৫ কারণে ট্রাম্পের দলের ভরাডুবি

প্রকাশ : ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২২:১৫ , অনলাইন ভার্সন
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণও চলে গেছে তাদের হাতে। সাধারণত মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল কিছু আসন হারায়। তবে এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের ব্যাপকতাকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই বছরের শাসনের প্রতি ভোটারদের সুস্পষ্ট অনাস্থা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ইরান যুদ্ধ, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভোটের প্রবণতা পরিবর্তন—সব মিলিয়ে এই বিপর্যয়ের পেছনে পাঁচটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছে বিবিসি।

১. জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ ভোটাররা এবার রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। নির্বাচনের আগে নর্থ ক্যারোলাইনার এক ভোটার বিবিসিকে বলেন, জ্বালানি, মুদিপণ্য—সবকিছুর দাম বাড়ছে। এ কারণে তিনি এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকান ছেড়ে ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছেন।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিই এর অন্যতম কারণ। অক্টোবরের শুরুতে ডিজেলের খুচরা দাম প্রতি গ্যালন প্রায় ছয় ডলারের কাছাকাছি পৌঁছায়, যা আগের রেকর্ড দামেরও কাছাকাছি।

ভোটারদের ওপর পরিচালিত জরিপে প্রায় ৭৯ শতাংশ বলেছেন, গত এক বছরে মূল্যস্ফীতি তাঁদের পরিবারকে মাঝারি থেকে গুরুতর আর্থিক সংকটে ফেলেছে। তাঁদের মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি এই পরিস্থিতির জন্য ট্রাম্পের নীতিকে দায়ী করেছেন।

২. ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ

জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার অন্যতম কারণ ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা ইরান যুদ্ধ। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে বিশ্ববাজারে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। এর প্রভাব পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারেও।

যুদ্ধটি অধিকাংশ মার্কিন নাগরিকের কাছে জনপ্রিয়তা পায়নি। ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ (মাগা) সমর্থকদের কাছেও এটি ছিল ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ, নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প নতুন কোনো যুদ্ধে জড়াবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

জরিপে অংশ নেওয়া ৬৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইরানে সামরিক অভিযান চালানোর সিদ্ধান্তকে ভুল বলেছেন। আর ৭৪ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, কংগ্রেস নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে যুদ্ধটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নির্বাচনের পর ট্রাম্পও পরাজয়ের পেছনে যুদ্ধের ভূমিকা স্বীকার করেন। তবে তাঁর দাবি, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকাতে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।

৩. ডেমোক্র্যাটদের সুসংগঠিত নির্বাচনী প্রচার

এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের পেছনে প্রার্থীদের কার্যকর প্রচারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবার খরচ ও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সংকটকে তাঁরা প্রচারের কেন্দ্রে রেখেছেন।

টেক্সাসে সাবেক শিক্ষক জেমস তালারিকো ও কানসাসে যাজক অ্যাডাম হ্যামিলটন নিজেদের বিশ্বাস এবং সামাজিক অবস্থানের কথা তুলে ধরে ভোটারদের আকৃষ্ট করেছেন। সাউথ ক্যারোলাইনায় সাবেক শিশুচিকিৎসক অ্যানি অ্যান্ড্রুজ স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে বড় অঘটন ঘটিয়েছেন।

মিশিগানে আবদুল এল-সায়েদ রাজনীতি থেকে অর্থের প্রভাব কমানো এবং সাধারণ মানুষের পকেটে অর্থ রাখার বিষয়টিকে স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করেন। জর্জিয়ায় পুনর্নির্বাচিত ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফও জীবনযাত্রার ব্যয় ও দুর্নীতিকে প্রচারের প্রধান ইস্যু করেন।

৪. ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া

এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য সবচেয়ে বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছেন ট্রাম্প নিজেই। মূল্যস্ফীতি ও ইরান যুদ্ধ—ভোটারদের অসন্তোষের প্রধান দুটি বিষয়ই সরাসরি তাঁর নীতির সঙ্গে যুক্ত। এমনকি রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যেও তাঁর জনপ্রিয়তা কমেছে।

নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প নিজেকেই ভোটের প্রধান বিবেচ্য হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু এক দশকের বেশি সময় ধরে মার্কিন রাজনীতির কেন্দ্রে থাকা ট্রাম্পের রাজনৈতিক আকর্ষণ কমতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করে পরিচালিত প্রচার শেষ পর্যন্ত উল্টো ফল দিয়েছে।

৫. হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের অবস্থান পরিবর্তন

২০২৪ সালের নির্বাচনে হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের একটি অংশ ট্রাম্পের দিকে ঝুঁকেছিলেন। এবার সেই প্রবণতা উল্টে গেছে। টেক্সাস-মেক্সিকো সীমান্তবর্তী হিস্পানিক-অধ্যুষিত তিনটি কংগ্রেসনাল আসনেই জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা।

নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তুলনায় হিস্পানিক সংখ্যাগরিষ্ঠ কাউন্টিগুলোতে রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থীদের সমর্থন ২২ শতাংশের বেশি কমেছে। অভিবাসনবিরোধী অভিযান নিয়ে অসন্তোষ এর অন্যতম কারণ। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপে ৫৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা আইসিই সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব জানিয়েছেন।

একইভাবে কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলোতেও ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন বেড়েছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত মিসিসিপিতে সিনেট নির্বাচন এখনো হাড্ডাহাড্ডি অবস্থায় রয়েছে। সেখানে জয়ী হলে স্কট কলোম ১৯৮২ সালের পর রাজ্যটি থেকে নির্বাচিত প্রথম ডেমোক্র্যাট সিনেটর হবেন।

এবারের ফলাফল শুধু ক্ষমতাসীন দলের মধ্যবর্তী নির্বাচনী বিপর্যয় নয়; বরং ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে মার্কিন ভোটারদের সম্মিলিত অসন্তোষের প্রতিফলন।

ঠিকানা/এনআই
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]