ভোটকেন্দ্রে যেতে অনীহায় বাংলাদেশি প্রার্থীরা জিততে পারছেন না

প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০২৬, ১৬:০৭ , অনলাইন ভার্সন
নিউইয়র্কে বাংলাদেশি-আমেরিকান জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেলেও সেই হারে বাড়ছে না ভোটারদের অংশগ্রহণ। রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ এবং নির্বাচনী প্রচারণার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মতে- ভোটের দিন বাংলাদেশি ভোটারদের একটি বড় অংশ কেন্দ্রে না যাওয়ায় বিভিন্ন নির্বাচনে বাংলাদেশি প্রার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ আসনে পিছিয়ে পড়ছেন। ফলে সম্প্রদায়টির রাজনৈতিক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সেই শক্তি বাস্তবে রূপ পাচ্ছে না।
গত ২৩ জুন মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে নিউইয়র্কের বিভিন্ন নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যেখানে সামান্য ভোটের ব্যবধানে বিজয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ভোটার উপস্থিতি প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম ছিল। একই সঙ্গে শহরজুড়ে সাম্প্রতিক প্রাইমারি নির্বাচনেও ভোটার উপস্থিতি ছিল মাত্র প্রায় ১৭ শতাংশ, যা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের উদ্বিগ্ন করেছে।
নিউইয়র্ক সিটি, বিশেষ করে কুইন্স, ব্রুকলিন এবং ব্রঙ্কসে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর দ্রুত বিস্তার ঘটেছে। বাংলা ভাষায় ব্যালট, ভোটার গাইড এবং নির্বাচনী সহায়তা চালু হওয়াও এই সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক গুরুত্বের স্বীকৃতি। তবুও নির্বাচনের দিন বহু নিবন্ধিত ভোটার কেন্দ্রে যান না।
কমিউনিটির রাজনৈতিক কর্মীরা বলছেন, অনেকেই মনে করেন যে আমার একটি ভোটে কিছু আসে-যায় না। আবার অনেকে নির্বাচনের তারিখ জানেন না, আগাম ভোট বা ডাকযোগে ভোটের সুযোগ সম্পর্কেও অবগত নন। ফলে শেষ পর্যন্ত নিবন্ধিত ভোটারের একটি বড় অংশ ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন না। 
গত কয়েক বছরে নিউইয়র্কে সিটি কাউন্সিল, ডিস্ট্রিক্ট লিডার, জুডিশিয়াল ডেলিগেট, পার্টি কমিটি এবং অন্যান্য বিভিন্ন পদে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে তাদের অনেকেই জয়ের খুব কাছাকাছি গিয়েও পরাজিত হয়েছেন।
গত ২৩ জুন অনুষ্ঠিত ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে মাত্র ১১ ভোটের ব্যবধানে পিছিয়ে আছেন স্টেট অ্যাসেম্বলি (ডিস্ট্রিক্ট-৩০) প্রার্থী শামসুল হক। অথচ এই ডিস্ট্রিক্টের বাংলাদেশিরা কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিলে তার দ্বিগুণ ভোটে বিজয়ী হওয়ার কথা। 
শামসুল হক ঠিকানাকে জানান, অনেকের সাথে দেখা হলে ফলাফল শুনে আফসোস করছেন। তারা বলছেন, এত কম ব্যবধান জানলে ভোট দিতে অবশ্যই যেতাম। তিনি বলেন, শুধু এই ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার অনীহায় বাংলাদেশি প্রার্থীরা জিততে পারছেন না। 
শামসুল হক বলেন, নির্বাচনের আগে তিন দফায় ১০ হাজার বাড়ির দরজার ৩০ হাজার বার কড়া নেড়েছেন। সবাই ভোটকেন্দ্রে যাবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অথচ ভোটের দিন মাত্র ৩৯ শতাংশ ভোট দিয়েছেন। তিনি বলেন, জ্যাকসন হাইটসে সিংহ মার্কাসহ ৮-১০টি বিল্ডিংয়ে শত শত বাংলাদেশি বসবাস করেন। প্রতিদিন তারা স্কুলে বাচ্চা আনতে যান। কিন্তু তাদের বড় একটি অংশ ভোটের দিন ঘর থেকে বের হননি । 
তিনি মনে করেন, ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার এই মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। তবে এই পরিবর্তন কারো একার পক্ষে সম্ভব নয়। সমষ্টিগত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। 
তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশি কমিউনিটিতে অনেক নেতা আছেন। তারা মাঠে নামলে ফল ভিন্ন হতে পারতো। কিন্তু অনেককেই তিনি ভোটের মাঠে পাশে পাননি। অনেকে মূলধারার রাজনীতিক দাবি করলেও কোনো নির্বাচনী প্রচারে তাদের পাশে পাননি। 
শামসুল হক বলেন, ফল যাই হোক না কেন, তিনি থেমে থাকবেন না। ভোটার রেজিস্ট্রেশন কার্যকম অব্যাহত রাখবেন। ভোটের দিন কেন্দ্রে যেতে উৎসাহিত করবেন। কোনো ত্রুটি আছে কীনা যাচাই করার জন্য এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 
এদিকে ১১ ভোটে পিছিয়ে থাকলেও এখনো জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী শামসুল হক বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে ৬ হাজার ২০৩টি ব্যালট পরীক্ষা-নিরীক্ষার আবেদন করেছি। সেখানে আমার ভোট বাড়তে পারে, আবার কমতেও পারে। 
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলাদেশি ভোটারদের উপস্থিতি যদি আরও বেশি হতো, তাহলে এসব নির্বাচনের ফল ভিন্ন হতে পারত। অনেক ক্ষেত্রে নির্বাচনে ব্যবধান ছিল কয়েকশ’ ভোটেরও কম, অথচ সংশ্লিষ্ট এলাকায় হাজার হাজার বাংলাদেশি ভোটার নিবন্ধিত রয়েছেন।
কমিউনিটির প্রবীণ নেতাদের মতে, বাংলাদেশিরা নির্বাচন এলেই প্রার্থীর পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালান, কিন্তু ভোটারদের ঘরে ঘরে পৌঁছে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি এখনও শক্তিশালী নয়।
অন্যান্য অভিবাসী সম্প্রদায়- দেযমন ইহুদি, চীনা, ভারতীয়, কোরিয়ান কিংবা লাতিনো সম্প্রদায়—বছরের পর বছর ধরে ভোটার নিবন্ধন, আগাম ভোট এবং নির্বাচনের দিন ভোটার পরিবহনের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এর ফলে তাদের রাজনৈতিক প্রভাবও অনেক বেশি।
তরুণ বাংলাদেশি-আমেরিকানদের মধ্যে রাজনীতি নিয়ে আগ্রহ আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেলেও সেই আগ্রহ এখনও ভোটকেন্দ্র পর্যন্ত পুরোপুরি পৌঁছায়নি। সামাজিক মাধ্যমে সচেতনতা বাড়লেও বাস্তবে ভোটদানের হার আশানুরূপ নয় বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সাম্প্রতিক নিউইয়র্কের নির্বাচনে বিভিন্ন প্রার্থী স্বল্প ভোটার উপস্থিতির মধ্যেই জয়ী হয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, সুসংগঠিত ভোটার উপস্থিতি অনেক সময় নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করে দেয়।
কমিউনিটির নেতাদের মতে, এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের সময়। তাদের সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে-সারা বছরব্যাপী ভোটার নিবন্ধন কর্মসূচি পরিচালনা। নতুন নাগরিকদের ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত করতে সহায়তা করা। মসজিদ, কমিউনিটি সেন্টার ও সংগঠনের মাধ্যমে ভোটের গুরুত্ব তুলে ধরা। তরুণ ভোটারদের লক্ষ্য করে বাংলা ও ইংরেজি- দুই ভাষায় সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো। নির্বাচনের দিন স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে ভোটার পরিবহনের ব্যবস্থা করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিউইয়র্কে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় শক্তিশালী। ব্যবসা, চিকিৎসা, প্রকৌশল, শিক্ষা এবং গণমাধ্যমসহ নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশিরা সফলতার স্বাক্ষর রাখছেন। এখন সেই সামাজিক শক্তিকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ভোটাধিকার প্রয়োগ।
কমিউনিটির প্রবীণদের ভাষায়, ‘প্রার্থী হওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভোট দিতে যাওয়া।’ কারণ একটি নির্বাচনে মাত্র কয়েকশ’ ভোটই একজন বাংলাদেশি প্রার্থীকে বিজয়ী কিংবা পরাজিত করতে পারে। আর সেই বাস্তবতাই আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে—নিউইয়র্কে বাংলাদেশিদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ভোটকেন্দ্রে তাদের উপস্থিতির ওপর।
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]