খবরের বাজারে কত কত যে প্রশ্ন, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। বিশ্বকাপে শেষ হাসি কে হাসবে? ৪৮ দল থেকে ঝরে পড়তে পড়তে এ সম্পাদকীয় যখন প্রকাশ পাবে, তখন ৮ দলের প্রতিযোগিতা হবে। তারপর ৪ এবং সর্বশেষ দুই দলের মধ্যে হবে শেষ হাসি হাসার লড়াই ১৯ জুলাই। তারপর আবার চার বছর অপেক্ষা ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখার জন্য। আজ যারা বিশ্বকাপের খেলা দেখে কেউ হাসছেন, কেউ কাঁদছেন, তাদের অনেকেই হয়তো আর খেলার মাঠে বা টিভির সামনে বসে খেলা দেখার আর সুযোগ পাবেন না। খেলা নিয়ে প্রশ্ন আরও অনেক। সোনার বুট কে পাবেন? কে পাবেন সোনার বল কিংবা গ্লাভস?
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ নিয়েও প্রশ্ন কম নয়। যুদ্ধ বন্ধে চুক্তি শেষ পর্যন্ত হবে তো? হলেও সে চুক্তির আয়ু কত দিন হবে? ইসরায়েলের শুভবুদ্ধি ঘটবে কি? যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহু তার গদি রক্ষার জন্য যুদ্ধকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবেন নাকি যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে শান্তির ডাকে সাড়া দেবেন? এই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলতে খেলতেই মানবজাতির জন্য অভিশাপ হিসেবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লেগে যাবে না তো? বর্তমানে যে দাবদাহ চলছে, তা আর কত দিন স্থায়ী হবে? আর কতজনের প্রাণ দিতে হবে এই গরমে?
এসব প্রশ্নের জবাব আছে, শেষও আছে। বিশ্বকাপের সব প্রশ্নের মীমাংসা হয়ে যাবে ১৯ জুলাই ফাইনাল খেলার মধ্য দিয়ে। দর্শকের দলে পুরোনোরা যাবে, নতুনরা এসে তার স্থান নেবে। যুদ্ধেরও শেষ আছে। জয়-পরাজয় আছে। বিশ্বযুদ্ধ হয়েছে দুটি। লাখ লাখ মানুষ মরেছে। সভ্যতা ধ্বংস হয়েছে। শান্তি বিনষ্ট হয়েছে। যুদ্ধ মানেই ধ্বংস। মানবসমাজ, সভ্যতা, শান্তির বিনাশ। তার পরও একদিন যুদ্ধ শেষ হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে ওঠে। মানুষের চেয়ে বড় ফিনিক্স মনে হয় আর কিছু নেই। যুদ্ধ হোক, ঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস কিংবা সুনামি হোকÑসবকিছুর বিরুদ্ধে মানুষ লড়াই করতে পারে। সে লড়াইয়ে মানুষ বিজয়ীও হয়।
কিন্তু মানুষ একটি প্রশ্নের উত্তর কখনো খুঁজে পায় না। সে হচ্ছে রাজনীতি। কমিউনিস্ট চিন্তক কার্ল মার্কস মনে করতেন, পৃথিবীর সকল কিছু নিয়ন্ত্রিত হয় অর্থনীতির দ্বারা। কমিউনিজমের যুগ শেষ হয়ে গেছে সেই কোন আমলে। এখন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের খোলনলচে পাল্টে গেছে। এ সময়ে সমাজতন্ত্রের নাম আছে, চরিত্র পাল্টে গেছে। এখন রাজনীতির অবিভাজ্য সঙ্গী কূটনীতি। বর্তমানে এই দুই নীতি সমাজজীবন, রাষ্ট্রীয় জীবনকে এমনভাবে গ্রাস করে ফেলেছে, সে নীতিতে মানুষের কল্যাণের কথা বলে শ্রমজীবী, কর্মজীবী মানুষ, খেটে খাওয়া কুলি-মজুর-এককথায় উৎপাদনের প্রথম উপাদান মানুষের কথা বলে, মানুষকে বড় বড় স্বপ্ন দেখিয়ে উৎপাদন শক্তির দখলদার শ্রেণি রাষ্ট্রশক্তি ব্যবহার করে সব দখল করবে, ভোগ করবে, বিলাসিতায় জীবন ভাসিয়ে দিয়ে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ-দুর্দশা উপভোগ করে। এখনকার সমাজতন্ত্র যেন ‘মাকাল ফল’। বাইরে সুন্দর, ভেতরে পচা।
বর্তমান সময়ে রাজনীতি প্রথমে হরণ করে শাসকশ্রেণি। তাদের সঙ্গী-সাথি ধনিক, বণিক, শিল্পপতিদের বিবেক এবং নীতি-নৈতিকতা। তাদের ওপর ভর করে ঘুষ, খুন, দুর্নীতি, দখলদারত্ব, চাঁদাবাজির ভূত। তারা মিথ্যার ছুরি দিয়ে গণমানুষকে শোষণ করে। তাদের এই দ্বিচারিতার অর্থই বোঝা যায় না। এটাই কি ধনবাদী রাজনীতির ফসল? এর উত্তর মেলে না। নির্বাচন এলে বলা হয় নির্বাচনকে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখা হবে। আমরা তার নমুনা দেখেছি। দেশের রাজনীতির গতিপথ বোঝা কঠিন। বিশ্ব রাজনীতির হালচালও আমজনতার বোধগম্য হয় না। রাজনীতিবিদদের রাজনীতি, তাদের গতিবিধি এবং মতিগতির সুলুকসন্ধান করা মনে হয় স্বয়ং বিধাতারও অসাধ্য! রাজনীতিবিদদের রাজনীতির অর্থ অনুধাবন করা তাই সাধারণ মানুষের কল্পনারও অতীত। বহুদিন থেকেই শোনা যায়, বিরাজনৈতিকীকরণের কথা। মানুষকে এভাবে ধোঁয়াশার মধ্যে রেখেই বুঝি তারা তাদের বিরাজনৈতিকীকরণের কাজটি সম্পন্ন করে নিতে চায়। মানুষ একবার যদি তাদের এই ফাঁদে পা দেয়, যদি একবার তাদের মনোকামনা পূর্ণ হয়, তবে রাজনীতিবিদদের শোষণের পথ, যা খুশি তা-ই করার পথ নিষ্কণ্টক, অবারিত হয়। তখন তাদের সামনে থাকবে না কোনো প্রতিরোধ, কোনো আন্দোলন, কোনো গণ-অভ্যুত্থান। সাধারণ মানুষ সবকিছুর যত অর্থ বুঝবে, অন্তর থেকে তত প্রতিবাদের ভাষা, প্রতিরোধের আগুন বের হয়ে আসবে।