শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ :

শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন
১০০ দিনে উচ্চাকাঙ্খা বনাম বাস্তবতা

বিতর্কে ঘেরা জোহরান মামদানি প্রশাসন

বিতর্কে ঘেরা জোহরান মামদানি প্রশাসন

বিজ্ঞাপন
নিউইয়র্ক সিটির ইতিহাসে এক নতুন রাজনৈতিক ধারার সূচনা করেছিলেন জোহরান মামদানি। তরুণ, প্রগতিশীল এবং স্পষ্ট মতাদর্শ নিয়ে ক্ষমতায় আসা এই মেয়র তার প্রথম ১০০ দিনেই সিটিবাসীর প্রত্যাশা, সমর্থন এবং সংশয়ের এক জটিল সমীকরণের মুখোমুখি। কুইন্সের ম্যাসপেথে অবস্থিত নকডাউন সেন্টারে দেওয়া ‘১০০ ডেজ অ্যাড্রেস’ সেই সমীকরণেরই এক রাজনৈতিক ব্যাখ্যা- যেখানে তিনি তুলে ধরেছেন অগ্রগতি, সীমাবদ্ধতা এবং সামনে এগোনোর রোডম্যাপ। এই ভাষণ শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং নিজের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি   
কতটা বাস্তবায়নের পথে, জনসমক্ষে তার একটি হিসাব দেওয়ার প্রচেষ্টা। যদিও অনুষ্ঠানটি সরাসরি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ছিল না, তবু লাইভ সম্প্রচারের মাধ্যমে এটি সিটিজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
ভাষণের আগেই হেল’স কিচেনে শ্রমিকদের একটি বড় সমাবেশে অংশ নেন মেয়র। সেখানে তার পাশে ছিলেন মার্কিন প্রগতিশীল রাজনীতির অন্যতম প্রতীক বার্নি স্যান্ডার্স এবং অ্যাসোসিয়েশন অব ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টসÑসিডব্লিউএর নেতৃত্ব। এই উপস্থিতি শুধু প্রতীকী ছিল না, বরং মামদানির রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতি একটি স্পষ্ট বার্তা, যেখানে শ্রমিক অধিকার, ন্যায্য মজুরি এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাসই কেন্দ্রীয় ইস্যু।
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সিটির বাস্তব সমস্যাগুলোর দিকে সরাসরি নজর দিয়েছেন বলে দাবি করেন মেয়র। ব্রঙ্কসে অবৈধ বর্জ্য অপসারণে অংশগ্রহণ এবং নিউইয়র্ক সিটি ডিপার্টমেন্ট অব হাউজিং প্রিভেনশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সঙ্গে সিসা দূষণ পরিদর্শন তার প্রশাসনের ‘গ্রাউন্ড-লেভেল’ উপস্থিতির একটি বার্তা বহন করে। এটি একদিকে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে সামনে আনে, অন্যদিকে সিটির অবহেলিত এলাকাগুলোর প্রতি নজর দেওয়ার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিকেও দৃশ্যমান করে।
তবে এই ১০০ দিনের সবচেয়ে বড় এবং তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে সামনে এসেছে সর্বজনীন চাইল্ডকেয়ার কর্মসূচি। দুই বছর বয়সী শিশুদের জন্য এই উদ্যোগ চালু হলে হাজার হাজার পরিবার সরাসরি উপকৃত হবে। সিটি প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি শিশুর জন্য বছরে প্রায় ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত ব্যয় কমতে পারেÑযা মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক স্বস্তি এনে দেবে।
মামদানির বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে আসে, বর্তমান চাইল্ডকেয়ার ব্যবস্থা কর্মজীবী বাবা-মায়েদের জন্য কতটা চাপের। সময়মতো সন্তানকে নিতে না পারার দুশ্চিন্তা, অতিরিক্ত খরচ এবং কর্মজীবন ও পারিবারিক দায়িত্বের দ্বন্দ্ব- এসব বাস্তব সমস্যার সমাধান করতেই এই উদ্যোগ। তবে এখানেই শেষ নয়। তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে থাকা ভাড়া স্থিতিশীল রাখা (ৎবহঃ ভৎববুব), বিনামূল্যে বাসসেবা চালু করা, শ্রমিকদের জন্য উচ্চতর মজুরি নিশ্চিত করা- এসব বিষয় এখনো পূর্ণ বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। এর পেছনে প্রধান বাধা হিসেবে উঠে এসেছে অর্থায়ন সংকট, রাজ্য সরকারের অনুমোদন এবং প্রশাসনিক কাঠামোর জটিলতা।
এই বাস্তবতাই এখন মামদানির প্রশাসনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। কারণ, রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় প্রতিশ্রুতি দেওয়া তুলনামূলক সহজ হলেও তা বাস্তবায়ন করা অনেক বেশি জটিলÑবিশেষ করে, নিউইয়র্কের মতো উচ্চ ব্যয় ও বহুমাত্রিক প্রশাসনিক কাঠামোর শহরে।
এদিকে জনমতের দিক থেকেও চিত্রটি পুরোপুরি একমুখী নয়। সাম্প্রতিক জরিপে তার অনুমোদন হার প্রায় ৪৮ শতাংশে অবস্থান করছে- যা একদিকে শক্তিশালী সমর্থনের ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের সংশয়ও প্রকাশ করে। সিটির একটি অংশ তার সাহসী নীতিকে স্বাগত জানাচ্ছে, আবার অন্য অংশ অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে।
সমালোচকদের প্রধান আপত্তি ন্যূনতম মজুরি ও করনীতিকে ঘিরে। তাদের যুক্তি, অতিরিক্ত মজুরি বৃদ্ধি ব্যবসার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে, যার ফলে কর্মসংস্থান কমতে পারে বা ব্যবসা অন্যত্র সরে যেতে পারে। অন্যদিকে মামদানির সমর্থকেরা বলছেন, বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা ছাড়া অর্থনৈতিক ভারসাম্য সম্ভব নয়।
এই বিতর্ক শুধু নীতিগত নয়, বরং আদর্শগতও। একদিকে রয়েছে সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, অন্যদিকে রয়েছে বাজার অর্থনীতির বাস্তবতা ও প্রতিযোগিতার চাপ। নিউইয়র্ক এখন এই দুই ধারার সংঘাতের এক জীবন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, জোহরান মামদানি নিউইয়র্ক সিটির প্রথম মুসলিম মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যা শহরের বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। তার উত্থান নতুন প্রজন্মের রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করে, যেখানে বৈচিত্র্য, অন্তর্ভুক্তি এবং সামাজিক ন্যায্যতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে প্রথম ১০০ দিন মামদানির জন্য ছিল একটি ‘সেটিং দ্য টোন’ পর্যায়, যেখানে তিনি তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার করেছেন, কিছু প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন শুরু করেছেন, আবার অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতার কঠিন দেয়ালের মুখোমুখিও হয়েছেন। আগামী দিনগুলোই নির্ধারণ করবে, এই উচ্চাকাক্সক্ষী নীতিগুলো নিউইয়র্কের জন্য বাস্তব পরিবর্তন বয়ে আনবে, নাকি অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপে ধীর হয়ে যাবে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিতÑজোহরান মামদানির প্রতিটি পদক্ষেপ এখন শুধু একটি সিটির নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।
প্রথম ১০০ দিনেই আবাসনে কড়াকড়ি : ভাড়াটিয়া সুরক্ষায় মেয়রের অভিযান নিউইয়র্ক সিটির তীব্র আবাসন সংকট মোকাবিলায় প্রথম ১০০ দিনেই দৃঢ় ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন মেয়র জোহরান মামদানি। ভাড়াটিয়াদের অধিকার রক্ষা, অবহেলাকারী বাড়িওয়ালাদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং সাশ্রয়ী আবাসন সম্প্রসারণে তার প্রশাসনের নেওয়া উদ্যোগ ইতোমধ্যেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। আইনি পদক্ষেপের ফলে শহরজুড়ে ছয় হাজারের বেশি অ্যাপার্টমেন্টের বাসিন্দারা সরাসরি উপকৃত হয়েছেন।
মেয়র মামদানি বলেন, আমরা একটি গুরুতর আবাসন সংকটের মধ্যে রয়েছি। নিউইয়র্কবাসী বিলম্ব বা অর্ধেক সমাধান মেনে নিতে পারে না। প্রথম দিন থেকেই আমরা ভাড়াটিয়াদের পাশে দাঁড়িয়েছি, দুর্নীতিগ্রস্ত বাড়িওয়ালাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি এবং সবার জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সাশ্রয়ী বাসস্থান নিশ্চিত করতে কাজ শুরু করেছি। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই মেয়র নির্বাহী আদেশে মেয়রস অফিস টু প্রটেক্ট টেন্যান্টস পুনরুজ্জীবিত করেন এবং অভিজ্ঞ ভাড়াটিয়া অধিকারকর্মী সিএ ওয়েভারকে এর পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেন। তার নেতৃত্বে প্রশাসন পাঁচটি বরোজুড়ে রেন্টাল রিপ-অফ শুনানির আয়োজন করে, যেখানে ১ হাজার ৬০০ এরও বেশি ভাড়াটিয়া সাক্ষ্য প্রদান করেন।
সংস্থার ডেপুটি মেয়র ফর হাউজিং অ্যান্ড প্ল্যানিং লায়লা বোজোর্গ বলেন, প্রথম ১০০ দিনেই আমরা হাজারো নিউইয়র্কবাসীর জন্য তাৎক্ষণিক স্বস্তি নিশ্চিত করেছি এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের ভিত্তি স্থাপন করেছি।
প্রশাসনের নেওয়া উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে-পিনাকল গ্রুপের মালিকানাধীন ভবনসমূহ নিয়ে দেউলিয়া মামলায় হস্তক্ষেপ করে ৩০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ নিশ্চিত করা এবং ছয় মাসের মধ্যে মেরামতের অঙ্গীকার আদায়। এ অ্যান্ড ই রিয়েল এস্টেটের সঙ্গে ২.১ মিলিয়ন ডলারের সমঝোতা, যার মাধ্যমে ১৪টি ভবনে চার হাজারের বেশি লঙ্ঘন সংশোধনের নির্দেশ। বাড়িওয়ালা সেথ মিলারের বিরুদ্ধে নুইস্যান্স অ্যাবেটমেন্ট আইনের অধীনে ঐতিহাসিক ২.১ মিলিয়ন ডলারের আদালতের রায় এবং প্রতিদিন এক হাজার ডলার জরিমানা। ইস্ট হারলেমে ভাড়া-নিয়ন্ত্রিত অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়াটিয়াদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি ও সংগঠনে সহায়তা।
আবাসন সরবরাহ বাড়াতে মেয়র নির্বাহী আদেশ ৫ জারি করে ‘স্ট্রিমলাইনিং প্রসিডিউরস টু এক্সপেডাইট ইকুইটেবল ডেভেলপমেন্ট (স্পিড)’ টাস্কফোর্স গঠন করেন। এর লক্ষ্য পরিবেশগত পর্যালোচনা থেকে শুরু করে প্রকল্প অনুমোদন পর্যন্ত প্রক্রিয়ার বিলম্ব কমানো।
প্রধান উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে সহায়ক আবাসিক ইউনিট (এডিইউ) নির্মাণের জন্য পূর্ব-অনুমোদিত নকশার লাইব্রেরি চালু। ব্রঙ্কসে সাশ্রয়ী আবাসনের অনুমোদন-প্রক্রিয়া সাত মাস থেকে ৯০ দিনে নামিয়ে আনার প্রস্তাব। নেইবারহুড বিল্ডার্স ফাস্ট ট্র্যাক কর্মসূচির মাধ্যমে সিটি মালিকানাধীন জমিতে আবাসন উন্নয়ন।
দীর্ঘদিন স্থগিত থাকা জাস্ট হোম প্রকল্প পুনরায় চালু করা। বাসস্থান উন্নয়ন ও ব্যয়সাশ্রয় নিশ্চিত করতে প্রশাসন একাধিক আর্থিক বিনিয়োগ ঘোষণা করেছে। বিচ ৪১তম স্ট্রিট হাউসেসে আধুনিক তাপ ও শীতাতপ-ব্যবস্থা স্থাপনে ৩৮.৪ মিলিয়ন ডলার। প্লাস ওয়ান অউট কর্মসূচির আওতায় বাড়ির মালিকদের জন্য ৩৯৫,০০০ ডলার পর্যন্ত অনুদান। নাইচার ৪০টি উন্নয়নে ফ্যাসাড মেরামতে ৬৫০ মিলিয়ন ডলার। নাইচা সম্পত্তি সংস্কার ও উন্নয়নে অতিরিক্ত ৬৬২ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ। অগ্নিকাণ্ড ও জরুরি পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত বাড়িতে ফেরাতে ব্যাক হোম ইউনিট চালু।
বিশ্লেষকদের মতে, মামদানি প্রশাসনের এই পদক্ষেপগুলো নিউইয়র্কের দীর্ঘস্থায়ী আবাসন সংকট সমাধানে একটি শক্তিশালী নীতিগত ভিত্তি তৈরি করেছে। আবাসন সরবরাহ বৃদ্ধি, ব্যয় হ্রাস এবং ভাড়াটিয়াদের অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে শহরের সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জোরদার হবে।
প্রথম ১০০ দিনেই মেয়র মামদানির গৃহীত পদক্ষেপ প্রমাণ করেছে, নিউইয়র্ক সিটিতে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসন নিশ্চিত করা তার প্রশাসনের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে শহরের আবাসন খাতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ সুগম হবে।
মেয়রের ১০০ দিনের সাফল্য তুলে ধরতে নতুন ওয়েবসাইট চালু
নিউইয়র্কবাসীর কাছে প্রশাসনের প্রথম ১০০ দিনের অর্জন তুলে ধরতে একটি নতুন ওয়েবসাইট চালু করেছেন সিটি মেয়র জোহরান মামদানি। এই প্ল্যাটফর্মে একটি ইন্টারঅ্যাকটিভ মানচিত্র যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে শহরের পাঁচটি বরোজুড়ে প্রশাসনের বিভিন্ন উদ্যোগ ও সাফল্যের বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে।
১২ এপ্রিল মেয়র অফিস থেকে জানানো হয়, নতুন ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নাগরিকেরা শ্রমিক ও ভাড়াটিয়াদের অধিকার রক্ষা, সর্বজনীন শিশুসেবা সম্প্রসারণ এবং সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়নসহ বিভিন্ন প্রকল্প সম্পর্কে সহজেই জানতে পারবেন। উদ্যোগগুলো প্রশাসনের অগ্রাধিকার অনুযায়ী সাজানো হয়েছে, যাতে ব্যবহারকারীরা ড্রপডাউন মেন্যুর মাধ্যমে নির্দিষ্ট খাত নির্বাচন করে তথ্য দেখতে পারেন। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র অষ্টম দিনে মেয়র মামদানি গভর্নর ক্যাথি হোকুলের সঙ্গে যৌথভাবে সর্বজনীন শিশুসেবায় ১.২ বিলিয়ন ডলারের ঐতিহাসিক বিনিয়োগ ঘোষণা করেন। এই পরিকল্পনার আওতায় ৩-কে কর্মসূচিতে ১ হাজার আসন বৃদ্ধি করা হয়েছে। পাশাপাশি চলতি শরতে নিউইয়র্ক সিটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পূর্ণ দিবস ও পূর্ণ বর্ষব্যাপী ২-কে আসন চালু করা হচ্ছে।
শ্রমিক ও ভাড়াটিয়াদের জন্য উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। প্রশাসনের প্রথম ১০০ দিনে শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য ৯ মিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হয়েছে, ৪.৩ মিলিয়ন কর্মীর জন্য সুরক্ষিত ছুটির সুবিধা সম্প্রসারণ করা হয়েছে, ভাড়াটিয়াদের পক্ষে মেরামত, নিষ্পত্তি ও রায়ের মাধ্যমে ৩৪ মিলিয়ন ডলার আদায় করা হয়েছে।
মেয়র মামদানি বলেন, নিউইয়র্কবাসী এমন একটি সরকার প্রাপ্য, যা তাদের মতোই কঠোর পরিশ্রম করে। আমরা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম আর এই ওয়েবসাইট সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন। এটি কেবল সূচনা।
পাঁচ বরোজুড়ে উন্নয়নের চিত্র : ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর মেয়র মামদানি পাঁচটি বরোতেই বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছেন। স্ট্যাটেন আইল্যান্ডে এক লাখতম গর্ত মেরামত থেকে শুরু করে ব্রঙ্কসে অবৈধ বর্জ্য অপসারণ-ইন্টারঅ্যাকটিভ মানচিত্রে এসব উদ্যোগের বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
চারটি মূল অগ্রাধিকার : ওয়েবসাইটটি চারটি প্রধান লক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে সাজানো হয়েছেÑসবার জন্য শিশুসেবা নিশ্চিত করা, দুর্নীতি ও অপচয় রোধ করা, ছোট-বড় সব সমস্যা সমাধান করা, সকল নিউইয়র্কবাসীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এ ছাড়া মানচিত্রে সংশ্লিষ্ট প্রেস বিজ্ঞপ্তি, ছবি, ভিডিও এবং অন্যান্য তথ্যের লিংক সংযুক্ত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ নিউইয়র্ক সিটিতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ডিজিটাল প্রশাসনকে আরও শক্তিশালী করবে। নাগরিকদের সঙ্গে সরকারের সরাসরি যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে এটি আধুনিক নগর শাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
টু-কে কর্মসূচি পূর্ণ দিবস চালু, আবেদন শুরু ২ জুন নিউইয়র্কে শিশু শিক্ষায় মেয়রের যুগান্তকারী পদক্ষেপ
নউইয়র্ক সিটিতে প্রারম্ভিক শিশু শিক্ষা ও পরিচর্যায় এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। কর্মজীবী পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের চাহিদাকে সামনে রেখে মেয়র জোহরান মামদানি একাধিক যুগান্তকারী উদ্যোগ ঘোষণা করেছেন, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো টু-কে (দুই বছর বয়সী শিশুদের জন্য) কর্মসূচিকে পূর্ণ দিবস ও পূর্ণ বর্ষব্যাপী চালু করা এবং এই কর্মসূচির জন্য আবেদন-প্রক্রিয়া শুরু করা।
৯ এপ্রিল ব্রুকলিনের ব্রাউনসভিলে এক অনুষ্ঠানে মেয়র ঘোষণা দেন, এখন থেকে টু-কে কর্মসূচি প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত মোট ১০ ঘণ্টা এবং বছরে ২৬০ দিন পরিচালিত হবে। এর ফলে কর্মজীবী অভিভাবকদের জন্য শিশুযত্নের বড় একটি সমস্যা দূর হবে। তিনি বলেন, ‘নিউইয়র্কের বেশির ভাগ বাবা-মা সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কাজ করেন, কিন্তু সন্তানের স্কুল শেষ হয়ে যায় বিকেল ৩টায়। এই বৈষম্যই তাদের জন্য বড় চাপ তৈরি করে।’ নতুন এই ব্যবস্থায় পরিবারগুলো বছরে প্রায় ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় করতে পারবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এর পাশাপাশি শহর প্রশাসন ইতোমধ্যে দুই বছর বয়সী শিশুদের জন্য সর্বজনীন ও বিনামূল্যের টু-কে কর্মসূচি চালুর ঘোষণা দিয়েছে। চলতি বছরের শরৎকাল থেকে প্রাথমিকভাবে ২ হাজার আসন চালু হবে, যা ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হয়ে আগামী চার বছরে সর্বজনীন পর্যায়ে পৌঁছাবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে গভর্নরের সহযোগিতায় ১.২ বিলিয়ন ডলারের তহবিল সংগ্রহ করা হয়েছে।
অন্যদিকে এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের জন্য আবেদন গ্রহণ শুরু হবে আগামী ২ জুন এবং চলবে ২৬ জুন পর্যন্ত। শহরের নির্ধারিত কয়েকটি স্কুল জেলায় পরিবারগুলো আবেদন করতে পারবে এবং আগস্টে আসন বরাদ্দের প্রস্তাব প্রকাশ করা হবে। শহর প্রশাসন জানিয়েছে, আয়, বসবাসের এলাকা বা অভিবাসন অবস্থা নির্বিশেষে সকল পরিবারের জন্য এই সুযোগ উন্মুক্ত থাকবে- যা সমতা ও অন্তর্ভুক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে একটি বড় পদক্ষেপ।
আবেদন-প্রক্রিয়াকে আরও আকর্ষণীয় ও জনসম্পৃক্ত করতে চালু করা হয়েছে একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগÑনগরব্যাপী জিঙ্গল প্রতিযোগিতা। এতে অংশগ্রহণকারীরা ১৫ বা ৩০ সেকেন্ডের মৌলিক জিঙ্গল তৈরি করে জমা দিতে পারবেন। সেরা জিঙ্গলটি নিউইয়র্ক সিটির টু-কে কর্মসূচির অফিশিয়াল থিম সং হিসেবে রেডিওতে সম্প্রচারিত হবে। জনপ্রিয় র‌্যাপার কার্ডি বি এই উদ্যোগে যুক্ত হয়ে সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘শিশু পরিচর্যার অভাব অনেক নারীর অগ্রযাত্রার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই উদ্যোগ সেই বাধা দূর করবে।’
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও এই কর্মসূচিকে যুগান্তকারী হিসেবে দেখছেন। নিউইয়র্ক সিটি পাবলিক স্কুলসের চ্যান্সেলর কামার সামুয়েলস বলেন, এটি শিশুদের ভাষা, সামাজিক ও মানসিক বিকাশে শক্ত ভিত গড়ে তুলবে। একই সঙ্গে কর্মজীবী পরিবারগুলো পাবে নির্ভরযোগ্য সহায়তা।
মেয়র মামদানি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভবিষ্যতে থ্রি-কে ও ফোর-কে কর্মসূচিকেও একইভাবে পূর্ণ দিবস ও পূর্ণ বর্ষ মডেলে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সমন্বিত উদ্যোগ শুধু শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন নয়, বরং নগরজীবনে অর্থনৈতিক স্বস্তি, নারীর কর্মসংস্থান এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
টু-কে কর্মসূচির সম্প্রসারণ ও আবেদন-প্রক্রিয়া চালুর এই উদ্যোগ নিউইয়র্ককে একটি আরও পরিবারবান্ধব, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অগ্রসর নগরীতে রূপান্তরের পথে শক্ত ভিত্তি স্থাপন করেছে।

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz