মধ্যবর্তী নির্বাচনের ধাক্কা

এআই খাতের শেয়ারে ধস, নাসডাক হারাল আড়াই ট্রিলিয়ন ডলার

প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১২:১০ , অনলাইন ভার্সন
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জয়ের পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির প্রসার ধীর হওয়ার শঙ্কায় বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারের ব্যাপক দরপতন হয়েছে।

রয়টার্স লিখেছে, ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় এআই অবকাঠামো, বিশেষ করে ডেটা সেন্টার নির্মাণে সরকারি নজরদারি ও বিধিনিষেধ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এ খাতের বিনিয়োগকারীদের অনেকে।

মূলত এমন আশঙ্কা থেকেই বৃহস্পতিবার ওয়াল স্ট্রিটে শেয়ার বিক্রি করে দেওয়ার ব্যাপক চাপ তৈরি হয়। আর তাতে যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়ার প্রধান প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য থেকে শত শত বিলিয়ন ডলার স্রেফ মুছে যায়।

রয়টার্সের খবরে বলা হচ্ছে, এই ধসের জেরে বৃহস্পতিবারের লেনদেন শেষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি-নির্ভর শেয়ারবাজার নাসডাক কম্পোজিট সূচক ৫ দশমিক ৫ শতাংশেরও বেশি কমে যায়।

২০২৫ সালের এপ্রিলে ডনাল্ড ট্রাম্পের 'লিবারেশন ডে'-এর পর নাসডাকে এক দিনে এটিই সবচেয়ে বড় দরপতনের ঘটনা।

অন্যদিকে নাসডাক-১০০ সূচক কমেছে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। ডাও জোন্সের হিসাব অনুযায়ী, নাসডাক-১০০ সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য থেকে একদিনে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার উধাও হয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা সেনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—কংগ্রেসের দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। এর ফলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি সময়ে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ থাকছে ডেমোক্র্যাটদের হাতে।

নির্বাচনী প্রচারে ডেটা সেন্টারের সম্প্রসারণ এবং এআই প্রযুক্তির বিকাশের গতি নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের অনেকে। দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ডেটা সেন্টার নির্মাণ সীমিত করার প্রস্তাবেও ভোট হয়েছে।

বিবিসি লিখেছে, নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের পর এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা।

তবে শেয়ারবাজারের এই পতনের পেছনে শুধু নির্বাচনের ফল নয়, এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত মুনাফা পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও আগে থেকেই উদ্বেগ ছিল।

এআই অবকাঠামো নিয়ে শঙ্কা
এআই প্রযুক্তি পরিচালনার জন্য বিপুল কম্পিউটিং সক্ষমতা প্রয়োজন। এ কারণে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ডেটা সেন্টার, উন্নত চিপ ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে। কিন্তু এসব বিনিয়োগের আর্থিক সুফল কত দ্রুত পাওয়া যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনি প্রচারে ডেটা সেন্টারের পরিবেশগত প্রভাব, বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।

ডেমোক্র্যাট সেনেটর বার্নি স্যান্ডার্স বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে বলেন, বড় প্রযুক্তি কোম্পানির মালিকদের একচেটিয়া প্রভাব পরিবেশ ধ্বংস করছে, কর্মসংস্থান কমাচ্ছে এবং মানবজাতির ভবিষ্যৎকে হুমকিতে ফেলছে। এ কারণে তিনি দেশজুড়ে নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণে স্থগিতাদেশ দেওয়ার দাবি জানান।

টেক্সাসের নবনির্বাচিত ডেমোক্র্যাট গভর্নর জিনা হিনোজোসাও নির্বাচনি প্রচারে নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণে স্থগিতাদেশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা, ডেটা সেন্টার নির্মাণে অনুমোদন পেতে বাড়তি পরিবেশগত পর্যালোচনা ও স্থানীয় পর্যায়ের বিরোধিতার মুখে পড়তে পারে প্রযুক্তি খাতের কোম্পানিগুলো। তাতে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে।

ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান স্যাক্সোর প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ চারু চানানা বিবিসিকে বলেন, ডেটা সেন্টারের অনুমোদন, পরিবেশের ওপর এর প্রভাব এবং বিদ্যুৎ বিল নিয়ে বাড়তি যাচাই-বাছাই প্রকল্পগুলো বিলম্বিত করতে পারে এবং পুরো শিল্পের ব্যয় বাড়াতে পারে।

ইউবিএস এর বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে রয়টার্স লিখেছে, ২০২৮ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ডেটা সেন্টারের যে সক্ষমতা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে, তার প্রায় ৩০ শতাংশ নির্মাণকাজ স্থগিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

চিপ নির্মাতাদের জন্য বড় ধাক্কা
এআই প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় চিপ ও যন্ত্রপাতি তৈরি করে এমন কোম্পানিগুলোর শেয়ারেই সবচেয়ে বড় পতন দেখা গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে বৃহস্পতিবারের লেনদেনে এনভিডিয়ার শেয়ারদর কমেছে ৯ শতাংশের বেশি। অ্যাডভান্সড মাইক্রো ডিভাইসেস বা এএমডির শেয়ার কমেছে ১৭ শতাংশের বেশি। মাইক্রনের শেয়ারও ১৭ শতাংশের বেশি কমেছে। মেমোরি কার্ড নির্মাতা স্যানডিস্কের দরপতন হয়েছে ২২ শতাংশের বেশি।

সেমিকন্ডাক্টর খাতের ৩০টি বড় কোম্পানির শেয়ারের দর পর্যবেক্ষণ করা ফিলাডেলফিয়া সেমিকন্ডাক্টর সূচক কমেছে প্রায় ১২ শতাংশ।

এআই অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত ডেটা সেন্টার পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলোর শেয়ারেও বড় পতন হয়েছে। কোরউইভের শেয়ার দর কমেছে ১০ শতাংশ, আর নেবিয়াসের কমেছে ১৫ শতাংশ।

ইলন মাস্কের কোম্পানি স্পেসএক্স ও টেসলার শেয়ারদর যথাক্রমে ৮ শতাংশ ও প্রায় ১১ শতাংশ কমেছে। তাতে বৃহস্পতিবারের লেনদেনে এ দুই কোম্পানির সম্মিলিত বাজারমূল্য থেকে ৩০ হাজার কোটি ডলার হারিয়ে গেছে।

অ্যাপল, এনভিডিয়া ও টেসলাসহ যুক্তরাষ্ট্রের সাতটি শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানির সমন্বিত বাজারমূল্য একদিনে প্রায় এক লাখ কোটি ডলার কমেছে বলে বিবিসি জানিয়েছে।

‘সংশোধন’ পর্যায়ে নাসডাক
বৃহস্পতিবারের পতনের পর নাসডাক কম্পোজিট সূচক ৬ অক্টোবরের রেকর্ড অবস্থান থেকে প্রায় ১২ শতাংশ নিচে নেমে এসেছে। শেয়ারবাজারের ভাষায়, কোনো সূচক বা প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর সাম্প্রতিক সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে ১০ শতাংশ বা তার বেশি কমলে তাকে ‘কারেকশন’ বা সংশোধনের পর্যায় বলা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য প্রধান শেয়ার সূচকেও বড় পতন হয়েছে। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক কমেছে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ কমেছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ।

বিনিয়োগ কোম্পানি ওয়েলথ ক্লাবের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ সুসান্নাহ স্ট্রিটার বলেন, এআই খাতে নতুন করে আতঙ্ক ওয়াল স্ট্রিটে বড় ধাক্কা দিয়েছে।

তিনি বলেন, এআই অবকাঠামোয় বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে যে মুনাফার প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তা পাওয়া যাবে কি না, সেই আশঙ্কার সঙ্গে ডেটা সেন্টার নির্মাণে বড় ধরনের ধীরগতির সম্ভাবনা যুক্ত হয়েছে।

এশিয়ার বাজারেও পতন
যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি শেয়ারের দরপতনের প্রভাব পড়েছে এশিয়ার বাজারেও। শুক্রবার দিনের শুরুতে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের প্রযুক্তিনির্ভর শেয়ার সূচকে বড় পতন দেখা যায়।

জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক দিনের শুরুর দিকে ৬ শতাংশ কমে যায়। দেশটির মেমোরি চিপ নির্মাতা কিওক্সিয়ার শেয়ারদর কমে ১২ দশমিক ৬ শতাংশের বেশি। টোকিও ইলেকট্রনের দর কমে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ।

দক্ষিণ কোরিয়ার চিপ নির্মাতা এসকে হাইনিক্সের শেয়ারদর কমেছে ১১ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি। স্যামসাংয়ের দর কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ।

এর প্রভাবে দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক ৮ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি কমে যায়। দরপতনের গতি সামাল দিতে দেশটির শেয়ারবাজারে ‘সার্কিট ব্রেকার’ কার্যকর করা হয়।

তাইওয়ানের তাইএক্স সূচক কমেছে ৮ দশমিক ৩ শতাংশের বেশি। দেশটির বৃহৎ চিপ নির্মাতা টিএসএমসির শেয়ারদর কমেছে প্রায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এআই অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয়ের পরিমাণ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ নতুন নয়। নির্বাচনের ফলাফল সেই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

মার্কেটওয়াচের চিপ বিশ্লেষক ব্রিটনি নগুয়েন বিবিসিকে বলেন, এই দরপতনে এআই খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ নিয়ে উদ্বেগেরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

এআই শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন
রয়টার্স লিখেছে, শেয়ারবাজারের এই দরপতন এআই খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তৈরি হওয়া উদ্বেগকেও সামনে এনেছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে কতটা মুনাফা আসবে, তা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে।

এআই খাতের নেতারাও ডেটা সেন্টার নির্মাণ নিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিরোধিতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন।

ওপেনএআইয়ের প্রেসিডেন্ট ও সহপ্রতিষ্ঠাতা গ্রেগ ব্রকম্যান বলেন, ডেটা সেন্টার নিয়ে মানুষের প্রতিক্রিয়া সবাইকে বিস্মিত করেছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে এসব প্রকল্পের পক্ষে আনতে আরও কাজ করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রযুক্তিবিষয়ক এক সম্মেলনে বুধবার তিনি বলেন, শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো প্রকল্পের পক্ষে প্রচার চালিয়ে সেটিকে স্থানীয় মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে হবে।

মেটার প্রেসিডেন্ট দিনা পাওয়েল ম্যাককরমিকও বলেন, এআইকে ইতিবাচক প্রযুক্তি হিসেবে তুলে ধরতে কোম্পানিগুলোকে আরও বেশি উদ্যোগ নিতে হবে।
Image
এদিকে নির্বাচনের ফলাফলের পর শেয়ারবাজারের পতন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তিনি নির্বাচনের ফলাফলের সঙ্গে শেয়ারবাজারের পতনের সম্পর্ক তুলে ধরে ডেমোক্র্যাটদের সমালোচনা করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এআই প্রযুক্তি দীর্ঘ মেয়াদে বিশ্ব অর্থনীতি ও প্রযুক্তি খাতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এই প্রযুক্তি ঘিরে তৈরি হওয়া বিনিয়োগের উন্মাদনা এবং কোম্পানিগুলোর বর্তমান বাজারমূল্য বাস্তবসম্মত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

ঠিকানা/এসআর
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]