প্রতি দুই বছর অন্তর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতায় এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন ৩ নভেম্বর মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হলো। এই নির্বাচনের আগে স্বাভাবিক নিয়মে প্রায় প্রতিদিন কোনো না কোনো সংস্থার নির্বাচনী জরিপের ফলাফল মিডিয়ায় প্রকাশিত হতে দেখা যায়। প্রকাশিত অধিকাংশ জরিপের ফলাফলে মার্কিন জনগণের মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের গ্রহণযোগ্যতা ঐতিহাসিকভাবে (Historically) অত্যন্ত নিম্ন পর্যায়ে (৩০ থেকে ৪০ ভাগ) থাকতে দেখা যায়, যা দেখে বহু মহল নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের সম্ভাবনা দেখছেন। জরিপের ফলাফল ও এসব মহলের অনুমান সত্য হলে রিপাবলিকানদের মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
উল্লেখ্য, বর্তমানে মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষে (সিনেট এবং হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভ) রিপাবলিকানদের সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা Slim Majority) রয়েছে। ১০০ সদস্যের সিনেটে রিপাবলিকান সদস্যসংখ্যা ৫৩ আর ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যা ৪৫। দুজন সিনেটর নিজেদের নির্দল পরিচয় দিলেও তারা ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সংহতি (Caucus) পোষণ করেন বিধায় ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যা ৪৭ বলা যায়। অপরদিকে ৪৩৫ সদস্যের হাউসে রিপাবলিকান ২১৮ আর ডেমোক্র্যাট ২১৪। নির্দল ১ জন শূন্য আসন।
অধিকাংশ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক নির্বাচনে সিনেটে না হলেও হাউসে ডেমোক্র্যাটরা সুনিশ্চিত বিজয় পাবেন বলে ধারণা করছেন। তাদের ধারণা সঠিক হলে স্পিকার ও কংগ্রেসের বিভিন্ন কমিটির চেয়ারম্যান পদ ছাড়াও কংগ্রেসের কার্যপ্রণালি নির্ধারণে ডেমোক্র্যাটরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সক্ষম হবেন। এটি হলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যা খুশি তা করার বর্তমান প্রবণতার রাশ বহুলাংশে টেনে ধরা সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার দলের প্রতি জনগণের মধ্যে বিদ্যমান বিরূপ মনোভাবের (Auti-Trumpism) পেছনে মূলত প্রেসিডেন্ট নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময়ে তার দেওয়া বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি পালনে ব্যর্থতা ছাড়াও তার অভব্য কথাবার্তা (পরিত্যাজ্য শব্দ এফ ওয়ার্ডের ব্যবহার ইত্যাদি), আচার-আচরণ ও কথিত দুর্নীতিকে দায়ী করা হয়। অর্থনীতি, বৈদেশিক নীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, ইমিগ্রেশনসহ সর্বক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সমৃদ্ধি ও অগ্রগতির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এসবের অধিকাংশ ক্ষেত্রে তেমন কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি। ফলে প্রশাসন পরিচালনায় মি. ট্রাম্পের দক্ষতা ও যোগ্যতা নিয়ে বহু মানুষের মধ্যে প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে, যদিও মি. ট্রাম্প এসব ক্ষেত্রে তার প্রশাসনের কথিত সাফল্যকে ‘A PLUS’ নম্বর দিয়েছেন, যেটাকে বহু মানুষ মি. ট্রাম্পের সহজাত বাগাড়ম্বর ছাড়া অন্য কিছু মনে করেন না বলে প্রতীয়মান হয়। মিডিয়া সূত্রে অভিযোগ রয়েছে, মি. ট্রাম্প ও তার পরিবারের অর্থসম্পদ তার দুই ট্রার্মের এ পর্যন্ত সময়ে কমবেশি তিন থেকে চার বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে, যার মধ্যে একমাত্র ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের মাধ্যমেই অর্জিত হয় প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার। ইরান যুদ্ধ এবং ট্যারিফ নিয়ে বাণিজ্যযুদ্ধের সূচনার কারণে গ্যাস, ডিজেল, সারসহ দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ঘটায় তাদের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব না মেলার কারণে জনগণ দরিদ্রতর হয়েছেন।
রেইড (Raid) এবং গণ-ডিপোর্টেশনের কারণে তার ইমিগ্রেশন নীতি অজনপ্রিয় হয়। পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তনে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পেয়ে মি. ট্রাম্প হালে ডেমোক্র্যাটদের কমিউনিস্ট বা radical Left হিসেবে চিত্রিত করে হাতের শেষ কার্ডের চাল দিয়েছেন। নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় কথিত কমিউনিস্ট পুনর্জাগরণ ঠেকাতে না পারলে দেশের বারোটা বাজা তথা সর্বনাশ অনিবার্য অভিযোগ করে তাকে জনগণের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের সম্পর্কে একধরনের ভীতি সৃষ্টির প্রয়াস পেতে দেখা যায়। এটা দেখে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে উইসকনসিনের তৎকালীন রিপাবলিকান নেতা জো ম্যাকার্থির ব্যাপক কমিউনিস্ট-বিরোধী তৎপরতা তথা বক্তব্য-বিবৃতির কথা মনে পড়ছে। ম্যাকার্থি সে সময় ডেমোক্র্যাটদের ভুয়া লিবারেল তথা কমিউনিজমের সমর্থক অভিযোগ করে তারা সে সময়ের মার্কিন প্রশাসনের সর্বত্র অনুপ্রবেশ করে তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের হয়ে কাজ করছেন মর্মে ঢালাও অভিযোগ করেন, যদিও এসব অভিযোগের সপক্ষে তিনি তেমন কোনো প্রমাণ হাজির করতে ব্যর্থ হন। তিনি লেবার ইউনিয়নকে কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্রের অংশ উল্লেখ করে জনসমক্ষে অশালীন ভাষায় বহু নেতার চরিত্র হনন ও তাদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এসব কথিত মনগড়া ভিত্তিহীন অভিযোগ প্রায়শ শিষ্টাচারের সীমা লঙ্ঘন করে যেত। তার কমিউনিস্ট-ভীতি সৃষ্টির কারণে ১৯৪৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা পরাজিত হয়। ম্যাকার্থি নিজে ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থীকে পরাজিত করে সিনেটর নির্বাচিত হন। তার শিষ্টাচার-বিবর্জিত কথাবার্তা ও অভিযোগে অতিষ্ঠ হয়ে নির্বাচনের তিন বছর পর সিনেটে তার সহকর্মীদের দ্বারা তিনি নিন্দিত (Censured) হন। সহকর্মীদের নিন্দা, সমালোচনা ও মিডিয়ার ক্রমবর্ধমান উপেক্ষায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে ম্যাকার্থি একপর্যায়ে অতিরিক্ত মদ্যপান শুরু করেন। ১৯৫৭ সালে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে লিভার সিরোসিসে তার মৃত্যু হয়। সেই সঙ্গে মৃত্যু হয় তার তথাকথিত ম্যাকার্থিবাদের। মি. ট্রাম্প সম্ভবত জনমানুষের মধ্যে ম্যাকার্থি-সৃষ্ট কমিউনিস্ট তথা ‘লাল ভীতির’ কথা স্মরণ করে নির্বাচনে বিজয়ের জন্য পুরোনো সেই চাল চালতে উৎসাহী হয়েছেন। তবে তার এই প্রত্যাশার পাশাপাশি ম্যাকার্থির শেষ পরিণতির বিষয়টাও তার মাথায় থাকা দরকার বলে কেউ কেউ মনে করেন।
সম্প্রতি পত্রিকান্তরে মর্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা পিতাদের (Founding Fathers) অন্যতম এবং যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসনের হাতে লেখা একটি চিঠি বিক্রির জন্য বাজারে আসার খবর প্রকাশিত হয়েছে। জনৈক ব্যক্তির সংগ্রহে থাকা এই চিঠিটি জেফারসন ১৮৮৭ সালের দিকে ফ্রান্সে যুক্তরাষ্ট্রের দূত থাকার সময় তার বন্ধু ও আমেরিকান ফিলোসফিক্যাল সোসাইটির তৎকালীন সভাপতি ডেভিড রিটেনহাউসকে লেখেন। চিঠিতে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সমৃদ্ধি ও প্রগতির জন্য অগ্রাধিকার ও নীতি-আদর্শ কী হওয়া উচিত, সে বিষয়ে আলোকপাত করা হয়, যার মধ্যে শান্তি, সংবিধান সমুন্নত রাখা, দেনা পরিশোধ ও কৃষি খাতকে প্রাধান্য দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পরিতাপের বিষয়, যেই জেফারসনকে মি. ট্রাম্প নিজের প্রিয় নেতাদের অন্যতম মনে করে হোয়াইট হাউসের রোজ গার্ডেনে সম্প্রতি তার একট লাইফ-সাইজ মূর্তি স্থাপন করেছেন। কিন্তু সেই নেতার দেখানো পথ অনুসরণের বদলে তিনি অন্য পথে যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে যেতে ব্রতী হয়েছেন। এ কারণে জেফারসনের লালিত সমৃদ্ধি ও প্রগতির পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র একপ্রকার অধঃপাতের দিকে যাচ্ছে, বলা যায়।
প্রথমত, পূর্বে মি. ট্রাম্প বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে জড়ানোর ঘটনাকে একাধিকবার ‘Stupid war’ বলে নিজের যুদ্ধবিরোধী মনোভাব ব্যক্ত করলেও সেই ধারণা থেকে সরে গিয়ে এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরান যুদ্ধের সূচনা করেন। এই যুদ্ধ সাত মাস ধরে চলমান রয়েছে, যা আঞ্চলিক ও বিশ্ব শান্তির জন্য এক বড় ও গুরুতর হুমকি হয়ে আছে। মি. ট্রাম্প ইরানের বন্দরে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় আশু যুদ্ধ বন্ধের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, যা যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশের অর্থনীতির অগ্রগতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতি ও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। তথ্যমতে, যুদ্ধ চালাতে গিয়ে ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র কোষাগারের প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়িত হয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সমরাস্ত্র ভান্ডারের মজুত উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে, যা পূরণে কমপক্ষে চার-পাঁচ বছর লাগতে পারে বলে কেউ কেউ ধারণা করছেন, যদিও মি. ট্রাম্প এ ধারণাকে অমূলক বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
দ্বিতীয়ত, সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দেনা পরিশোধ পরিস্থিতির অবনতি হতে লক্ষ করা যায়। উল্লেখ্য, বর্তমানে এই দেনার পরিমাণ প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার। মি. ট্রাম্প সেপ্টেম্বর মাসে ডালাসে রিপাবলিকান দলের এক সম্মেলনে মধ্যবর্তী নির্বাচনে তার দল জয়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে পাঁচ হাজার ডলার ডিভিডেন্ট দেওয়ার ঘোষণা দেন। এ ধরনের ‘পে আউট’ (Pay out) একধরনের রাজনৈতিক উৎকোচ বা Political Bribe কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তা ছাড়া এটা কতটা আইনানুগ ও বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। শোনা যায়, এ ঘোষণার বাস্তবায়নে দেড়-দুই ট্রিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে, যা জাতীয় দেনার পরিমাণকে বৃদ্ধি ছাড়া কমাবে না। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য ট্যারিফ থেকে অর্জিত আয় থেকে এই ডিভিডেন্ট প্রদানের কথা জানানো হয়।
তৃতীয়ত, মি. ট্রাম্পের একাধিক পদক্ষেপ সংবিধানকে উপেক্ষার বার্তা দেয়। সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর তোয়াক্কা না করে তিনি বার্থরাইট সিটিজেনশিপ নীতি বাতিল করেন এবং অতিসম্প্রতি কথিত ভুয়া খবর (Fake news) প্রচারের অজুহাতে কতিপয় মিডিয়াকে (CNN, MS Now, Politico) খবর সংগ্রহের কাজে হোয়াইট হাউসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়, যা প্রেস ফ্রিডম নিশ্চিতে মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর বরখেলাপ বলে অভিযোগ করা হয়।
চতুর্থত, ইরান যুদ্ধ, বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে গ্যাস, ডিজেল, সার, কৃষি যন্ত্রপাতির মূল্যবৃদ্ধি, উৎপাদিত কৃষিপণ্যের (সয়াবিন ইত্যাদি) রপ্তানি বাজার সংকোচনের পাশাপাশি ইমিগ্রেশন পলিসির কারণে প্রয়োজনীয় সংখ্যক কৃষি শ্রমিকের স্বল্পতায় বর্তমানে কৃষি খাতকে এক বড় সংকট ও চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে দেখা যায়।
পরিশেষে রিপাবলিকান পার্টির প্রতীক হাতির এক অদ্ভুত আচরণের উল্লেখপূর্বক লেখার ইতি টানছি। ১২ জুন টেক্সাস রিপাবলিকান পার্টির সম্মেলনস্থল হিউস্টন কনভেনশন সেন্টারে একটি বিশালাকার হাতি নিয়ে আসা হয়। হেঁটে যাওয়ার একপর্যায়ে হাতিটি হঠাৎ থেমে গিয়ে সেখানে সবেগে প্রস্রাব করা শুরু করে, যা দেখে উপস্থিত সকলে হতবাক হয়ে যান। এ ঘটনা দেখে ট্রাম্পবিরোধী পক্ষকে নারাজ হাতির প্রস্রাব-কাণ্ডকে মি. ট্রাম্প ও তার দলের প্রতি মার্কিন জনগণের মধ্যে বিরাজমান বিরূপ মনোভাবের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ উল্লেখ করে এটাকে একপ্রকার রাজনৈতিক রূপক অভিব্যক্তি (Political metaphor) হিসেবে বর্ণনার প্রয়াস পেতে দেখা যায়। এখন দেখার বিষয়, নারাজ হাতির মতো মার্কিন জনগণের ক্ষোভ মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটের বাক্সে কতটা কীভাবে প্রতিফলিত হয়, যা ওয়াশিংটন ডিসির রাজনীতির ক্ষমতার কেন্দ্রে চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স নিশ্চিতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে মনে করা হয়।
উল্লেখ্য, বর্তমানে মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষে (সিনেট এবং হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভ) রিপাবলিকানদের সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা Slim Majority) রয়েছে। ১০০ সদস্যের সিনেটে রিপাবলিকান সদস্যসংখ্যা ৫৩ আর ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যা ৪৫। দুজন সিনেটর নিজেদের নির্দল পরিচয় দিলেও তারা ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সংহতি (Caucus) পোষণ করেন বিধায় ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যা ৪৭ বলা যায়। অপরদিকে ৪৩৫ সদস্যের হাউসে রিপাবলিকান ২১৮ আর ডেমোক্র্যাট ২১৪। নির্দল ১ জন শূন্য আসন।
অধিকাংশ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক নির্বাচনে সিনেটে না হলেও হাউসে ডেমোক্র্যাটরা সুনিশ্চিত বিজয় পাবেন বলে ধারণা করছেন। তাদের ধারণা সঠিক হলে স্পিকার ও কংগ্রেসের বিভিন্ন কমিটির চেয়ারম্যান পদ ছাড়াও কংগ্রেসের কার্যপ্রণালি নির্ধারণে ডেমোক্র্যাটরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সক্ষম হবেন। এটি হলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যা খুশি তা করার বর্তমান প্রবণতার রাশ বহুলাংশে টেনে ধরা সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার দলের প্রতি জনগণের মধ্যে বিদ্যমান বিরূপ মনোভাবের (Auti-Trumpism) পেছনে মূলত প্রেসিডেন্ট নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময়ে তার দেওয়া বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি পালনে ব্যর্থতা ছাড়াও তার অভব্য কথাবার্তা (পরিত্যাজ্য শব্দ এফ ওয়ার্ডের ব্যবহার ইত্যাদি), আচার-আচরণ ও কথিত দুর্নীতিকে দায়ী করা হয়। অর্থনীতি, বৈদেশিক নীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, ইমিগ্রেশনসহ সর্বক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সমৃদ্ধি ও অগ্রগতির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এসবের অধিকাংশ ক্ষেত্রে তেমন কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি। ফলে প্রশাসন পরিচালনায় মি. ট্রাম্পের দক্ষতা ও যোগ্যতা নিয়ে বহু মানুষের মধ্যে প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে, যদিও মি. ট্রাম্প এসব ক্ষেত্রে তার প্রশাসনের কথিত সাফল্যকে ‘A PLUS’ নম্বর দিয়েছেন, যেটাকে বহু মানুষ মি. ট্রাম্পের সহজাত বাগাড়ম্বর ছাড়া অন্য কিছু মনে করেন না বলে প্রতীয়মান হয়। মিডিয়া সূত্রে অভিযোগ রয়েছে, মি. ট্রাম্প ও তার পরিবারের অর্থসম্পদ তার দুই ট্রার্মের এ পর্যন্ত সময়ে কমবেশি তিন থেকে চার বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে, যার মধ্যে একমাত্র ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের মাধ্যমেই অর্জিত হয় প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার। ইরান যুদ্ধ এবং ট্যারিফ নিয়ে বাণিজ্যযুদ্ধের সূচনার কারণে গ্যাস, ডিজেল, সারসহ দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ঘটায় তাদের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব না মেলার কারণে জনগণ দরিদ্রতর হয়েছেন।
রেইড (Raid) এবং গণ-ডিপোর্টেশনের কারণে তার ইমিগ্রেশন নীতি অজনপ্রিয় হয়। পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তনে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পেয়ে মি. ট্রাম্প হালে ডেমোক্র্যাটদের কমিউনিস্ট বা radical Left হিসেবে চিত্রিত করে হাতের শেষ কার্ডের চাল দিয়েছেন। নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় কথিত কমিউনিস্ট পুনর্জাগরণ ঠেকাতে না পারলে দেশের বারোটা বাজা তথা সর্বনাশ অনিবার্য অভিযোগ করে তাকে জনগণের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের সম্পর্কে একধরনের ভীতি সৃষ্টির প্রয়াস পেতে দেখা যায়। এটা দেখে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে উইসকনসিনের তৎকালীন রিপাবলিকান নেতা জো ম্যাকার্থির ব্যাপক কমিউনিস্ট-বিরোধী তৎপরতা তথা বক্তব্য-বিবৃতির কথা মনে পড়ছে। ম্যাকার্থি সে সময় ডেমোক্র্যাটদের ভুয়া লিবারেল তথা কমিউনিজমের সমর্থক অভিযোগ করে তারা সে সময়ের মার্কিন প্রশাসনের সর্বত্র অনুপ্রবেশ করে তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের হয়ে কাজ করছেন মর্মে ঢালাও অভিযোগ করেন, যদিও এসব অভিযোগের সপক্ষে তিনি তেমন কোনো প্রমাণ হাজির করতে ব্যর্থ হন। তিনি লেবার ইউনিয়নকে কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্রের অংশ উল্লেখ করে জনসমক্ষে অশালীন ভাষায় বহু নেতার চরিত্র হনন ও তাদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এসব কথিত মনগড়া ভিত্তিহীন অভিযোগ প্রায়শ শিষ্টাচারের সীমা লঙ্ঘন করে যেত। তার কমিউনিস্ট-ভীতি সৃষ্টির কারণে ১৯৪৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা পরাজিত হয়। ম্যাকার্থি নিজে ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থীকে পরাজিত করে সিনেটর নির্বাচিত হন। তার শিষ্টাচার-বিবর্জিত কথাবার্তা ও অভিযোগে অতিষ্ঠ হয়ে নির্বাচনের তিন বছর পর সিনেটে তার সহকর্মীদের দ্বারা তিনি নিন্দিত (Censured) হন। সহকর্মীদের নিন্দা, সমালোচনা ও মিডিয়ার ক্রমবর্ধমান উপেক্ষায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে ম্যাকার্থি একপর্যায়ে অতিরিক্ত মদ্যপান শুরু করেন। ১৯৫৭ সালে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে লিভার সিরোসিসে তার মৃত্যু হয়। সেই সঙ্গে মৃত্যু হয় তার তথাকথিত ম্যাকার্থিবাদের। মি. ট্রাম্প সম্ভবত জনমানুষের মধ্যে ম্যাকার্থি-সৃষ্ট কমিউনিস্ট তথা ‘লাল ভীতির’ কথা স্মরণ করে নির্বাচনে বিজয়ের জন্য পুরোনো সেই চাল চালতে উৎসাহী হয়েছেন। তবে তার এই প্রত্যাশার পাশাপাশি ম্যাকার্থির শেষ পরিণতির বিষয়টাও তার মাথায় থাকা দরকার বলে কেউ কেউ মনে করেন।
সম্প্রতি পত্রিকান্তরে মর্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা পিতাদের (Founding Fathers) অন্যতম এবং যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসনের হাতে লেখা একটি চিঠি বিক্রির জন্য বাজারে আসার খবর প্রকাশিত হয়েছে। জনৈক ব্যক্তির সংগ্রহে থাকা এই চিঠিটি জেফারসন ১৮৮৭ সালের দিকে ফ্রান্সে যুক্তরাষ্ট্রের দূত থাকার সময় তার বন্ধু ও আমেরিকান ফিলোসফিক্যাল সোসাইটির তৎকালীন সভাপতি ডেভিড রিটেনহাউসকে লেখেন। চিঠিতে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সমৃদ্ধি ও প্রগতির জন্য অগ্রাধিকার ও নীতি-আদর্শ কী হওয়া উচিত, সে বিষয়ে আলোকপাত করা হয়, যার মধ্যে শান্তি, সংবিধান সমুন্নত রাখা, দেনা পরিশোধ ও কৃষি খাতকে প্রাধান্য দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পরিতাপের বিষয়, যেই জেফারসনকে মি. ট্রাম্প নিজের প্রিয় নেতাদের অন্যতম মনে করে হোয়াইট হাউসের রোজ গার্ডেনে সম্প্রতি তার একট লাইফ-সাইজ মূর্তি স্থাপন করেছেন। কিন্তু সেই নেতার দেখানো পথ অনুসরণের বদলে তিনি অন্য পথে যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে যেতে ব্রতী হয়েছেন। এ কারণে জেফারসনের লালিত সমৃদ্ধি ও প্রগতির পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র একপ্রকার অধঃপাতের দিকে যাচ্ছে, বলা যায়।
প্রথমত, পূর্বে মি. ট্রাম্প বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে জড়ানোর ঘটনাকে একাধিকবার ‘Stupid war’ বলে নিজের যুদ্ধবিরোধী মনোভাব ব্যক্ত করলেও সেই ধারণা থেকে সরে গিয়ে এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরান যুদ্ধের সূচনা করেন। এই যুদ্ধ সাত মাস ধরে চলমান রয়েছে, যা আঞ্চলিক ও বিশ্ব শান্তির জন্য এক বড় ও গুরুতর হুমকি হয়ে আছে। মি. ট্রাম্প ইরানের বন্দরে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় আশু যুদ্ধ বন্ধের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, যা যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশের অর্থনীতির অগ্রগতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতি ও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। তথ্যমতে, যুদ্ধ চালাতে গিয়ে ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র কোষাগারের প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়িত হয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সমরাস্ত্র ভান্ডারের মজুত উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে, যা পূরণে কমপক্ষে চার-পাঁচ বছর লাগতে পারে বলে কেউ কেউ ধারণা করছেন, যদিও মি. ট্রাম্প এ ধারণাকে অমূলক বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
দ্বিতীয়ত, সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দেনা পরিশোধ পরিস্থিতির অবনতি হতে লক্ষ করা যায়। উল্লেখ্য, বর্তমানে এই দেনার পরিমাণ প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার। মি. ট্রাম্প সেপ্টেম্বর মাসে ডালাসে রিপাবলিকান দলের এক সম্মেলনে মধ্যবর্তী নির্বাচনে তার দল জয়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে পাঁচ হাজার ডলার ডিভিডেন্ট দেওয়ার ঘোষণা দেন। এ ধরনের ‘পে আউট’ (Pay out) একধরনের রাজনৈতিক উৎকোচ বা Political Bribe কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তা ছাড়া এটা কতটা আইনানুগ ও বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। শোনা যায়, এ ঘোষণার বাস্তবায়নে দেড়-দুই ট্রিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে, যা জাতীয় দেনার পরিমাণকে বৃদ্ধি ছাড়া কমাবে না। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য ট্যারিফ থেকে অর্জিত আয় থেকে এই ডিভিডেন্ট প্রদানের কথা জানানো হয়।
তৃতীয়ত, মি. ট্রাম্পের একাধিক পদক্ষেপ সংবিধানকে উপেক্ষার বার্তা দেয়। সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর তোয়াক্কা না করে তিনি বার্থরাইট সিটিজেনশিপ নীতি বাতিল করেন এবং অতিসম্প্রতি কথিত ভুয়া খবর (Fake news) প্রচারের অজুহাতে কতিপয় মিডিয়াকে (CNN, MS Now, Politico) খবর সংগ্রহের কাজে হোয়াইট হাউসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়, যা প্রেস ফ্রিডম নিশ্চিতে মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর বরখেলাপ বলে অভিযোগ করা হয়।
চতুর্থত, ইরান যুদ্ধ, বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে গ্যাস, ডিজেল, সার, কৃষি যন্ত্রপাতির মূল্যবৃদ্ধি, উৎপাদিত কৃষিপণ্যের (সয়াবিন ইত্যাদি) রপ্তানি বাজার সংকোচনের পাশাপাশি ইমিগ্রেশন পলিসির কারণে প্রয়োজনীয় সংখ্যক কৃষি শ্রমিকের স্বল্পতায় বর্তমানে কৃষি খাতকে এক বড় সংকট ও চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে দেখা যায়।
পরিশেষে রিপাবলিকান পার্টির প্রতীক হাতির এক অদ্ভুত আচরণের উল্লেখপূর্বক লেখার ইতি টানছি। ১২ জুন টেক্সাস রিপাবলিকান পার্টির সম্মেলনস্থল হিউস্টন কনভেনশন সেন্টারে একটি বিশালাকার হাতি নিয়ে আসা হয়। হেঁটে যাওয়ার একপর্যায়ে হাতিটি হঠাৎ থেমে গিয়ে সেখানে সবেগে প্রস্রাব করা শুরু করে, যা দেখে উপস্থিত সকলে হতবাক হয়ে যান। এ ঘটনা দেখে ট্রাম্পবিরোধী পক্ষকে নারাজ হাতির প্রস্রাব-কাণ্ডকে মি. ট্রাম্প ও তার দলের প্রতি মার্কিন জনগণের মধ্যে বিরাজমান বিরূপ মনোভাবের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ উল্লেখ করে এটাকে একপ্রকার রাজনৈতিক রূপক অভিব্যক্তি (Political metaphor) হিসেবে বর্ণনার প্রয়াস পেতে দেখা যায়। এখন দেখার বিষয়, নারাজ হাতির মতো মার্কিন জনগণের ক্ষোভ মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটের বাক্সে কতটা কীভাবে প্রতিফলিত হয়, যা ওয়াশিংটন ডিসির রাজনীতির ক্ষমতার কেন্দ্রে চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স নিশ্চিতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে মনে করা হয়।