Thikana News
০৪ মার্চ ২০২৪
  1. ই-পেপার
  2. চলতি সংখ্যা
  3. বিশেষ সংখ্যা
  4. প্রধান সংবাদ
  5. আমেরিকার অন্দরে
  6. বিশ্বচরাচর
আমেরিকা সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪

ইসরা ও মিরাজের প্রাপ্তি এবং শিক্ষা

ইসরা ও মিরাজের প্রাপ্তি এবং শিক্ষা
নবুওয়াতপ্রাপ্ত নবীদের থেকে অলৌকিক কিছু প্রকাশ পেলে তাকে ‘মুজিজা’ বলা হয়। আমাদের প্রিয় নবীর (সা.) ছিল অসংখ্য মুজিজা। ইসরা ও মিরাজ নবী করিম (সা.) এর একটি বিশেষ বিস্ময়কর মুজিজা। আর মুজিজা ওই ঘটনাকেই বলা হয়, যা সাধারণ সক্ষমতার বাইরে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বিশেষভাবে সংঘটিত হয়। এ জন্যই মিরাজের ঘটনা বর্ণনা করার আয়াতের শুরুতেই আল্লাহ তায়ালা সুবহানআল্লাহ শব্দটি ব্যবহার করে মিরাজের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। ‘সুবহানআল্লাহ’ শব্দটি সাধারণত কোনো আশ্চর্যজনক ঘটনার সময়ই ব্যবহার করা হয়। মিরাজ যে সশরীরে হয়েছিল, তা বোঝাতে আবদুন শব্দ ব্যবহার করেছেন। আর আবদ বা বান্দা বলা হয় রুহ ও দেহের সমষ্টিকে। এ শব্দটিও রাসুলের (সা.) মিরাজ সশরীরে হওয়ার প্রমাণ বহন করে।
ইসরা ও মিরাজের সময় এবং প্রেক্ষাপট
ইসরা ও মিরাজ রাসুল (সা.) এর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। মিরাজ সংঘটিত হওয়ার সময়টির ব্যাপারে কয়েকটি মতামত রয়েছে। ইমাম নববী ও কুরতুবির মতে, মিরাজের ঘটনা রাসুলের (সা.) নবুওয়াতপ্রাপ্তির পাঁচ বছর পর ঘটেছে। ইমাম হরবির মতে, ইসরা ও মিরাজের ঘটনা রবিউস সানি মাসের ২৭ তারিখ রাতে হিজরতের এক বছর আগে ঘটেছিল। তবে প্রসিদ্ধ মতে, রাসুল (সা.) ৫২ বছর বয়সে অর্থাৎ নবুয়তের দশম বছর রজব মাসের ২৬ তারিখ দিবাগত রাতে রোজ সোমবার মিরাজের আশ্চর্যতম ঘটনাটি সংঘটিত হয়। এ বছরেই নবীজির (সা.) আশ্রয় ও সান্ত্বনার বিরাট দুই বৃক্ষ চাচা আবু তালেব ও স্ত্রী হজরত খাদিজা (রা.) ইন্তেকাল করেন অল্প কিছুদিনের ব্যবধানে। এ জন্য এ বছরকে ‘আমুল হুজন’ বা দুঃখের বছরও বলা হয়। এতৎসত্ত্বেও নবীজি তাওহিদ ও ইমানের দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কাফেরদের নির্মম অত্যাচার ও অবর্ণনীয় বাক্যবাণে তিনি বিধ্বস্তপ্রায়। এমন মুহূর্তে রাসুলকে (সা.) সান্ত্বনা দান ও দ্বীনের দাওয়াতি কাজে উদ্বুদ্ধ করার নিমিত্তে আল্লাহ তাঁর হাবিবকে মিরাজে ডেকে নিয়েছিলেন।
ইসরা ও মিরাজ কী
মিরাজ আরবি শব্দ, যার শাব্দিক অর্থ সিঁড়ি বা ঊর্ধ্বারোহণ আর ইসরা অর্থ রাতের সফর। সংক্ষেপে বলা যায়, ইসলামি পরিভাষায় ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) এর সঙ্গে ‘বুরাক’ নামক বাহনে চড়ে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সশরীরে পবিত্র কাবা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাসে উপনীত হন। সেখানে ওনার ইমামতিতে অন্য সকল নবী ও রাসুল দুই রাকাত নফল সালাত আদায় করেন। তারপর সেখান থেকে সাত আসমান পার হয়ে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত জিবরাইল (আ.) নবীজির (সা.) সঙ্গে পরিভ্রমণ করেন। এ সময় নবীজি (সা.) নভোমণ্ডল, জান্নাত-জাহান্নাম ও সৃষ্টির বিভিন্ন রহস্য প্রত্যক্ষ করেন। এরপর ‘রফরফ’ নামক বিশেষ বাহনে চড়ে আরশে আজিমে পৌঁছে মহান আল্লাহর দিদার লাভ করার ঘটনাকে মিরাজ বলে। বিভিন্ন বিখ্যাত সিরাত গ্রন্থে ইসরা ও মিরাজের ঘটনার ধাপে ধাপে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে, যা এখানে বিশদ আলোচনা করা সম্ভব নয়, আগ্রহীরা সিরাত পড়লে বিস্তারিত ধারণা পাবেন।
মিরাজের উদ্দেশ্য
অল্প দিনের ব্যবধানে রাসুলের (সা.) চাচা আবু তালেব ও স্ত্রী হজরত খাদিজার (রা.) ইন্তেকালের পর নবীজি স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা মানসিকভাবে দুঃখভারাক্রান্ত ছিলেন। এর পরও তিনি দ্বীনের দাওয়াত চালিয়ে যাচ্ছিলেন এবং এই উদ্দেশ্যে তায়েফ গমন করেন কিন্তু তায়েফবাসী ওনার কথায় সাড়া দেয়নি। বরং ওনার সঙ্গে বিরূপ আচরণ করে। ক্ষত-বিক্ষত করা হয় প্রাণপ্রিয় নবীজিকে। মক্কায় ফিরে আসার পরও চাচা আবু তালিবের অবর্তমানে তাঁর ওপর শত্রুদের অত্যাচারের মাত্রা বহুগুণে বেড়ে যায়। এ অবস্থায় আল্লাহর নিদর্শনাবলি প্রত্যক্ষ করিয়ে রাসুলের (সা.) মনোবল চাঙা করাটা ছিল মিরাজের অন্যতম উদ্দেশ্য। এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্ত্বা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাতের বেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত, যার চারদিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি, যাতে আমি তাঁকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দিই।’ (সুরা বনি ইসরাইল : ১)
মিরাজের প্রাপ্তি
মিরাজের ঘটনা থেকে মুমিন খুঁজে পায় সঠিক পথের দিশা, লাভ করে দ্বীনের ওপর টিকে থাকার অবিচলতা। মিরাজের ঘটনাকে সত্যায়নের পরই হজরত আবু বকর (রা.) সিদ্দিক উপাধিতে ভূষিত হন। মিরাজে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় বন্ধু মুহাম্মদ (সা.) কে স্বীয় সান্নিধ্যে ডেকে নিয়ে উম্মতে মুহাম্মদিকে পুরস্কারস্বরূপ তিনটি বিশেষ উপহার প্রদান করেন, যা অন্য কোনো নবীকে দেওয়া হয়নি। (১) পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, যা ফজিলতের দিক দিয়ে ৫০ ওয়াক্তের সমান। (২) সুরা বাকারার শেষোক্ত দুটি আয়াত। যেখানে এই উম্মতের প্রতি আল্লাহর বিশেষ রহমত ও অনুগ্রহের কথা বলা হয়েছে। এবং (৩) উম্মতে মুহাম্মদির মধ্যে র্শ্ককিারী ব্যতীত সবাইকে ক্ষমা করার সুসংবাদ। (সহিহ মুসলিম : ১৭৩)
মিরাজের শিক্ষা
রাসুল (সা.) মিরাজ থেকে ফিরে আসার পর সুরা বনি ইসরাইলের মাধ্যমে ১৪টি নির্দেশনা উম্মতের সামনে পেশ করেন :
১) আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করো না, তাহলে তুমি নিন্দিত ও অসহায় হয়ে পড়বে। আর তোমরা কেবল আল্লাহরই বন্দেগি করো।
২) মা-বাবার সঙ্গে উত্তম ব্যবহার করো। তাদের একজন বা উভয়ে বৃদ্ধ অবস্থায় যদি তোমাদের সামনে উপনীত হন, তাহলে তাদের সঙ্গে উঁহ শব্দটিও বলো না। তাদের ধমক দিয়ো না; বরং তাদের সঙ্গে শিষ্টাচারপূর্ণ কথা বলো। আর তাদের সামনে ভালোবাসার সঙ্গে বিনয়ী থেকো আর বলো, ‘হে আমার প্রতিপালক, তাদের উভয়ের প্রতি রহম করো, যেমন শৈশবে তারা আমাদের লালন-পালন করেছেন।’
৩) তোমাদের কৃতকর্মের জন্য আল্লাহর কাছে তওবা করো, তাহলে আল্লাহ তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের মনের খবর জানেন।
৪) আত্মীয়স্বজনকে তাদের হক দান করো আর অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরদের হক আদায় করো।
৫) অপব্যয় করো না, নিশ্চয় অপব্যয়কারী শয়তানের ভাই, আর শয়তান স্বীয় প্রতিপালকের প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ।
৬) হকদারদের হক আদায়ে অপারগ হলে তাদের সঙ্গে নম্রভাবে কথা বলো।
৭) একেবারে ব্যয়কুণ্ঠ হয়ো না আবার একেবারে মুক্তহস্তও হয়ো না। তাহলে তুমি তিরস্কৃত, নিঃস্ব হয়ে বসে থাকবে।
৮) দারিদ্র্যের ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না। কারণ তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমিই জীবনোপকরণ দিয়ে থাকি। নিশ্চয় তাদের হত্যা করা মহাপাপ।
৯) জেনা-ব্যভিচার, অশ্লীলতার কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটি নিকৃষ্ট কাজ ও মন্দ পথ।
১০) কোনো জীবনকে অন্যায়ভাবে হত্যা করো না। কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হলে তার উত্তরাধিকারীকে আমি এই অধিকার দিয়েছি, তবে সে যেন প্রতিশোধের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি না করে।
১১) এতিমের সম্পদের ধারেকাছেও যেয়ো না। সম্পদের ব্যাপারে তার বয়ঃপ্রাপ্তি পর্যন্ত অপেক্ষা করো আর অঙ্গীকার পূর্ণ করো। নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
১২) ওজনে কখনো কম দিয়ো না। সঠিকভাবে দাঁড়িপাল্লায় ওজন করবে। এটা উত্তম; এর পরিণাম শুভ।
১৩) যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, সেগুলোর পেছনে লেগো না। নিশ্চয় চোখ, কান, অন্তঃকরণ এদের প্রতিটিই জিজ্ঞাসিত হবে।
১৪) পৃথিবীতে দম্ভভরে চলো না। নিশ্চয় তুমি তো ভূপৃষ্ঠকে কখনোই বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় তুমি কখনোই পর্বতপ্রমাণ হতে পারবে না। এগুলো সবই মন্দ ও ঘৃণিত কাজ (সুরা বনি ইসরাইল : ২৩-৩৮)
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর জীবনের সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা ইসরা ও মিরাজ। ইসলামের ইতিহাসে এমনকি পুরো নবুওয়াতের ইতিহাসেও এটি এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। মহিমান্বিত এ রাতে দুনিয়া ও আখেরাতের সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক আল্লাহ তায়ালার হুকুমে আল্লাহর প্রিয় নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.) আরশে আজিম পর্যন্ত ঊর্ধ্বলোক গমনের সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। এ সময় তিনি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দিদার লাভ করেন এবং একই রাতে আবার দুনিয়ায় ফিরে আসেন। এসব কারণেই এ রাতটি বিশ্বের মুসলিমদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র। প্রতিটি মুমিনের ইমান ও আবেগ জড়িয়ে আছে এর সঙ্গে। অনেক শিক্ষার উপলক্ষ হচ্ছে নবী করিমের (সা.) ইসরা ও মিরাজ। কাজেই নিছক আনুষ্ঠানিকতা পরিহার করে বাস্তবানুগ এই শিক্ষাগুলোর প্রতি মনোযোগী হওয়াই প্রকৃত মুমিনের পরিচয়। আল্লাহ আমাদের সেই তওফিক দান করুন-আমিন।
লেখক : তালিবে ইলম ও প্রাবন্ধিক

কমেন্ট বক্স