যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ছয় প্রার্থীর বিজয়

প্রকাশ : ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০:১৮ , অনলাইন ভার্সন
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জন করেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন রাজনীতিবিদ্গণ। ৩রা নভেম্বর মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অন্তত ছয়জন ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রার্থী গুরুত্বপূর্ণ পদে বিজয়ী হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে এবং একজন মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদে নির্বাচিত হয়েছেন। বিজয়ী ছয়জনই ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী।

প্রতিনিধি পরিষদে বিজয়ীদের মধ্যে চারজন বর্তমান কংগ্রেস সদস্য পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে ফ্লোরিডা থেকে প্রথমবারের মতো কংগ্রেসে যাবেন করছেন পিয়া দান্ডিয়া। মেরিল্যান্ডে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য লেফটেন্যান্ট গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন অরুণা মিলার।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রার্থীদের এই সফলতা যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার রাজনীতিতে দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী জনগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অ্যামি বেরার অষ্টম বিজয়, ক্যালিফোর্নিয়া

ক্যালিফোর্নিয়ার তৃতীয় কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে অষ্টমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট অ্যামি বেরা। তিনি রিপাবলিকান প্রার্থী রব টাকারকে পরাজিত করেছেন।
৬১ বছর বয়সী বেরা পেশায় একজন চিকিৎসক। ২০১৩ সাল থেকে তিনি কংগ্রেসের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে তিনিই প্রতিনিধি পরিষদে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালনকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূত আইনপ্রণেতা।

মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি, স্বাস্থ্যসেবা, জাতীয় নিরাপত্তা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক জোরদারে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির সদস্য হিসেবেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে।

রো খান্নার ষষ্ঠ বিজয়, ক্যালিফোর্নিয়া
ক্যালিফোর্নিয়ার সিলিকন ভ্যালিকেন্দ্রিক ১৭তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে ষষ্ঠবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট রো খান্না। তিনি ভারতীয় বংশোদ্ভূত রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী রিতেশ ট্যান্ডনকে পরাজিত করেন। ৫০ বছর বয়সী খান্না প্রযুক্তি খাত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং মার্কিন শিল্পনীতির গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ হিসেবে পরিচিত।
বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং যুক্তরাষ্ট্রে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পক্ষে তাঁর অবস্থান জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্ব পেয়েছে।

প্রমীলা জয়পালের ষষ্ঠ বিজয়, ওয়াশিংটন
ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের সপ্তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে ষষ্ঠবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ডেমোক্র্যাট প্রমীলা জয়পাল। ভারতে জন্মগ্রহণকারী জয়পাল যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত নারী। অভিবাসীদের অধিকার, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, শ্রমিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পক্ষে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়।

কংগ্রেসের প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটদের অন্যতম পরিচিত মুখ জয়পালের এই বিজয় ওয়াশিংটনে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান আরও সুসংহত করেছে।

সুহাস সুব্রামানিয়ামের দ্বিতীয় বিজয়, ভার্জিনিয়া
ভার্জিনিয়ার দশম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট সুহাস সুব্রামানিয়াম। ৪০ বছর বয়সী সুব্রামানিয়াম রিপাবলিকান প্রার্থী ডেভ বেকউইথকে পরাজিত করেছেন। প্রাথমিক ফলাফলে প্রায় ৬৩ শতাংশ ভোট পেয়ে তিনি উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন। ২০২৪ সালে নির্বাচিত হয়ে ভার্জিনিয়া থেকে প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত কংগ্রেস সদস্য হওয়ার ইতিহাস গড়েন তিনি। এর আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসনে উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষা, প্রযুক্তি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সরকারি ব্যবস্থায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা তাঁর রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের অন্যতম বিষয়।

ফ্লোরিডায় নতুন ইতিহাস পিয়া দান্ডিয়ার
এবারের নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রার্থীদের মধ্যে অন্যতম আলোচিত বিজয় পিয়া দান্ডিয়ার। ফ্লোরিডার ২২তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী দান্ডিয়া রিপাবলিকান কেসি আসকারকে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হয়েছেন। ৩৯ বছর বয়সী দান্ডিয়া আগে বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নির্বাচনী প্রচারে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব দেন। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, তিনি প্রায় ৫২ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী আসকার পেয়েছেন প্রায় ৪৮ শতাংশ। ফ্লোরিডার মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে তাঁর বিজয় ডেমোক্র্যাটদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অর্জন।

মেরিল্যান্ডে দ্বিতীয় মেয়াদে অরুণা মিলার
মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যে লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত অরুণা মিলার। ডেমোক্র্যাট গভর্নর ওয়েস মুরের সঙ্গে একই নির্বাচনী প্যানেলে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য বিজয়ী হয়েছেন তিনি। ৬১ বছর বয়সী মিলার ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন। পরে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হন। প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা মিলার দীর্ঘদিন মেরিল্যান্ডের রাজনীতিতে সক্রিয়। ২০২২ সালে লেফটেন্যান্ট গভর্নর নির্বাচিত হয়ে রাজ্যটির ইতিহাসে প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তি হিসেবে ওই পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। শিক্ষা, পরিবহন, কর্মসংস্থান এবং অভিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।

ওহাইওতে পরাজিত বিবেক রামাস্বামী
ভারতীয় বংশোদ্ভূত ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের সাফল্যের বিপরীতে বড় ধাক্কা খেয়েছেন রিপাবলিকান রাজনীতিক বিবেক রামাস্বামী। ওহাইও অঙ্গরাজ্যের গভর্নর নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসমর্থিত রামাস্বামী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যামি অ্যাকটনের কাছে পরাজিত হয়েছেন। বায়োটেকনোলজি উদ্যোক্তা রামাস্বামী ২০২৪ সালে রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হওয়ার প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি লাভ করেন। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে পরিচিত রামাস্বামীর এই পরাজয় রিপাবলিকানদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিপর্যয়। অন্যদিকে অ্যামি অ্যাকটন ওহাইওর ইতিহাসে প্রথম নারী হিসেবে গভর্নর নির্বাচিত হয়ে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন।

রাজ্য ও স্থানীয় পর্যায়েও ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের সাফল্য
কংগ্রেস ও লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদের বাইরেও রাজ্য ও স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রার্থীরা সাফল্য অর্জন করেছেন। উইসকনসিনে অ্যাটর্নি জেনারেল পদে জশ কাউল, ওয়াশিংটন ডিসির সিটি কাউন্সিলে অপর্ণা রাজ এবং জর্জিয়ার রাজ্য প্রতিনিধি পরিষদে জ্যোত সিংয়ের বিজয়ের খবর পাওয়া গেছে। অন্যদিকে লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত নিত্যা রমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তাঁর নির্বাচনী লড়াইয়ের ফল তখনো চূড়ান্ত হয়নি।


মার্কিন রাজনীতিতে ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রযুক্তি, ব্যবসা ও গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই প্রভাব রাজনীতি ও জনপ্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হয়েছে। বিশেষ করে ক্যালিফোর্নিয়া, ওয়াশিংটন, ভার্জিনিয়া, মেরিল্যান্ড ও ফ্লোরিডার মতো অঙ্গরাজ্যে ভারতীয় বংশোদ্ভূত নেতাদের রাজনৈতিক অবস্থান ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। একই সঙ্গে এবারের নির্বাচনের ফলাফল প্রমাণ করেছে, ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রার্থীদের সাফল্য কেবল তাঁদের নিজস্ব অভিবাসী জনগোষ্ঠীর ভোটের ওপর নির্ভরশীল নয়। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের ভোটারদের সমর্থন অর্জন করেই তাঁরা নির্বাচিত হচ্ছেন। তবে ভারতীয় বংশোদ্ভূত সবাই একই রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী নন। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলেই তাঁদের সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে। এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের উল্লেখযোগ্য সাফল্যের পাশাপাশি রিপাবলিকান প্রার্থীদের পরাজয় সেই রাজনৈতিক বিভাজনও সামনে এনেছে।

সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অগ্রযাত্রায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকল। কংগ্রেসে পাঁচজন এবং মেরিল্যান্ডের লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদে একজনের বিজয় দেশটির জাতীয় ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের নীতিনির্ধারণে ভারতীয়-আমেরিকানদের উপস্থিতি আরও জোরালো করবে।

ঠিকানা/এএস
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]