বিচার-সালিস : বদলে যাওয়া এক গ্রামীণ ঐতিহ্য

প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১৯:৪১ , অনলাইন ভার্সন
বাংলাদেশ ঐতিহ্য, সম্ভাবনা ও সামাজিক সম্প্রীতিতে সমৃদ্ধ এক অনন্য দেশ। এ দেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধ আমাদের গর্বের অন্যতম উৎস। একসময় আমাদের গ্রামীণ সমাজে বিচার-সালিসের যে ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল, তা সামাজিক বিরোধ মীমাংসার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথা হিসেবে বিবেচিত হতো। আমি নিজেও কয়েকটি সালিসে উপস্থিত থাকার সুযোগ পেয়েছি। সেই অভিজ্ঞতাগুলো আজও স্মৃতির গভীরে অম্লান হয়ে আছে। আমার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, সে সময় আমাদের গ্রামে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হতো। সালিসের সিদ্ধান্তে অর্থের প্রভাব পড়তে আমি দেখিনি।
গোষ্ঠীনির্ভর গ্রামীণ সমাজব্যবস্থায় প্রতিটি গোষ্ঠীর একজন বা দুজন সম্মানিত নেতা থাকতেন, যাঁদের মতামত ও সিদ্ধান্তকে মানুষ শ্রদ্ধা করতেন এবং গুরুত্ব দিতেন।
আমাদের গ্রামে তিনটি প্রধান গোষ্ঠী ছিল। আব্দুল মতিন (মতিন স্যার), মহারাজ মিয়া (ভাইস চেয়ারম্যান) এবং নূর মিয়া ছিলেন এসব গোষ্ঠীর প্রধান। তাঁদের নেতৃত্ব কোনো লিখিত নিয়মের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ছিল না; বরং সমাজের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত স্বীকৃতি, আস্থা ও শ্রদ্ধার মধ্য দিয়েই তাঁরা নেতৃত্বের অবস্থান অর্জন করেছিলেন। এ ছাড়া কয়েকটি ছোট গোষ্ঠীও ছিল, তবে সেগুলোর প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম ছিল।
তাঁরা ন্যায়পরায়ণ ও বিচক্ষণ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সাধারণ মানুষ তাঁদের সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা রাখতেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও তাঁদের সম্মান করতেন এবং অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দিতেন। আমাদের গ্রামে মামলা-মোকদ্দমা ছিল খুবই কম। অধিকাংশ বিরোধ বা দ্বন্দ্ব সালিসের মাধ্যমেই মীমাংসা হয়ে যেত। আমার অভিজ্ঞতায়, সে সময়টি ছিল গ্রামের বিচার-সালিসব্যবস্থার একটি স্মরণীয় ও আস্থাপূর্ণ অধ্যায়।
যেকোনো বিচার-সালিসে গোষ্ঠীগুলোর অভিজ্ঞ ও সম্মানিত ব্যক্তিদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হতো। সবার বিশ্বাস ছিল, তাঁদের উপস্থিতিতে নিরপেক্ষ বিচার হওয়ার এবং অবিচার এড়ানোর সম্ভাবনা বাড়ত। সালিস বসলে উভয় পক্ষের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনা হতো। এরপর প্রকৃত ঘটনা যাচাই করে গোষ্ঠীপ্রধান বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সিদ্ধান্ত দিতেন। অনেক ক্ষেত্রে উপস্থিত গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সম্মিলিত আলোচনার মাধ্যমেও সিদ্ধান্তে পৌঁছাতেন।
সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর তা বাস্তবায়নের দায়িত্বও গোষ্ঠীপ্রধানেরা নিজেরাই নিতেন। এর ফলে বিরোধ মীমাংসার পাশাপাশি পারস্পরিক সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার সুযোগ তৈরি হতো। সামগ্রিকভাবে, আমাদের গ্রামের সামাজিক পরিবেশ ছিল শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ।
তবে গ্রামীণ সালিসব্যবস্থার কিছু সীমাবদ্ধতাও ছিল। সব ক্ষেত্রে যে নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত হতো, তা বলা যায় না। কখনো সামাজিক মর্যাদা, গোষ্ঠীগত আনুগত্য কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মতামত সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারত। বিশেষ করে, দুর্বল বা কম প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সব সময় নিজেদের বক্তব্য সমানভাবে তুলে ধরার সুযোগ পেতেন কি না, সে প্রশ্নও থেকে যায়। তাই অতীতের সালিসব্যবস্থার ইতিবাচক দিকগুলোর পাশাপাশি এর সীমাবদ্ধতাগুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
আমাদের গ্রামের সেই সময়কার পরিবেশে বিরোধ মীমাংসায় সালিসের ভূমিকা কেমন ছিল, তার একটি ঘটনা আজও মনে পড়ে। একবার স্থানীয় হাটে কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে দুই ব্যক্তির মধ্যে তীব্র কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। এর জেরে দ্রুত দুই গোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি শান্ত করেন এবং বিরোধ মীমাংসার জন্য সালিসের ব্যবস্থা করেন।
নির্ধারিত দিনে সালিস বসত। উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর কারও অন্যায় প্রমাণিত হলে তাঁর গোষ্ঠীপ্রধান তাঁকে সবার সামনে ভর্ৎসনা করতেন এবং প্রতিপক্ষের কাছে ক্ষমা চাইতে বলতেন। কখনো কখনো প্রতীকী শাস্তিও দেওয়া হতো। এসব ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল কেবল শাস্তি দেওয়া নয়, বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ভবিষ্যতে অন্যায় করা থেকে বিরত রাখা এবং সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা। তবে যেকোনো সামাজিক সালিসে ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া, উভয় পক্ষের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ, স্বেচ্ছাসম্মতি ও ব্যক্তির মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রচলিত আইন ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখতে হবে। যেসব বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা প্রয়োজন, সেসব ক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষের শরণাপন্ন হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
সে সময় গোষ্ঠীপ্রধানদের সিদ্ধান্ত অমান্য করার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম দেখা যেত। কেউ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে চাইলে সমাজের অন্যরা তাঁকে নিরুৎসাহিত করতেন। তবে সামাজিক ঐক্য বজায় রাখার নামে কারও ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার খর্ব করা কিংবা কাউকে সিদ্ধান্ত মেনে নিতে চাপ দেওয়া সমীচীন নয়। প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার পাশাপাশি ব্যক্তির স্বাধীনতা, সম্মতি ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করাও জরুরি। সালিসব্যবস্থার কারণে মানুষ ঝগড়া-বিবাদে জড়ানোর আগে এর সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে সচেতন থাকত। সমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই সামাজিক নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু বদলে গেছে। বর্তমানে কিছু ক্ষেত্রে বিরোধ মীমাংসার সময় ন্যায়-অন্যায়ের পাশাপাশি কে শক্তিশালী আর কে দুর্বল, সেই বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। কোথাও কোথাও অর্থ, ব্যক্তিস্বার্থ ও প্রভাব-প্রতিপত্তি ন্যায়বিচারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। কিছু ক্ষেত্রে ছোটখাটো বিরোধও মামলা-মোকদ্দমার দিকে গড়ায়।
দ্রুত নগরায়ণ, সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়া, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য বিরোধ মীমাংসার কাঠামোর অভাব এ পরিবর্তনের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ পরিবর্তনের পেছনে একক কোনো কারণকে দায়ী করা কঠিন। সময়ের পরিবর্তন, মানুষের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, সামাজিক সম্পর্কের রূপান্তর এবং আনুষ্ঠানিক বিচারব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা—এসব বিষয়ও পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই অতীত ও বর্তমানের তুলনা করার ক্ষেত্রে উভয় সময়ের বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে সমাজ ধীরে ধীরে মূল্যবোধের সংকটে পড়তে পারে। সৎ ও বিবেকবান মানুষেরা কখনো কখনো সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেন। এ প্রবণতা সমাজের পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা ও সম্পর্কের দৃঢ়তা কমিয়ে দিতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার ঝুঁকি তৈরি করে।
শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উন্নত জীবনের প্রত্যাশাসহ নানা কারণে অনেকে গ্রাম ছেড়ে শহরে কিংবা দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। এর ফলে কোনো কোনো স্থানীয় সমাজ অভিজ্ঞ ও যোগ্য মানুষের নেতৃত্ব, জ্ঞান ও অবদান থেকে বঞ্চিত হতে পারে। তাই স্থানীয় পর্যায়ে সৎ, যোগ্য ও দায়িত্বশীল মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। একটি টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যক্তিগত নৈতিকতার পাশাপাশি জবাবদিহিমূলক স্থানীয় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং বিরোধ মীমাংসার গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করাও জরুরি।
তাই সমাজে ন্যায়, সততা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা আজ সময়ের দাবি। সৎ, যোগ্য ও ন্যায়পরায়ণ মানুষদের যথাযথ সম্মান দিতে হবে। সামাজিক নেতৃত্ব ও বিরোধ মীমাংসার ক্ষেত্রে তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। দলমত-নির্বিশেষে তাঁদের ভালো কাজের স্বীকৃতি দিতে হবে এবং সমাজের কল্যাণে অবদান রাখতে উৎসাহিত করতে হবে।
এভাবেই সমাজে ন্যায়বিচার, পারস্পরিক আস্থা ও শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হতে পারে। আমাদের গ্রামীণ সমাজও ন্যায়, মানবতা ও সৌহার্দ্যরে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
লেখক : কবি ও সাবেক ব্যাংকার।
 
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]