Thikana News
৩০ অগাস্ট ২০২৫
  1. ই-পেপার
  2. চলতি সংখ্যা
  3. বিশেষ সংখ্যা
  4. প্রধান সংবাদ
  5. আমেরিকার অন্দরে
  6. বিশ্বচরাচর
আমেরিকা শনিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৫

মাগফিরাতের অধ্যায়ে সাওম পালনকারীদের করণীয়

মাগফিরাতের অধ্যায়ে সাওম পালনকারীদের করণীয়
সর্বশ্রেষ্ঠ নবী-রাসুল মুহাম্মদ (সা.) এর উম্মতদের কাছ থেকে পবিত্র রমজানের রহমতের অধ্যায় বিদায় নিচ্ছে ২০ মার্চ বুধবার এবং মাগফিরাতের মহিমান্বিত অধ্যায় সূচিত হচ্ছে ২১ মার্চ বৃহস্পতিবার। বলার অপেক্ষা রাখে না, মাহে রমজানের দিবারাত্রির প্রতিটি মুহূর্তই অতীব গুরুত্বপূর্ণ। যাহোক, মাগফিরাত প্রসঙ্গে আদি পিতা হজরত আদম (আ.) এবং আদি জননী বিবি হাওয়ার (আ.) প্রসঙ্গটি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য। পবিত্র কোরআনের প্রথম অধ্যায়ের সুরা বাকারার ৩০ থেকে ৩৫ নং আয়াতগুলোতে মাটির তৈরি আদমকে আগুনের তৈরি শয়তানের সেজদা না করার আল্লাহর আদেশ সরাসরি প্রত্যাখ্যান ও অভিশপ্ত হওয়ার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে প্রতিশোধপরায়ণ শয়তান নানাভাবে আদম (আ.) ও হাওয়াকে (আ.) প্ররোচিত করে আল্লাহর আদেশ লঙ্ঘন ও নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করাতে সাফল্য অর্জন করেছিল। চারিত্রিক দৃঢ়তার অভাবে ও শয়তানের হাতছানিতে প্রলুব্ধ হয়ে নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খাওয়ার শাস্তিস্বরূপ আদম-হাওয়ার শরীর থেকে বেহেশতি লেবাস খসে পড়ল, পরস্পরের গোপনীয় অঙ্গ উন্মুক্ত হয়ে গেল, তারা গাছের পাতা-লতার সাহায্যে লজ্জা নিবারণ করলেন এবং বেহেশত থেকে বহিষ্কৃত হয়ে মাশরিক ও মাগরিবে নিক্ষিপ্ত হলেন। এ পর্যায়ে হজরত আদম (আ.) এবং বিবি হাওয়া (আ.) অনুশোচনাগ্রস্তচিত্তে কৃত অপরাধের জন্য পরম করুণাময় আল্লাহর নিকট সানুনয় মিনতি জানাতে লাগলেন। নির্জন বেলাভূমিতে একাধারে কয়েক শ বছর নিজেদের অপরাধ মার্জনার জন্য পরম করুণাময় আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করলেন। অবশেষে সর্বশ্রেষ্ঠ নবী-রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর অছিলায় দয়াময় আল্লাহ তায়ালা আদি পিতা আদম (আ.) ও আদি মাতা হাওয়ার (আ.) অপরাধ মার্জনা করলেন এবং সুদীর্ঘ বিরহ-বিচ্ছেদের পর মহান আল্লাহ আরাফার ময়দানে তাঁদের পুনর্মিলন ঘটালেন।

স্মর্তব্য, উদ্ধত শয়তান আল্লাহর আদেশ অমান্য করার পর বিশ^ স্রষ্টার দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা না করে ঔদ্ধত্যের পরিচয় দিয়েছিল এবং চির অভিশপ্ত শয়তানে পরিণত হয়েছিল। পক্ষান্তরে চারিত্রিক দৃঢ়তার অভাবে ও শয়তানের মায়া মরীচিকার হাতছানিতে প্রলুব্ধ হয়ে হজরত আদম (আ.) এবং বিবি হাওয়া (আ.) নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খেয়ে আল্লাহর আদেশ অমান্য করেছিলেন। আর ওই অনিচ্ছাকৃত ব্যভিচারের শাস্তি থেকে মুক্তির জন্য হজরত আদম (আ.) এবং বিবি হাওয়া (আ.) একাধারে শত শত বছর অশ্রুসিক্ত নয়নে ও অনুশোচনাগ্রস্তচিত্তে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। পরিশেষে আল্লাহর হাবিব হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর অছিলায় দয়াময় আল্লাহ তায়ালা তাঁদের মাগফিরাত বা ক্ষমা করলেন এবং হজরত আদমকে (আ.) নবুয়তিও দান করলেন। হজরত আদম (আ.) এবং বিবি হাওয়ার (আ.) কৃত অপরাধের জন্য মহান আল্লাহর কাছ থেকে অব্যাহতি বা মাগফিরাত বা ক্ষমালাভের ঘটনা বস্তুত আদম সন্তান হিসেবে আমাদের, বিশেষত ইসলামের মৌলিক আদর্শচ্যুত মুসলমানদের জন্য একটি অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে।

পাপের সাগরে হাবুডুবু খাওয়া সত্ত্বেও আখেরি নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর উম্মত হিসেবে আমরা প্রত্যেকে বেহেশত লাভের কামনা করি। আবার মৃত্যুযন্ত্রণা-পরকালীন আজাব এবং গজব থেকেও মুসলমানমাত্রই মুক্তি প্রার্থনা করি। তবে নিজেদের রাশি রাশি পাপাচারের দায় থেকে আল্লাহর মাগফিরাত এবং বিশ্বপ্রতিপালক মহান আল্লাহর অপরিসীম রহমত ছাড়া আমাদের কোনো কামনা-বাসনাই হালে পানি পাবে না। অথচ মাহে রমজানের রহমতের অধ্যায়টুকু আমরা কতটুকু কাজে লাগিয়েছি তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করলে সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতার পাল্লাই ভারী হবে। তা সত্ত্বেও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী-রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর উম্মত হিসেবে আমরা মহান আল্লাহর মাগফিরাত কামনা করছি।

মাগফিরাত প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের কয়েকটি সুস্পষ্ট ঘোষণার প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। সুরা হাশরের একটি আয়াতে বলা হয়েছে, ইন্নাল্লাহা শাদীদুল ইক্বাব (আল্লাহ শাস্তিদানে অত্যন্ত কঠোর)। আর সুরা মায়েদার একটি আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ওয়াল্লাহু আজিজুন জুনতিকাম (আর আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী প্রতিশোধগ্রহণকারী)। আবার পবিত্র কোরআনের অন্যত্র জাহান্নামকে বসবাসের জন্য অত্যন্ত নিকৃষ্ট স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এভাবে পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন সুরা ও আয়াতে আল্লাহর অপরিসীম রহমতের পাশাপাশি কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারিও উচ্চারিত হয়েছে।

পবিত্র কোরআনে গিবত বা পরচর্চাকে জেনা বা ব্যভিচারের চেয়ে এবং ফিতনা বা সংঘাতকে কাতেল বা হত্যার চেয়েও ভয়াবহ পাপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অনস্বীকার্য যে সাম্প্রতিক মুসলিম বিশ্বে এবং পারিবারিক-সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনে উভয় অপরাধই স্থায়ী পালঙ্ক পেতে বসেছে। পরচর্চা বা গিবত ছাড়া আমাদের ভুক্ত খাদ্য হজম হয় না আর ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষ ও রক্তক্ষরণে বর্তমান মুসলিম বিশ্ব অচল। প্রতিদিনই নিত্য-নতুন সংঘাতে মুসলিম বিশ্ব জর্জরিত হচ্ছে এবং ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদের মতানৈক্য নিত্য-নতুন ফিতনা বা বিভেদ সৃষ্টির ক্ষেত্রে ইন্ধন জোগাচ্ছে। তাই পবিত্র রমজানের মাগফিরাতের অধ্যায়ই ইসলামের আদর্শচ্যুত মুসলমানকে গিবত-ফিতনাসহ সকল অপরাধের হাত থেকে নিষ্কৃতি দিতে পারবে বলে আমাদের বিশ্বাস, ইনশা আল্লাহ।

সাওম মূলত মুসলমানদের আত্মবিশ্লেষণের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির পথ নির্দেশ করে থাকে। আত্মশুদ্ধির অপরিহার্য শর্ত হচ্ছে যাবতীয় পাপ ও অন্যায় থেকে মুক্তিলাভের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও অভিপ্রায়। অন্যের কাজে নাক না গলিয়ে নিজের কর্মকাণ্ডের সঠিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সঠিক পথে চলার বজ্রকঠোর সংকল্প। পাপপঙ্কিল সমাজব্যবস্থা থেকে নিজেকে এবং নিজের স্বজনদের সুরক্ষার দুর্মর-দুর্দমনীয় বাসনা ও সিদ্ধান্ত। এ ক্ষেত্রে পরচর্চাকে সর্বাংশে বর্জন করতে হবে। পবিত্র রমজানে অতিভোজনের স্থলে অন্যদের খাওয়ানোর তাগিদ রয়েছে। তাই মুখরোচক ইফতারি এবং রসনাপূজা পরিহার করে ব্যয় সাশ্রয়ের মাধ্যমে সঞ্চিত অর্থে দুঃখীদের দুর্দশা লাঘবে সক্রিয় হতে হবে। পরচর্চা, বাকচাতুর্য বা মিথ্যার আশ্রয়ে প্রশংসা কুড়ানো ও সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভের ঘৃণ্য তৎপরতা সর্বাংশে বর্জন করতে হবে এবং মনে মনে আল্লাহকে স্মরণ করতে হবে। সদা সর্বদা আস্তাগফিরুল্লাসহ বিভিন্ন তসবি তেলাওয়াত করতে হবে।

যাহোক, ইন্দ্রিয়ের তাড়নায় এবং ষড়রিপু ও শয়তানের প্ররোচনায় আমরা ইচ্ছাকৃতভাবে বা অনিচ্ছায় অসংখ্য পাপাচারে জড়িয়ে পড়ি। বর্তমানে অপরের সম্পদ লুণ্ঠনের সর্বগ্রাসী ক্ষুধা মানুষকে নরখেকো বাঘের মতো তাড়া করছে। মনুষ্যত্ববোধের নির্বাসন এবং দানবীয় শক্তির উত্থানের ফলে গোটা মুসলিম বিশ^ পাপসাগরে নিমজ্জিতপ্রায়। পররাজ্য দখলের ঘৃণ্য প্রচেষ্টার ফলে বিশ্বজুড়ে বারুদের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। অহর্নিশ রক্ত ঝরছে গাজা উপত্যকায়। বাস্তুহারা ফিলিস্তিনিদের আহ্বানে সাড়া দেওয়ার কেউ নেই গোটা বিশ্ব-সংসারে। জগৎজুড়ে ধনী-নির্ধনের ব্যবধান দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিটি দেশের অভ্যন্তরে মাৎস্যন্যায় অবস্থা বিরাজ করছে। মূলত, স্বার্থের ঘেরাটোপে আচ্ছাদিত বর্তমান বিশ্বচরাচরে ইসলামের মৌলিক আদর্শচ্যুত মুসলমানদের পার্থিব যাবতীয় অপরাধমুক্তির সুবর্ণ সুযোগ দান করে পবিত্র রমজানের মাগফিরাতের অধ্যায়। বিশ্ববাসীর শাশ্বত জীবনবিধান পবিত্র কোরআনে পরম করুণাময় আল্লাহ বান্দার অপরাধ মার্জনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাই নিজেদের যাবতীয় অপরাধের জন্য অনুশোচনাগ্রস্তচিত্তে এবং তওবা-ইস্তাগফারসহ আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করলে আমরা বিশ্ববিধাতার মাগফিরাত প্রত্যাশা করতে পারি। কারণ আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকারকারী কাফির, আল্লাহর সঙ্গে অংশীদারকারী এবং বান্দার হক আত্মসাৎকারী ছাড়া অন্য সকল অপরাধীকে ক্ষমা প্রদানের প্রতিশ্রুতি মহান বিশ্বপ্রতিপালক পবিত্র কোরআনে প্রদান করেছেন।
স্মর্তব্য, আমরা সর্বক্ষণ নিজেদের পোষ্যদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছি। অথচ যেসব বাবা-মা নিজেদের সর্বত্র উজাড় করে দিয়ে আমাদের মানুষ করেছেন এবং লোকান্তরিত হয়েছেন, তাদের কথা স্মরণ করার সুযোগ তেমন হয় না। নিকট ভবিষ্যতে আপনি এবং আমাকেও একই পরিণতি বরণ করতে হবে। সর্বাধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আশীর্বাদধন্য আমাদের সন্তান-সন্ততিরা তাদের পোষ্যদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এতই ব্যস্ত থাকবে যে আপনি আর আমাকে স্মরণ করা সময়ের অপচয় হিসেবে গণ্য হবে। তাই জীবদ্দশায় নিজ নিজ পরকালীন যাত্রাপথ সুগম করার অনুরোধ রইল।

উপসংহারে, গোনাহর পাহাড় শিরোধার্য করে আমরা আল্লাহর মাগফিরাত লাভের প্রত্যাশায় পবিত্র রমজানের বাদবাকি সময় ইবাদত-বন্দেগিতে কাটাতে সক্রিয় থাকব। গিবত বা পরচর্চা, ফিতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি সর্বাংশে বর্জন করব; ধৈর্য ধারণে সচেষ্ট হব; অন্যের প্রতি অহেতুক বিষোদ্গার কিংবা অপরের অমঙ্গল কামনা পরিহার করব এবং নিজেরা মুখরোচক খাবার গোগ্রাসে গেলার স্থলে রোজাদার ও ক্ষুধার্তদের আপ্যায়নে সক্রিয় হব। আহারে-বিহারে ও আচরণে যথাসাধ্য কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে সাশ্রয়কৃত অর্থে গরিব-দুঃখীর দুর্দশা লাঘবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেব। হে গাফুরুর রাহিম, লাতিফুল খাবির, তুমি আমাদের আহ্বানে সাড়া দাও। আমিন!

লেখক : সহযোগী সম্পাদক, ঠিকানা, নিউইয়র্ক।
১৯ মার্চ ২০২৪

কমেন্ট বক্স