কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বীহীন নির্বাচনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন পঞ্চমবারের মতো ক্ষমতায় আসার এক সপ্তাহের মাথায় রাজধানী মস্কোতে ভয়াবহ হামলা হলো। এতে নাগরিকদের প্রতি তাঁর দেওয়া নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি কার্যত ভেঙে পড়েছে। এটি রুশ নেতার নতুন মেয়াদের জন্য বড় আঘাত বলে মনে করা হচ্ছে।
পুতিন দাবি করেন, তাঁর কাছে জাতীয় নিরাপত্তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অথচ খোদ রাজধানীর বুকেই কনসার্ট হলে হামলায় প্রায় দেড়শ মানুষের প্রাণহানি ঘটল। আহত আরও দেড় শতাধিক। এ হামলা প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়েছে রাশিয়ার বিশাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা। খবর নিউইয়র্ক টাইমস ও আল-জাজিরার
গত সপ্তাহে মঞ্চায়িত নির্বাচন শেষে ৮৮ শতাংশ ভোটে প্রেসিডেন্ট হন পুতিন। রেকর্ডসংখ্যক ভোট পাওয়ার দাবি করে তিনি নিজের জাতি ও বিশ্বকে দেখাতে চেয়েছেন, তাঁর দৃঢ় নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে রাশিয়া। অবশ্য, দেশটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলেকজান্ডার কাইনেভ বলেছেন, পুতিন এই আক্রমণ দেখে অন্ধ হয়ে গেছেন বলে মনে হচ্ছে। কারণ, ভয়াবহ এই হামলার পর জাতির সামনে হাজির হতে তাঁর ১৯ ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছে।
ইসলামিক স্টেট (আইএস) হামলা চালানোর দায় স্বীকার করলেও পুতিন তাঁর ভাষণে এ বিষয়ে কিছুই বলেননি। বরং রুশ নেতা ইঙ্গিত দেন, ইউক্রেন এই ট্র্যাজেডির পেছনে জড়িত। যদিও তাঁর এই অভিযোগকে অর্থহীন বলে উল্লেখ করেছে ইউক্রেন। মার্কিন কর্মকর্তারাও বলছেন, কনসার্ট হামলায় ইউক্রেনের জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ নেই।
সন্ত্রাসী হামলা হতে পারে বলে যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কবার্তা পেলেও তা পুতিন দৃশ্যত উপেক্ষা করেছেন। সতর্কতা ও নিরাপত্তা জোরদার করার পরিবর্তে তিনি সেগুলোকে ‘উস্কানিমূলক বক্তব্য’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। গত মঙ্গলবার রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা এফএসবিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পশ্চিমা সতর্কতার কথা উল্লেখ করে পুতিন বলেছিলেন, ‘এগুলো সম্পূর্ণ ব্ল্যাকমেইল এবং আমাদের সমাজকে ভয় দেখানো ও অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা।’
অবশ্য, হামলার পর নির্বাসিত কয়েক সমালোচক পুতিনের ওই বক্তব্যকে তুলে ধরে বলেছেন, রাশিয়ার প্রকৃত নিরাপত্তার বিষয়টিতে প্রেসিডেন্ট গুরুত্বই দিচ্ছেন না। তাদের অভিযোগ, সন্ত্রাসীদের হাত থেকে সমাজকে নিরাপদ রাখার পরিবর্তে পুতিন তাঁর বিশাল নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যবহার করছেন ভিন্নমতাবলম্বী, সাংবাদিকসহ বিরোধীদের দমনে।
আইএস হামলার দায় স্বীকারের পর এখন এই নিয়ে দেশটিতে চলছে নানা বিশ্লেষণ। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের উপস্থাপক ওলগা স্কাবেয়েভা টেলিগ্রামে লিখেছেন, ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দারা আততায়ীদের খুঁজে পেয়েছে ‘যারা দেখতে আইএসআইএসের মতো হবে, তবে আইএসআইএস নয়।’ রাষ্ট্র পরিচালিত আরটি টেলিভিশন নেটওয়ার্কের সম্পাদক মার্গারিটা সিমোনিয়ান লিখেছেন, ইসলামিক স্টেটের দায় স্বীকারের প্রতিবেদনগুলো মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর মৌলিক কাজে পরিণত হয়েছে।
রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত চ্যানেল ওয়ানে প্রাইম-টাইম টকশোতে রাশিয়ার সর্বাধিক পরিচিত কট্টর রক্ষণশীল মতাদর্শী আলেকজান্ডার ডুগিন ঘোষণা করেন, এই আক্রমণে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত। ডুগিন বলেন, ‘এটি পুতিনের প্রতি আস্থা কমানোর চেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়। এই ঘটনা রুশদের দেখিয়েছে, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে পুতিনের যুদ্ধের পেছনে ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ নেই।’
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কাইনেভ বিশ্বাস করেন, অনেক রুশ নাগরিক এখন ভয়ের মধ্যে আছেন। কারণ শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার করা সব সময়ই পুতিনের রাজনৈতিক সুবিধার ট্রাম্পকার্ড।
এদিকে, হতাহতের ঘটনায় রাশিয়ায় গতকাল শোক দিবস পালিত হয়েছে। এদিক অর্ধনমিত রাখা হয় দেশটির জাতীয় পতাকা। মস্কোর বিভিন্ন স্থানে ফুল দিয়ে ও মোমবাতি জ্বালিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন রুশরা।
কনসার্ট হলের উদ্ধার কাজ শেষ হলেও এখন ধ্বংসস্তূপ থেকে অনুসন্ধান কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন মস্কো অঞ্চলের গভর্নর আন্দ্রেই ভোরোবিওভ। তিনি বলেছেন, উদ্ধারকারীরা অডিটোরিয়ামের বিশাল স্তর পরিষ্কার করেছে। এখন মরদেহ শনাক্ত করা হচ্ছে। হাসপাতালে ভর্তি ১০৭ জনকে বাঁচাতে লড়াই করছেন চিকিৎসকরা।
ঠিকানা/ছালিক