​জাতীয় সংসদে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ পাস

প্রকাশ : ৩০ জুন ২০২৬, ১৮:৪৩ , অনলাইন ভার্সন
জাতীয় সংসদে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ পাস হয়েছে। নতুন এ আইনের মাধ্যমে ১৮৬৭ সালের প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো ‘দ্য পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট, ১৮৬৭’ রহিত করা হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জুয়া, অনলাইন বেটিং, অর্থপাচার ও ডিজিটাল প্রতারণা মোকাবিলায় নতুন এই আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (৩০ জুন) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি উত্থাপন করেন। এর আগে গত ২৩ জুন বিলটি সংসদে উত্থাপনের পর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছিল।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিদ্যমান আইনটি বর্তমান সময়ের প্রযুক্তিনির্ভর জুয়ার ধরন মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়। সংবিধানের ১৮(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রকে জুয়া নিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জেলা প্রশাসক সম্মেলনেও আইনটি যুগোপযোগী করে শাস্তির মাত্রা বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল ক্যাসিনো, ক্রিপ্টোকারেন্সিভিত্তিক জুয়া, ভুয়া সিম, ভুয়া মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট, বায়োমেট্রিক জালিয়াতি, ভিপিএন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে পরিচালিত জুয়া ও অর্থপাচার দেশের সামাজিক শৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও তরুণ সমাজের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।

নতুন আইনে জুয়া, অনলাইন জুয়া, দূরবর্তী জুয়া, বেটিং, বাজিকর (বুকমেকার), ম্যাচ ফিক্সিং, স্পট ফিক্সিং, ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম, ডিজিটাল ওয়ালেট, ক্রিপ্টোকারেন্সি, ভুয়া সিম, ঘোস্ট সিম, মিরর সাইট ও ভিপিএনসহ মোট ২৪ ধরনের বিষয়কে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।

একই সঙ্গে ১৪ ধরনের অপরাধের জন্য কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

যেসব অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে
আইন অনুযায়ী, সাধারণ জুয়ার অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড অথবা দুই লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে।

অনলাইন বা দূরবর্তী জুয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং এক কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। অন্যদিকে অনলাইন বেটিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা যাবে।

জুয়ার স্থান পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবহারের দায়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও চার লাখ টাকা জরিমানার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ভবন, কক্ষ, যানবাহন, সার্ভার বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা আদালতকে দেওয়া হয়েছে।

জুয়ার সামগ্রী প্রস্তুত, সংরক্ষণ, বিক্রি, বিতরণ বা ব্যবহারের জন্য সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে এসব সামগ্রী বাজেয়াপ্ত বা ধ্বংসের নির্দেশ দিতে পারবেন আদালত।

বাজিকর বা বুকমেকার হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

ম্যাচ ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও এক কোটি টাকা জরিমানা এবং স্পট ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। আদালত প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে স্থায়ী বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য খেলাধুলা ও ক্রীড়া কার্যক্রমে অংশগ্রহণে অযোগ্য ঘোষণা করতে পারবেন।

বিজ্ঞাপন ও প্রচারণাতেও শাস্তি
জুয়ার বিজ্ঞাপন, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা, মিথ্যা লাভের প্রতিশ্রুতি, স্পন্সরশিপ, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং কিংবা রেফারেল ক্যাম্পেইন পরিচালনার দায়ে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ইনফ্লুয়েন্সার, শিল্পী বা খেলোয়াড়দের সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করা যাবে।

ভিপিএন, প্রক্সি, মিরর সাইট, হোস্টিং, ডোমেইন সার্ভিস বা ক্লাউড অবকাঠামো ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনার জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও পাঁচ কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

ভুয়া সিম, ঘোস্ট সিম, ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট বা বায়োমেট্রিক জালিয়াতির মাধ্যমে জুয়া পরিচালনার জন্য সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে সংঘবদ্ধভাবে বা অর্থপাচারের উদ্দেশ্যে এসব অপরাধ করলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড দেওয়া যাবে।

অর্থপাচার ও করপোরেট দায়বদ্ধতা
আইনে বলা হয়েছে, জুয়ার অর্থ ব্যাংক, এমএফএস, ডিজিটাল ওয়ালেট, হাওলা, হুন্ডি কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লেনদেন, গোপন বা বৈধ করার চেষ্টা করলে তা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর আওতাভুক্ত অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

কোনো কোম্পানি, ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম, হোস্টিং সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বা পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হলে সংশ্লিষ্ট পরিচালক, ব্যবস্থাপক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা যাবে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধন, লাইসেন্স বা কার্যক্রম স্থগিত কিংবা বাতিল করার ক্ষমতাও আদালতের থাকবে।

একই অপরাধ পুনরায় সংঘটিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তির দ্বিগুণ পর্যন্ত দণ্ড দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

বাজেয়াপ্ত, বিচার ও ব্লক করার ক্ষমতা
নতুন আইনে অপরাধে ব্যবহৃত অর্থ, সম্পদ, ব্যাংক হিসাব, এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ডিজিটাল ও ক্রিপ্টো ওয়ালেট, সার্ভার, ডোমেইন, সিম ও অন্যান্য ডিভাইস বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা আদালতকে দেওয়া হয়েছে।

অনলাইন জুয়া ও সাইবার স্পেসে সংঘটিত অপরাধের বিচার হবে সাইবার ট্রাইব্যুনালে এবং অন্যান্য অপরাধের বিচার হবে সংশ্লিষ্ট ফৌজদারি আদালতে। আইনের অধীন সব অপরাধকে আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য ও আপস অযোগ্য হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

এছাড়া সরকার জনস্বার্থে জুয়া ও বেটিং-সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, সার্ভার, ডোমেইন, আইপি অ্যাড্রেস, ইউআরএল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ, গ্রুপ বা চ্যানেল ব্লক কিংবা নিষিদ্ধ করতে পারবে।

একই সঙ্গে জুয়া ও অর্থপাচার প্রতিরোধে জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট ডেটাবেজ, এনআইডি-সিম-এমএফএস সংযুক্তি ব্যবস্থা, বায়োমেট্রিক ও ফেসিয়াল রিকগনিশনভিত্তিক যাচাই পদ্ধতি এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।

সরকারের মতে, নতুন এই আইন কার্যকর হলে প্রযুক্তিনির্ভর জুয়া, অনলাইন বেটিং, ডিজিটাল আর্থিক প্রতারণা ও অর্থপাচার রোধে কার্যকর আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হবে এবং দেশের সামাজিক শৃঙ্খলা, জননিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ঠিকানা/এসআর
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]