্রতিটি স্তরে নারীর প্রতি শ্রদ্ধা ও সমতার মানসিকতা তৈরি হচ্ছে, ততক্ষণ কেবল আইন দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব।

নারী নিরাপত্তার প্রধান বাধা হলো আমাদের আবহমানকালের গোঁড়া সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। সমাজে এখনো কোনো নারী হয়রানির শিকার হলে অপরাধীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর আগে ভিকটিম বা ভুক্তভোগী নারীর পোশাক, চলাফেরার সময় কিংবা আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়-যেটিকে মনস্তত্ত্বের ভাষায় বলা হয় ‘ভিকটিম ব্লেমিং’ (Victim Blaming)।
‘নারী কেন রাতে একা বাইরে ছিল?’ কিংবা ‘তার পোশাক কেমন ছিল?’-এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি অপরাধীর অপরাধকে সমর্থন করে এবং ভুক্তভোগীকেই উল্টো অপরাধীর জায়গায় দাঁড় করায়। এই মানসিকতা নারীর স্বাভাবিক চলাফেরা ও স্বাবলম্বী হওয়ার পথকে প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্ত করে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর রূপ বদলায়, বদলায় বাস্তবতা। কিন্তু বাহ্যিক অবকাঠামো, প্রযুক্তি আর জীবনযাত্রার মান যতটা দ্রুত এগিয়েছে, আমাদের সামাজিক চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি কি ঠিক ততটা বদলাতে পেরেছে? একটি ফ্লাইওভার কিংবা হাতে থাকা অত্যাধুনিক স্মার্টফোন আমাদের উন্নত সমাজের পরিচয় দিতে পারে, কিন্তু চিন্তার জট না খুললে সত্যিকারের সামাজিক অগ্রগতি অসম্ভব। তাই আজকের দিনে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন-আমাদের অসামাজিক ও সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন।

আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির সবচেয়ে বড় গলদ হলো ‘অন্যকে জাজ করার’ বা বিচার করার প্রবণতা। মানুষ হিসেবে প্রত্যেকের আলাদা সত্তা, পছন্দ এবং মতামতকে সম্মান জানানোর মানসিকতা আমরা এখনো পুরোপুরি রপ্ত করতে পারিনি। এর ফলেই সমাজে জন্ম নেয় বৈষম্য, হিংসা আর অসহিষ্ণুতা।

আমরা বড় হয়ে উঠি কিছু অদেখা নিয়মের বেড়াজালে। যেখানে মানুষের যোগ্যতা বিচার করা হয় তার পোশাক, গায়ের রং, পেশা কিংবা লিঙ্গ দিয়ে। যে সমাজে এখনো ব্যর্থতাকে অপরাধ হিসেবে দেখা হয়, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলা কিংবা আলাদা মতামত প্রকাশ করাকে ‘অসভ্যতা’ বলা হয়Ñবুঝতে হবে সেই সমাজের চিন্তার জগৎটা পক্ষাঘাতগ্রস্ত।

দৃষ্টিভঙ্গি বদলের সবচেয়ে বড় পাঠশালা হলো পরিবার। একটি শিশু পরিবারে যা দেখে, তা-ই শেখে। পরিবারে যদি জেন্ডার বৈষম্য, গৃহকর্মীকে অবমূল্যায়ন কিংবা অন্যের সমালোচনা করার চর্চা থাকে, তবে সেই শিশু বড় হয়ে একই মানসিকতার বাহক হয়।
এরপর আসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা। কেবল জিপিএ-৫ বা পুঁথিগত বিদ্যা অর্জন নয়, বরং একজন শিক্ষার্থীকে সংবেদনশীল, মানবিক এবং সামাজিক দায়িত্ববোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই হওয়া উচিত শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য।

রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা দু-জোড়া কৌতূহলী চোখ, ভিড় বাসে গা বাঁচিয়ে চলার এক নিঃশব্দ কসরত, কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিষাক্ত ট্রলিং-আমাদের সমাজে একজন নারীর জন্য এগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এগুলো তার নিত্যদিনের আতঙ্ক। বছরের পর বছর ধরে আমরা নারীর নিরাপত্তা বলতে বুঝেছি কয়েকটি নতুন আইন, রাতে বাড়ি ফেরার নির্দিষ্ট সময়সীমা কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি আসলেই সমস্যার মূলে হাত দিতে পেরেছি? আইন দিয়ে অপরাধীর সাজা হতে পারে, কিন্তু অপরাধ করার মানসিকতা তৈরি বন্ধ হয় কোথায়? নারীর নিরাপত্তার আসল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে আমাদের সমাজের গভীরে জমে থাকা অসামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের মধ্যে। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে অপরাধের শিকড়ে আঘাত করতে হবে, আর সেই শিকড়টি রয়েছে মানুষের ভাবনায়।
দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের প্রথম পাঠশালা হওয়া উচিত পরিবার। ছেলে ও মেয়েসন্তানকে সমানভাবে বড় করা এবং শৈশব থেকেই ছেলেদের শেখানো যে নারী কোনো ‘ভোগের বস্তু’ নয়, বরং একজন স্বাধীন মানবসত্তা।

পাঠ্যপুস্তকে লিঙ্গসমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং নৈতিক শিক্ষার চর্চা বাড়াতে হবে। বিদ্যালয় স্তর থেকেই সংবেদনশীলতা (Sensitivity) শিক্ষার অংশ হওয়া উচিত।
নাটক, সিনেমা ও বিজ্ঞাপনে নারীকে অবমূল্যায়ন করা বন্ধ করতে হবে। পুরুষের বীরত্ব আর নারীর অসহায়ত্বকে গ্ল্যামারাইজ না করে সমতার গল্প তুলে ধরতে হবে।

আইন ভাঙলে বা নারীকে হয়রানি করলে যে পার পাওয়া যায় না, তার কঠোর দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে, যাতে অপরাধীরা ভয় পায়। নারীর নিরাপত্তা কেবল নারীর নিজের কোনো ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি একটি পুরো জাতির মর্যাদা ও অগ্রগতির প্রশ্ন। অর্ধেক জনসংখ্যাকে নিরাপত্তাহীনতায় রেখে কোনো সমাজ বা দেশ প্রকৃত অর্থে এগিয়ে যেতে পারে না।

নারীর নিরাপদ চলাফেরা তার কোনো দয়া বা ভিক্ষা নয়, এটি তার মৌলিক অধিকার। আইন ও শাসনব্যবস্থার কঠোরতার পাশাপাশি আমাদের নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তা ও ভাষার পরিবর্তন আনতে হবে। যেদিন একজন নারী ভয়হীনভাবে দিন বা রাতের যেকোনো সময়ে স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারবেন, সেদিনই কেবল আমরা একটি সত্যিকারের সভ্য ও প্রগতিশীল সমাজ হিসেবে নিজেদের দাবি করতে পারব।

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz