আগামী প্রজন্ম গঠনে সমন্বিত শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা

প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১:২৩ , অনলাইন ভার্সন
একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার আগামী প্রজন্মের চিন্তা, চরিত্র, নৈতিকতা ও আদর্শ দিয়ে। যে পরিবার সন্তানকে শুধু বৈষয়িক সাফল্যের জন্য প্রস্তুত করে, কিন্তু তার নৈতিক ও আদর্শিক ভিত্তি গড়ে তোলে না, সে পরিবার সাময়িক সাফল্য পেলেও দীর্ঘ মেয়াদে মূল্যবোধের সংকটে পড়তে পারে। ভালো ফলাফল, প্রতিষ্ঠিত পেশা ও আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের পাশাপাশি প্রয়োজন সততা, দায়িত্ববোধ, মানবিকতা এবং জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা। ইসলাম সন্তান প্রতিপালনের এই দায়িত্বকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।’ (সুরা আত-তাহরিম, ৬৬ : ৬)। এই নির্দেশ পরিবারে বিশ্বাস, জ্ঞান, নৈতিকতা, ন্যায়বিচার ও তাকওয়াভিত্তিক জীবন গড়ে তোলার দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়।
বর্তমানে মুসলিম সমাজের একটি বড় সংকট হলো, অনেক ক্ষেত্রে ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থার পরিবর্তে কিছু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা হয়। নামাজ, রোজা, জিকির, দোয়া ও ধর্মীয় আলোচনা মানুষের বিশ্বাস ও আত্মশুদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন। এগুলোর শিক্ষা মানুষের চরিত্র, লেনদেন ও সামাজিক আচরণেও প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন। বিশ্বাস, ইবাদত, পরিবার, শিক্ষা, অর্থনীতি, বিচার, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাষ্ট্রপরিচালনা, প্রতিবেশীর অধিকার ও পরিবেশের প্রতি দায়িত্ব—সব ক্ষেত্রেই ইসলামের নৈতিক নির্দেশনা রয়েছে। সন্তানদের সামনে এই ব্যাপকতা তুলে না ধরলে তারা ধর্মকে জীবনের অন্য অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন একটি বিষয় হিসেবে বুঝতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কার তেরো বছরে মানুষের বিশ্বাস ও চিন্তাজগতে গভীর পরিবর্তন এনেছিলেন। তাওহিদ, সত্যবাদিতা, ন্যায়বিচার, মানবমর্যাদা এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহির ধারণা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মদিনায় তিনি এমন সমাজ গড়ে তোলেন, যেখানে মসজিদ ইবাদতের পাশাপাশি শিক্ষা, পরামর্শ, বিচার, সামাজিক কল্যাণ ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। ইসলামের প্রথম প্রজন্ম ব্যক্তিগত ইবাদত ও সামাজিক দায়িত্বের মধ্যে গভীর সম্পর্ক উপলব্ধি করেছিল। তাদের কাছে ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে নৈতিক আচরণ, দায়িত্ব পালন এবং মানুষের অধিকার রক্ষার অঙ্গীকার যুক্ত ছিল।
ইসলামি সভ্যতার ইতিহাসেও জ্ঞানচর্চার ব্যাপকতা দেখা যায়। মুসলিম সভ্যতার সমৃদ্ধ সময়ে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, দর্শন, রসায়ন ও প্রকৌশলে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা হয়েছে। জ্ঞান অর্জনকে মানবকল্যাণ এবং স্রষ্টার সৃষ্টি সম্পর্কে উপলব্ধি বৃদ্ধির মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়েছে। সন্তানদের এই বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করা প্রয়োজন। এতে তারা বুঝতে পারবে, বিশ্বাসের প্রতি অঙ্গীকারের সঙ্গে অনুসন্ধিৎসা, গবেষণা ও সৃজনশীলতার সম্পর্ক রয়েছে। শুধু অতীতের গৌরবের কথা বললে চলবে না; বর্তমানের সমস্যা সমাধানে অধ্যবসায় ও দক্ষতার প্রয়োজনও শেখাতে হবে।
তবে মনে রাখতে হবে, প্রত্যেক মানুষ নিজের বিশ্বাস ও কাজের জন্য দায়ী। সৎ পিতার সন্তান অবশ্যই সৎ হবে কিংবা পথভ্রষ্ট পরিবারের সন্তান সৎ হতে পারবে না—এমন নিশ্চয়তা নেই। কোরআনে নুহ (আ.)-এর পুত্রের ঘটনা রয়েছে, যে নবীর পরিবারে জন্ম নিয়েও বিশ্বাস গ্রহণ করেনি। ইবরাহিম (আ.) মূর্তিপূজার পরিবেশের বিরোধিতা করে তাওহিদের মহান প্রচারক হয়েছিলেন। ফেরাউনের স্ত্রীও বিশ্বাসের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছেন। এসব ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয়, হেদায়েত আল্লাহর হাতে এবং ব্যক্তির নিজস্ব সিদ্ধান্তের গুরুত্ব রয়েছে। মা-বাবা দায়িত্ব পালন করবেন, কিন্তু সন্তানের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে তাদের ধার্মিকতার সরল মাপকাঠি বানানো সংগত নয়।
এ কারণে পারিবারিক শিক্ষার গুরুত্ব কমে না। পরিবারই শিশুর প্রথম বিদ্যালয়। সন্তান মা-বাবার বক্তব্যের পাশাপাশি তাদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে। বাবা নিয়মিত নামাজ পড়লেও ব্যবসায় অসৎ হলে, মা ধর্মীয় অনুশীলন করেও প্রতিবেশীর অধিকার উপেক্ষা করলে কিংবা ঘরে কোরআন তিলাওয়াতের পাশাপাশি মিথ্যা, গিবত ও অন্যায় চলতে থাকলে সন্তান অসংগতি দেখতে পায়। তার মনে ধর্মীয় শিক্ষা ও বাস্তব জীবনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। বিপরীতে, বড়রা ভুল স্বীকার করলে, প্রতিশ্রুতি রাখলে এবং দুর্বল মানুষের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করলে সন্তান মূল্যবোধের বাস্তব রূপ শিখতে পারে।
পারিবারিক পরিবেশে স্নেহ, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক সম্মান অপরিহার্য। ভয় দেখিয়ে সাময়িক আনুগত্য আদায় করা সম্ভব হলেও গভীর বিশ্বাস ও নৈতিক বিচারবোধ গড়ে তুলতে প্রয়োজন বোঝাপড়া। সন্তান যেন নিজের প্রশ্ন, সংশয়, ভুল ও অভিজ্ঞতা মা-বাবার কাছে বলতে পারে। তার কথা শোনা মানে সব আচরণ অনুমোদন করা নয়; বরং সংশোধনের জন্য আস্থার সম্পর্ক তৈরি করা। শাসনে ন্যায়সংগত সীমা থাকবে, কিন্তু অপমান, তুলনা ও অবমাননাকর ভাষা এড়িয়ে চলতে হবে। অন্যের মর্যাদা রক্ষার শিক্ষা ঘরের সম্পর্ক থেকেই শুরু হয়।
বর্তমান যুগে সন্তান প্রতিপালনের চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হয়েছে। ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিনোদনজগৎ ও বৈশ্বিক সংস্কৃ তি তরুণদের চিন্তায় প্রতিদিন প্রভাব ফেলছে। ধর্ম কী, স্বাধীনতার সীমা কোথায়, নৈতিকতার ভিত্তি কী, পরিবার কেন প্রয়োজন এবং জীবনের উদ্দেশ্য কী-এমন বহু প্রশ্ন তাদের সামনে আসে। পরিবার ও সমাজ জ্ঞানভিত্তিক আলোচনার সুযোগ না দিলে তারা অন্য উৎসের ওপর নির্ভর করবে। তাই ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষায় আবেগের পাশাপাশি যুক্তি, প্রজ্ঞা, ইতিহাস এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রয়োজন।
মা-বাবার দায়িত্ব শুধু বিধান জানানো নয়: তার তাৎপর্যও বোঝানো। সত্যবাদিতা কেন জরুরি, সুদ কেন নিষিদ্ধ, ন্যায়বিচার কেন ইসলামের মৌলিক শিক্ষা, দুর্নীতি কেন অপরাধ এবং মানুষের অধিকার রক্ষা কেন দায়িত্ব-এসব বয়সোপযোগী ভাষায় ব্যাখ্যা করতে হবে। সন্তান প্রশ্ন করলে তাকে সন্দেহের চোখে দেখা বা অপমান করা উচিত নয়। ধৈর্যশীল আলোচনা বোঝাপড়াকে গভীর করে। কোনো প্রশ্নের উত্তর জানা না থাকলে তা স্বীকার করে নির্ভরযোগ্য আলেম, শিক্ষক বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জ্ঞানী মানুষের সহায়তা নেওয়াও দায়িত্বশীল আচরণ।
প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও শুধু নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট নয়। সন্তানকে তথ্য যাচাই, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা, অনলাইনে শালীন আচরণ এবং সময় ব্যবস্থাপনা শেখাতে হবে। উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য বা জনপ্রিয় ভিডিও দেখেই সিদ্ধান্ত না নিয়ে উৎস ও প্রমাণ পরীক্ষা করার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। মা-বাবার নিজেদের প্রযুক্তি ব্যবহারেও সংযম থাকা উচিত। ঘরে পাঠাভ্যাস, পারিবারিক আলোচনা, খেলাধুলা ও সেবামূলক কাজের সুযোগ থাকলে সন্তান অর্থপূর্ণ বিকল্প পায়।
আধুনিক জ্ঞান ও ইসলামি মূল্যবোধের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় বিরোধ সৃষ্টি করা উচিত নয়। একজন মুসলিম দক্ষ বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, অর্থনীতিবিদ, শিক্ষক, সৈনিক, বিচারক বা রাষ্ট্রপরিচালক হতে পারেন। তার পেশাগত সততা, যোগ্যতা, দায়িত্বশীলতা ও মানুষের সেবা ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রকাশ হতে পারে। শুধু পরীক্ষার ফল বা উচ্চ আয়ের পেশাকে সাফল্যের মানদণ্ড করলে শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। স্বাধীনভাবে চিন্তা করা, মনোযোগ দিয়ে কাজ করা, প্রমাণ বিচার, ভুল সংশোধন এবং নৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সামর্থ্যও প্রয়োজন।
নৈতিক শিক্ষাকে দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। নিজের কাজ করা, সময়মতো দায়িত্ব পালন, ধার করা জিনিস ফেরত দেওয়া, অপচয় এড়ানো এবং অন্যের শ্রমের মর্যাদা বোঝা ছোটবেলা থেকেই শেখানো যায়। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী দান ও সেবায় সন্তানকে যুক্ত করা যেতে পারে। অসুস্থ আত্মীয়ের খোঁজ নেওয়া, প্রতিবেশীকে সাহায্য করা বা অসহায় মানুষের প্রতি সম্মান দেখানোর অভিজ্ঞতা মানবিকতা গড়ে তোলে। ন্যায়বিচারের শিক্ষা তখনই অর্থপূর্ণ হয়, যখন নিজের সুবিধার বিরুদ্ধেও ন্যায্য আচরণ করতে শেখানো হয়।
মুসলিম পরিবারের দায়িত্ব হলো এমন বিশ্বদৃষ্টি গড়ে তুলতে সাহায্য করা, যেখানে কোরআন তিলাওয়াতের পাশাপাশি জীবন পরিচালনার নির্দেশনা দেয় এবং সুন্নাহ চরিত্র গঠনের জীবন্ত আদর্শ হয়। এই শিক্ষার প্রকাশ ঘটবে প্রতিশ্রুতি রক্ষা, আমানতদারি, দুর্বলের পাশে দাঁড়ানো এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নৈতিক সাহসে। ভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি বা মতের মানুষের সঙ্গেও ন্যায়সংগত ও সম্মানজনক আচরণ শেখাতে হবে। নিজের বিশ্বাসে দৃঢ় থাকা এবং অন্যের অধিকার রক্ষা একসঙ্গে সম্ভব।
সস্তানের বিশ্বাস ও চরিত্র গঠনের দায়িত্ব শুধু মক্তব, মাদরাসা, বিদ্যালয়, মসজিদ কিংবা কোনো ইসলামি সংগঠনের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। এসব প্রতিষ্ঠান সহযোগিতা করবে, কিন্তু পারিবারিক দায়িত্ব অব্যাহত থাকবে। মা-বাবার উচিত সন্তানের শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং তার আচরণ, আগ্রহ ও সমস্যার বিষয়ে সচেতন থাকা। ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষার মধ্যে সংযোগ তৈরিতে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা প্রয়োজন। সন্তান যেন বিভিন্ন জায়গায় পরস্পরবিরোধী আচরণ দেখে বিভ্রান্ত না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে। সন্তানদের জন্য মূল্যবান উত্তরাধিকার হলো বিশুদ্ধ বিশ্বাস, সৎ চরিত্র, জ্ঞান, নৈতিক সাহস এবং সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর শিক্ষা। সম্পদ জীবনের প্রয়োজন মেটাতে পারে। এসব গুণ সম্পদ ও ক্ষমতার দায়িত্বশীল ব্যবহার শেখায়। যে পরিবার নিজের আচরণে সততা, ন্যায়বিচার ও মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে, সে আগামী প্রজন্মের জন্য স্থায়ী ভিত্তি তৈরি করে। বিশ্বাস ও কর্মের এই সামঞ্জস্য থেকেই এমন মানুষ গড়ে উঠতে পারে, যারা নিজেদের আদর্শে দৃঢ় থেকে জ্ঞান, সততা ও মানবসেবার মাধ্যমে সমাজকে ইতিবাচক নেতৃত্ব দেবে।
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]