সংবাদপত্র রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ ও সমাজের দর্পণ। সংবাদপত্র নিজের যোগ্যতাবলেই সমাজে তার এ অবস্থান তৈরিতে ভূমিকা রেখে আসছে, যার ব্যাখ্যা আর নতুন করে দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। উপরে উল্লেখিত চ্যালেঞ্জের বাইরেও কিছু চ্যালেঞ্জ থাকে, যা একান্ত সংবাদপত্র-সংশ্লিষ্ট লোকদের বাইরে অন্যের জানা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তবে কালেভদ্রে সংশ্লিষ্টদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট টানাপোড়েনের ফলে কিছু তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ পায়, যা অনভিপ্রেত। দীর্ঘদিন ঘর-সংসার করার পরে অনিবার্য কারণে ছাড়াছাড়ি হলে তখন মধুর সময়ের কিছু তিক্ত কথা উভয়ের নিকট থেকেই প্রকাশ পায়, যা তাদের সম্মানের জন্য হানিকর এবং ওইসব প্যাঁচাল অন্যদের জন্য মোটেও সুখকর নয়। তা সত্ত্বেও প্রথম যিনি মুখ খোলেন এবং অনাকাক্সিক্ষত শব্দচয়ন করেন, যা নিন্দনীয়। সত্যিই অপ্রিয় কিছু থেকে থাকলে দীর্ঘদিন যা প্রকাশ পায়নি, সংশ্লিষ্ট সবার স্বার্থে তা গোপন রাখাই উত্তম। সংবাদপত্রশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষেরই কঠিন দায়িত্ব পালন করতে হয় এবং কখনো কখনো অনিচ্ছা সত্ত্বেও কিছু বিষয়ে আপস করতে হয় সন্দেহ নেই। তবে তা কখনো নিজেদের ঐক্যে ফাটল ধরার মতো পর্যায়ে পৌঁছা ঠিক নয়। প্রতিটি সংবাদপত্রেরই সম্পাদকীয় নীতিমালা থাকে, যারা এ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকেন, নীতিমালা মেনেই তাদের কাজ করতে হয়। ফলে সংশ্লিষ্ট পক্ষদ্বয়ের নীতিমালার সঙ্গে মতের ভিন্নতা তৈরি হলে সে ক্ষেত্রে অবশ্যই তাদের ভিন্ন পন্থা অনুসরণের সুযোগ ও স্বাধীনতা রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করা প্রতিষ্ঠানের যাতে ক্ষতি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা সবার দায়িত্ব। এরূপ ক্ষেত্রে পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতার পরে কটূক্তি মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। সৌজন্যবোধের স্বার্থে তখন উভয় পক্ষেরই উচিত বিষয়টি সহজভাবে নিষ্পন্ন করা। পাঠক ও পর্যবেক্ষক মহলের সেটিই প্রত্যাশা।

বিশেষ শ্রেনি ও পেশানির্ভর বিষয়ভিত্তিক সংবাদপত্র যেমন আছে, তেমনি সকল শ্রেণি-পেশা ও পাঠক উপযোগী কমন সংবাদপত্রও আছে, যা একটি আদর্শ সমাজের সর্বস্তরের চাহিদা পূরণ করে থাকে। একটি সাধারণ সংবাদপত্রের বিষয়-বৈচিত্র্য নির্ভর করে সংবাদপত্রের আওতাভুক্ত জনগোষ্ঠীর চাহিদা, আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ও সমাজের সংগতি-অসংগতির চিত্র তুলে ধরার ওপর, যার মাধ্যমে সর্বস্তরের মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত হয়। ভাষাগত কারণে কিছু সংবাদপত্রের আওতা নির্দিষ্ট ভাষাভাষী ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও অনেক সংবাদপত্র নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের কারণে বিশ্বব্যাপী প্রভাব বিস্তারে সক্ষম। সংবাদের আওতা গ্রহণযোগ্যতা ও পরিবেশনের গুরুত্বের ওপর যা নির্ভরশীল। সংবাদপত্র পাঠকের বোধগম্য ভাষাও এ ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ভূমিকা বহন করে। সংবাদের বিষয়-সংশ্লিষ্টতা ও ভাষা পাঠক ও সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের অনুকূল হলে তা বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে থাকে।
উদাহরণ হিসেবে নিউইয়র্কে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত পত্রিকা প্রকাশনার বিষয়টি আমলে নেওয়া যেতে পারে। নিউইয়র্ক শহরে বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর জন্য নিজ ভাষায় সংবাদপত্র প্রকাশ এবং বিনামূল্যে পাঠকদের নাগালে সরবরাহ করা দুরূহ কাজ হলেও নতুন-পুরোনো বহু বাংলা সংবাদপত্র এ কঠিন কাজটি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করে নিয়মিত প্রকাশনা অব্যাহত রাখছে। এখানে প্রকাশিত অনেক সংবাদপত্র সংবাদের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় প্রকাশ ছাড়াও দিকনির্দেশনামূলক অনেক নিবন্ধ, প্রবন্ধ ও বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় গুরুত্বপূর্ণ অনেক লেখা প্রকাশ করছে। প্রকাশিত লেখার বিষয়-বৈচিত্র্য পত্রিকা ভেদে ভিন্ন হওয়াই স্বাভাবিক হলেও লেখার গঠনশৈলী, শব্দচয়ন ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় যাতে মানসম্পন্ন থাকে, সেদিকে লক্ষ রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নিউইয়র্ক শহরে বিশ্বের প্রায় সকল জাতি-গোষ্ঠীর বসবাস। তাই কোনো ভাষার প্রতিনিধিত্বকারী সংবাদপত্রের মান যাতে অন্য ভাষাভাষীদের নিকট গ্রহণযোগ্যতায় ঘাটতি পরিলক্ষিত না হয়, সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া আবশ্যক। যেসব পত্রিকায় নিয়মিত সাহিত্য বিভাগ ছাপা হয়, তাদের বিভাগটি দেখার জন্য দক্ষ লোক থাকা বাঞ্ছনীয়।
যেকোনো সংবাদপত্রের নিরবচ্ছিন্ন প্রকাশনা অব্যাহত রাখা দুরূহ হলেও নিউইয়র্কে প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলোর মধ্যে ঠিকানা পত্রিকা প্রকাশনার ৩৪ বছর পেরিয়ে ৩৫ বছরে পদার্পণ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ভিন্ন ভাষাভাষী অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্নভাবে পত্রিকার প্রকাশনা অব্যাহত রাখা এবং বিনামূল্যে পাঠক পর্যায়ে পত্রিকা সরবরাহ খুবই কঠিন কাজ। সব সময় এ পথচলা মসৃণ নয়, তবু পত্রিকাটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হওয়ার গৌরব বহন করছে।
নিউইয়র্কে বাংলা সংবাদপত্র প্রকাশনার ক্ষেত্রে নবীন-প্রবীণদের বয়স বিবেচনা করলে সাপ্তাহিক ঠিকানা অতি পুরোনো একটি পত্রিকা। একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে যার আত্মপ্রকাশ একটি প্রণিধানযোগ্য বিষয়। নিয়মিত ৭২ পৃষ্ঠা-সংবলিত ইংরেজিপ্রধান সংখ্যাগরিষ্ঠ ভাষাভাষী অঞ্চলে ধারাবাহিকভাবে একটি বাংলা পত্রিকার ৩৪ বছর পেরিয়ে ৩৫ বছরে পদার্পণ খুব সহজ কথা নয়। ঠিকানা পত্রিকার বিষয়-বৈচিত্র্য, সংবাদ ও অন্যান্য বিভাগের লেখার মান ও বিন্যাস, ছাপার মান ও তৎসংশ্লিষ্ট ফটোগ্রাফ ইত্যাদি পর্যবেক্ষণে অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য একটি পত্রিকা হিসেবে অনন্য বিবেচিত হয়েছে।
বাংলাদেশে অবস্থানকালীন সত্তরের দশকে যতদূর স্মরণে আসে, ‘কিষাণ’ পত্রিকায় মফস্বল সংবাদদাতা হিসেবে কিছুদিন কাজ করার পর চাকরিতে যোগদানের কারণে নিয়মিত সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করা সম্ভব হয়নি। তবু জাতীয় পত্রিকাসহ যেসব জেলায় চাকরির সুবাদে অবস্থান করেছি, সেখানকার স্থানীয় পত্রিকায় সাহিত্য বিষয়ে নিয়মিত লেখালেখি করা ছাড়াও একটি জেলা শহর থেকে প্রকাশিত চারটি সাপ্তাহিক পত্রিকার দুটির সাহিত্য পাতা সম্পাদনা ও অন্য দুটিতে নিয়মিত সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় লেখা প্রকাশ অব্যাহত থাকে। একটি সাপ্তাহিকের সম্পাদকীয় লেখা ছিল প্রায় নিয়মিত, যার কিছু সম্পাদকীয় বিশিষ্টজনদের বিবেচনায় ওই পত্রিকার বিগত কয়েক বছরের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সম্পাদকীয়র মর্যাদা লাভ করে। সাধারণ পাঠকেরা না জানলেও পত্রিকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং ঘনিষ্ঠ লোকজন ঠিকই জানতেন। বিষয়টি প্রচারের জন্য নয়, বরং পত্রিকার নিয়মিত প্রকাশনা অব্যাহত রাখার চ্যালেঞ্জ শীর্ষক আলোচনা পর্বটি সামনে আসার পরিপ্রেক্ষিতে অভিজ্ঞতালব্ধ কথাগুলো উল্লেখ করা হলো মাত্র। এলজিইডির রংপুর জেলা শহর থেকে প্রকাশিত একটি সাপ্তাহিকে জেলা সংবাদদাতা হিসেবে উন্নয়ন-বিষয়ক খবর পরিবেশন ছিল নিয়মিত। নিউইয়র্কে আসার পরে সংগত কারণেই লেখা প্রকাশের ব্যাপারে কিছুটা ধীরে চলো নীতি অবলম্বন করি। এখান থেকে প্রকাশিত পত্রিকাসমূহের লেখার মান ও সম্পাদকীয় নীতি-আদর্শ অনুধাবনের চেষ্টা করি। অতঃপর গত চার বছর থেকে লেখা প্রকাশে আগ্রহী হই। এ পর্যন্ত আমার তিনটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হলেও কাব্য ও মৌলিক প্রবন্ধের সাতটি বই প্রকাশের অপেক্ষায়। বর্তমানে নিউইয়র্কে পছন্দের বেশ কয়েকটি পত্রিকায় নিয়মিত কবিতা, প্রবন্ধ, ছোটগল্প ও ফিচার প্রকাশিত হচ্ছে। এর মধ্যে ঠিকানা অন্যতম।
বিজ্ঞাপন প্রকাশ পত্রিকার আয়ের একটি প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচিত হলেও পত্রিকায় প্রকাশিত সকল বিষয়েরই একটি সংবাদমূল্য রয়েছে, এটিও তার ব্যতিক্রম নয়। বিজ্ঞাপন যারা দেন এবং বিজ্ঞাপন থেকে সংশ্লিষ্ট তথ্যটি জেনে যারা উপকৃত হন, উভয়ের নিকট এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বৈদেশিক সম্পর্ক উন্নয়ন ও রক্ষা করার মতো অনেক গোপনীয় খবর, যা সরকারের কূটনীতিক ও গোয়েন্দা সংস্থা কর্তৃক সরকারের গোচরীভূত করার কথা, অথচ কোনো কারণে সরকার তা পেতে ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রের অনেক ক্ষতি হয়ে যায়। এরূপ অনেক গোপনীয় খবরও অনুসন্ধানী সংবাদিকতার মাধ্যমে সংবাদপত্রে প্রকাশ পাওয়ার ফলে সংশ্লিষ্ট দেশ ও জনগণ অনেক অনাকাক্সিক্ষত ঝামেলা থেকে রেহাই পেয়ে যায়। এরূপ ক্ষেত্রে সাংবাদিকতাকে রাষ্ট্রের ইন্টেলিজেন্ট বিভাগের সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে বিষয়টি নির্ভর করে রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের গ্রহণ-বর্জনের মানসিকতার ওপর।
ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও জাতীয় জীবনে ছোট-বড় অনেক আনন্দ উৎসবের উপলক্ষ থাকে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও এরূপ অনেক উৎসব আয়োজন করে থাকে। সংবাদপত্রশিল্প প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বা মবঃ-ঃড়মবঃযবৎ হিসেবে তাদের অনুষ্ঠানের যে আয়োজন করে, সাপ্তাহিক ঠিকানা পত্রিকার অনুরূপ বার্ষিক আনন্দ আয়োজন মবঃ-ঃড়মবঃযবৎ ফরহহবৎ হিসেবে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়ে আসছে। ঠিকানায় কবি, লেখক, কলামিস্ট ও গবেষক হিসেবে যারা সারা বছর নিঃস্বার্থভাবে বিভিন্ন বিষয়ে লিখে পত্রিকার কলেবর ও পাঠকদের মনোজগৎ সমৃদ্ধ করে থাকেন, গত বছর এরূপ বার্ষিক অনুষ্ঠানে পত্রিকার পক্ষ থেকে স্বীকৃতিস্বরূপ সাতজনকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। প্রতিবছর এটি অব্যাহত রেখে পর্যায়ক্রমে অন্য লেখক-কলামিস্টদেরও উৎসাহিত ও সম্মানিত করা যায় কি না, ভেবে দেখা যেতে পারে। সকল বাধা-বিঘ্ন পেরিয়ে পত্রিকাটির মসৃণ পথচলা ও প্রকাশনার ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকাসহ সার্বিক সাফল্য কামনা করছি।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক।