শীর্ষস্থানীয়সহ বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের পদাধিকারীদের জামিনে মুক্তির ঘটনা স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ নয় বলেই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। এর পেছনে সরকারের কৌশলও স্পষ্ট নয়। বিরোধীরা মুক্ত জীবনে ফিরে আসার সুযোগ নিচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা করছে। তবে এবার আর আগেকার মতো উচ্ছৃঙ্খল, উগ্রবাদী কর্মসূচি না নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অহিংস, শান্তিপূর্ণ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা তাদের রাজনীতিতে, কর্মসূচিতে দেশের মানুষকে সম্পৃক্ত করার নতুন প্রয়াস নিচ্ছে।
উচ্চ পর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে, বিএনপি নেতাদের ব্যাপক সংখ্যায় মুক্তির ঘটনা কেবল প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকারের উদারতাই নয়, রাজনৈতিকভাবে শর্তহীনও নয়। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, মোয়াজ্জেম হোসেন আলালসহ কেন্দ্রীয় বেশ কয়েকজন নেতা জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। রাষ্ট্রপক্ষ কর্তৃক তাদের জামিনের বিরোধিতা না করার পরিপ্রেক্ষিতেই তারা আদালত থেকে মুক্তি পান। প্রধান বিচারপতির বাসভবনে, হাসপাতালে, অ্যাম্বুলেন্সে হামলা ও ভাঙচুর, পুলিশকে পিটিয়ে হত্যা, সরকারি ও প্রাইভেট যানবাহন, সম্পদ ধ্বংস, ট্রেনে-বাসে অগ্নিসংযোগ, বোমাবাজি, নিরীহ মানুষের প্রাণহানির মতো মারাত্মক অপরাধের আসামি হওয়ার পরও সরকারপক্ষ কর্তৃক জামিনে বিরোধিতা না করার ঘটনাও তাৎপর্যপূর্ণ।
সরকারপক্ষের তেমন কোনো বিরোধিতা ছাড়াই বিএনপির নেতাদের মুক্তির ঘটনা রাজনৈতিক মহল, সাধারণ মানুষের মধ্যেও কিছুটা স্বস্তি এনেছে। অনেকের মধ্যে একটা ভীতিও কাজ করছে। কিছুদিন পরই বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের বোমাবাজি, অগ্নিসন্ত্রাসের শিকার হন কি না-এমন শঙ্কাও রয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পরম বিশ্বস্ত আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ মুক্তিপ্রাপ্ত কোনো নেতাই উগ্র আক্রমণাত্মক ভাষায় কথা বলছেন না। তাদের এই সংযত আচরণ ও কথাবার্তা রাজনৈতিক মহলে কিছুটা হলেও স্বস্তি, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, সুবাতাস বইয়ে দিতে অবদান রাখছে। সহনশীল মনোভাব দেখিয়ে দেশে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পক্ষে সরকার। বিভিন্ন অনাকাক্সিক্ষত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কিছুদিন পর দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির প্রয়াস পেতে পারে বিরোধীদলীয় কোনো কোনো মহল। বিএনপির নেপথ্যের মদদদাতা হিসেবে রাজনৈতিক মহলে চিহ্নিত পশ্চিমা আধিপত্যবাদী শক্তি বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু, গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি ও তা বজায় রাখার পক্ষে। এখানে তাদের বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে এবং আসছে। এ ব্যাপারে বিএনপির ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগীদের কাছ থেকে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, যা এড়িয়ে চলা বা হালকা করে দেখার সুযোগ নেই বিএনপির নেতাদের। এর ব্যতিক্রম হলে সাময়িক স্থগিত রাখা মামলা আবার সচল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল অবশ্য আগামী সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিচলিত নয়, চিন্তিতও নয়। তারা মনে করেন, ম্রিয়মাণ মাঠের নেতাকর্মীদের নতুন করে উজ্জীবিত করাই বিএনপির নেতাদের উদ্দেশ্য। প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকার উৎখাতের এক দফা ঘোষণা করে বিএনপির নেতাদের ভূমিকা তৃণমূলের নেতাকর্মীদের, সমর্থকদেরও দারুণভাবে হতাশ করে। প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকারকে টেনে নামানোর এবং যেকোনো মূল্যে নির্বাচন প্রতিহত করার মতো চরম অগণতান্ত্রিক হুংকার দেওয়ার পর নির্বাচনের আগেই নেতাদের পুরোপুরি চুপসে যাওয়ার ঘটনা অবাক বিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করে তারা।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারবিরোধী অবস্থান বিএনপির নেতাকর্মীদের দারুণভাবে উজ্জীবিত করে। নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ববর্তী অবস্থান থেকে পিছুটান এবং সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় উন্নয়নের অংশীদারত্ব অধিকতর জোরালো করার ঘোষণা ও এ-সংক্রান্ত কার্যক্রম রাজনৈতিক পরিবেশ-পরিস্থিতি, বিদেশিদের প্রত্যাশা বিবেচনায় রেখেই বিএনপি দ্রব্যমূল্য, দুর্নীতি, অনিয়ম, জনদুর্ভোগ নিয়ে কর্মসূচি দেবে। তাদের ইস্যুভিত্তিক কর্মসূচিতে সরকার, সরকারি দলও বাধা হবে না। তবে তা হতে হবে শান্তিপূর্ণ। এর ব্যতিক্রম হলে কঠোর পদক্ষেপ নেবে সরকার।